ফাইল ছবিEi Samay
Published on
:
4 min read
এই সময়: তৃণমূল আমলে কার্নিভাল মানে ছিল সাজ সাজ রব। রাস্তা বন্ধ করে বাঁধা হতো বড় মঞ্চ। সেখানে বসতেন প্রশাসনিক কর্তা থেকে তৃণমূলের ছোট বড় নেতা-মন্ত্রীরা। প্রতিযোগিতায় জিততে গাঁটের কড়ি খরচ করে নৃত্যশিল্পী, বাদকদের ভাড়া করে আনতে হতো ক্লাব কর্তাদের। আর্থিক চাপ হলেও প্রশাসনকে চটানোর সাহস দেখাতেন না কেউই। -এ বছর অবশ্য কার্নিভাল বন্ধ। বাড়তি খরচ থেকে মুক্তি পেয়েছেন পুজো উদ্যোক্তারা। যদিও পুজোর পরে আরও একটা 'উৎসব' থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা বলেছেন অনেকে। কেউ আবার বলছেন, প্রশাসনের লাগাম না-থাকায় প্রাণ খোলা আনন্দ হয়েছে বিসর্জনে।
শিলিগুড়ি: প্রভাবশালীদের অনুরোধ উপেক্ষা করবে কে?
রাজ্যে বিজেপি 'ইন' হতেই এ বার কার্নিভাল 'আউট'। খুশি শিলিগুড়ির একাধিক ক্লাব ও দুর্গাপুজো কমিটি। শক্তিগড়ের উজ্জ্বল সঙ্ঘ পুজো কমিটির সম্পাদক প্রীতম সিং বলেন, 'কার্নিভাল না হয়ে ভালোই হয়েছে। কার্নিভালে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে প্রতি বছর দুই থেকে আড়াই লক্ষ টাকা অতিরিক্ত খরচ হতো। সেই বাড়তি আর্থিক বোঝা থেকে এ বার মুক্তি পাওয়া গিয়েছে।' রবীন্দ্রনগরের রবীন্দ্র সঙ্ঘ ক্লাবের কর্মকর্তা উদয়ন দাশগুপ্ত বলেন, 'যারা নিজের ইচ্ছেয় কার্নিভালে অংশগ্রহণ করতেন তাদের জন্য সেটা ছিল ভালো। কিন্তু যাদের জোর করে অংশগ্রহণ করানো হতো "তাদের জন্য এটা ছিল অত্যন্ত খারাপ।' অন্য একটি পুজো কমিটির এক সদস্য বলেন, 'কার্নিভালের জন্য রাস্তায় মঞ্চ বাঁধা হতো। হিলকার্ট রোড অবরুদ্ধ করে দেওয়া হতো। প্রভাবশালীদের অনুরোধ ফেলে দেওয়ার উপায় ছিল না আমাদের। ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়েই কার্নিভালে অংশগ্রহণ করতে হতো।' কার্নিভালের নামে মানুষকে হয়রানি করা হতো বলে মনে করেন আইনজীবী আকুল কুমার টিকাদার। "তিনি বলেন, 'পুজোর সময়ে এমনিতেই যানজট হতো। বিসর্জনের দিন গোটা রাস্তা অবরুদ্ধ করে মানুষকে আরও বেশি সমস্যায় ফেলা হতো।'
রায়গঞ্জ: প্রতিমা নিরঞ্জনে ফিরেছে পুরোনো ঐতিহ্য
"তৃণমূলের আমলে 'পুজো কার্নিভাল' চালু হওয়ার পরে পুজো কমিটিগুলির উপরে নানা বিধিনিষেধ চাপানো হয়েছিল বলে অভিযোগ। খোলাখুলি আনন্দ নয়, মন্ত্রী ও আমলাদের খুশি করাটাই প্রধান লক্ষ্য ছিল বলে জানিয়েছেন একাধিক পুজো কমিটির কর্তারা। এ বছর ফের প্রতিমা নিরঞ্জনে পুরোনো ঐতিহ্য ফিরে পেয়ে বেজায় খুশি রায়গঞ্জের বাসিন্দারা। পেশায় শিক্ষক তপন বসাক বলেন, 'এ বার বিসর্জনে কার্নিভালের মতো বিধিনিষেধের বেড়াজাল ছিল না। নেতা-মন্ত্রীদের ঔদ্ধত্য ছিল না। সবাই মিলে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে বিসর্জনের শোভাযাত্রা উপভোগ করেছি।' রায়গঞ্জের একটি পুজো কমিটির সদস্য দীপঙ্কর মোদকের কথায়, 'ইচ্ছে না থাকলেও কার্নিভালে অংশগ্রহণ করতে হতো। প্রতিযোগিতার কারণে বহিরাগত শিল্পীদের ভাড়া করে আনা হতো। ফলে পাড়ার লোক আনন্দ করার সুযোগ পেতেন না।' রায়গঞ্জের বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী বলেন, 'পনেরো বছর পরে রায়গঞ্জের প্রতিমা বিসর্জনের পুরোনো ঐতিহ্য ফিরে পেয়েছে। রাস্তার দু'ধারে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ বিসর্জনের শোভাযাত্রা উপভোগ করেছেন।'
