প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একটি ভালো কাজ’ কর্মসূচির আওতায় সুবিধাবঞ্চিত একাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভা। ওই শিক্ষার্থীকে শিক্ষা উপকরণ হিসেবে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির সব নতুন পাঠ্যবইসহ সহায়ক বই, তিন রিম কাগজ ও তিন ডজন কলম দিয়েছেন বন্ধুরা।
পাশাপাশি আগামী দুই বছর তাঁর পড়াশোনার যাবতীয় খরচ বহন করা হবে। ২৩ অক্টোবর বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনাইটেড কলেজের ওই শিক্ষার্থীর হাতে শিক্ষা উপকরণ তুলে দেওয়া হয়।
ওই শিক্ষার্থীর নাম সামিয়া বেগম। সে জেলা শহরের দক্ষিণ মৌড়াইল এলাকার আব্দুল হাইয়ের মেয়ে। তাঁর গ্রামের বাড়ি নাসিরনগর উপজেলার ভলাকুট ইউনিয়নের ঝামারবালি গ্রামে। মা, বাবা ও ভাই-বোনের সঙ্গে সে দক্ষিণ মৌড়াইল এলাকার একটি বাসায় ভাড়ায় থাকেন। তাঁর বাবা বর্তমানে বেকার। মাঝেমধ্যে ফেরি করে পণ্য বিক্রি করেন।
এক ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সামিয়া দ্বিতীয়। ছোট বোন লামিয়া আক্তার শহরের নিয়াজ মুহম্মদ উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ও সবার ছোট তানিশা আক্তারের বয়স চার বছর। বড় ভাই সাব্বির আহমেদ শহরের