মালদা: স্বাধীন শোভাযাত্রা নয়, যেন নিয়মের বেড়াজাল
প্রতিমা নিয়ে স্বাধীন ভাবে শোভাযাত্রা নয়, যেন নিয়মের বেড়াজাল ছিল কার্নিভালে। রাজ্যে পালা বদলের পরে মালদার একাধিক দুর্গাপুজো কমিটির কর্মকর্তা এমনটাই জানিয়েছেন। কার্নিভালের দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রথবাড়ি এলাকার ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক বন্ধ রাখার কারণে যাত্রী দুর্ভোগ নিয়েও অভিযোগ করেছেন অনেকে। পুরাটুলি স্পোর্টিং ক্লাবের সম্পাদক প্রভাস চৌধুরী, শান্তি ভারতী পরিষদের সম্পাদক রাজা সাহা, মহেশমাটি সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটি কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ দাসের বক্তব্য, 'দুপুর তিনটেয় গন্তব্যে পৌঁছে রাত দশটায় অনেকের ডাক পড়ত। এতক্ষণ অপেক্ষার কারণে অসন্তুষ্ট হতেন অনেক সদস্য। তার উপর বাড়তি খরচ তো ছিলই।' কার্নিভালে যে সব ক্লাবের ডাক পড়ত তাদের দুপুরের মধ্যে ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক সংলগ্ন রামকৃষ্ণপল্লির মাঠে পৌঁছতে হতো। কার কখন ডাক পড়বে, অপেক্ষায় কাটত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তবে আনন্দ পেতেন অনেকে। ইংরেজবাজার শহরের প্রান্তপল্লি এলাকার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অভিষেক চৌধুরী বলেন, 'বাড়ির সামনে জাতীয় সড়ক। প্রতিবেশীরা আমার বাড়ির চার তলার ছাদে এসে চেয়ার নিয়ে বসত। গল্প গুজব করে রাত পর্যন্ত কার্নিভাল উপভোগ করতাম।'
কোচবিহার: কার্নিভাল তো নয়, যেন রোড-শো
কার্নিভাল মানেই অতিরিক্ত খরচ বলে মনে করেন কোচবিহারের একাধিক পুজো উদ্যোক্তা। কী ভাবে? কোনও একটি থিম প্রদর্শন করার জন্য দল ঠিক করা, যাঁরা অংশ নিতেন তাঁদের টিফিনের ব্যবস্থা, গাড়ির ব্যবস্থা ছাড়াও মণ্ডপে দু'তিন দিন প্রতিমা রাখার জন্য বাড়তি খরচের বোঝা চাপত পুজো কমিটির উপরে। নিউ টাউন ইউনিটের সম্পাদক অভিষেক সিংহ রায়ের মতে, 'কার্নিভালে একটা আলাদা আনন্দ হতো এটা ঠিক, কিন্তু আয়োজন করতে অন্তত চল্লিশ হাজার টাকা খরচ হতো। সেই আর্থিক চাপ সকলের পক্ষে সামলানো সম্ভব ছিল না।' কার্নিভালের আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দক্ষিণ খাগড়াবাড়ি ক্লাবের সম্পাদক অভিজিৎ বর্মন। তিনি বলেন, 'কোচবিহারে কার্নিভালের যে আয়োজন করা হতো সেটা একেবারেই ঠিক হতো না। কোনও ভাবে একটা রোড-শো-র মতো করে পালন করা হতো।' এক ক্লাব কর্তার কথায়, 'তৃণমূল আমলে প্রশাসন বা মন্ত্রীদের চাপে কার্নিভালে অংশ নিলেও বিপুল খরচ নিয়ে ক্ষোভছিল অনেকের।'
জলপাইগুড়ি: বাড়তি খরচে হিমশিম খেত ছোট পূজো কমিটি
নতুন সরকার আসার পরে এ বছর কার্নিভাল না হওয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া মিলেছে জলপাইগুড়িতে। দিশারী ক্লাবের সম্পাদক সত্যব্রত দের মতে, 'কার্নিভাল নিয়ে সাধারণ মানুষের উৎসাহ বেশি ছিল। তবে কার্নিভালে অংশ নিতে গেলে ডেকোরেশন, নাচ গানের দল জোগাড় করতে পুজো কমিটির অতিরিক্ত খরচ হতো।' বামনপাড়া সর্বজনীন পুজো কমিটি যুগ্ম সম্পাদক সুশোভন সরকার বলেন, 'কার্নিভাল না হওয়ায় ভালো হয়েছে। কারণ সেখানে ক্লাব বা পুজো কমিটির পারফর্ম্যাব্দ দেখে পুরস্কার দেওয়া হতো। ফলে অতিরিক্ত টাকা খরচ হয়ে যেত। ছোট বাজেটের পুজো কমিটির পক্ষে তা জোগাড় করা কঠিন হয়ে দাঁড়াত।'
আলিপুরদুয়ার: কার্নিভালে অমিল প্রাণভরা আনন্দ
কার্নিভাল হলেও তাতে ডাক পড়ত না আলিপুরদুয়ারে ছোট ছোট পুজো কমিটির। এমনটাই অভিযোগ একাধিক পুজো কমিটির কর্তাদের। দূরত্ব ও খারাপ রাস্তাঘাটের কারণে শুধুমাত্র আলিপুরদুয়ার শহরের বড় পুজোগুলিকে নিয়েই তৃণমূল আমলে কার্নিভাল করা হতো বলে অভিযোগ। জেলার ফালাকাটা কিংবা দূরবর্তী এলাকার পুজো কমিটিগুলি কার্নিভালে ডাক পেত না। এ বার কার্নিভাল না হওয়ায় আলিপুরদুয়ার ইটখোলা দুর্গোৎসব কমিটির সম্পাদক সুমিত ভট্টাচার্য বলেন, 'কথায় আছে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। তাতে কার্নিভালও একটা নতুন মাত্রা এনেছিল। হয়তো তাতে আমাদের প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে দিয়ে চলতে হতো। এ বার যেমন আমরা সন্ধে নামার আগেই প্রতিমা নিরঞ্জন করে বাড়ি ফিরেছি মুক্ত মনে। এ বার কোনও বাড়তি চাপ নিতে হয়নি। তফাৎটা এখানেই।'
বালুরঘাট: কার্নিভালের স্বাদ 'সাংসদ শোভাযাত্রা'য়
কার্নিভাল বন্ধ তো কী হয়েছে, বালুরঘাটে সুকান্ত মজুমদারের উদ্যোগে হওয়া 'সাংসদ শোভাযাত্রা' সেই স্বাদ পেয়েছেন অনেকে। প্রথম দিকে সরকারি কার্নিভালে জেলার ১০-১২টি ক্লাব অংশগ্রহণ করলেও পরে সেই সংখ্যা কমে গিয়েছিল। এমনও দেখা গিয়েছিল, সরকারি সহায়তা পাওয়া পুজো উদ্যোক্তাদের পুলিশ-প্রশাসন জোর করে কার্নিভালে অংশগ্রহণ করিয়েছিল। দশমীর দিন বালুরঘাটে সুকান্ত মজুমদারের উদ্যোগে 'সাংসদ শোভাযাত্রা' অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে ২৩টি পুজো উদ্যোক্তা অংশগ্রহণ করেছে। বালুরঘাট সৃজনী সঙ্ঘের সম্পাদক অরিন্দম চন্দ বলেন, 'তৃণমূল সরকারের আমলে কার্নিভালে আমরা অংশগ্রহণ করিনি। কারণ কার্নিভালের জন্য প্রত্যেকটি পুজো কমিটিকে বাড়তি আর্থিক সমস্যার মধ্যে পড়তে হতো। তবে এ বার সরকারি কার্নিভালের তুলনায় বালুরঘাটে সাংসদ শোভাযাত্রায় বেশি পুজো উদ্যোক্তা অংশগ্রহণ করেছে।' বালুরঘাট আর্য সমিতি ক্লাবের সদস্য সৌভিক তরফদার বলেন, 'দশমীর দু'তিন দিন পরে মণ্ডপে প্রতিমা, লাইট, সাউন্ড রাখতে হতো। যা আমাদের মতো ক্লাবের পক্ষে খুব চাপের ছিল। তাই কার্নিভাল বন্ধ হওয়ায় আফসোস নেই।'
তথ্য সহায়তা: মিঠুন ভট্টাচার্য, নীলাঞ্জন দাস, কৌশিক দে, চাঁদকুমার বড়াল, দিব্যেন্দু সিনহা, পিনাকী চক্রবর্তী, রূপক সরকার
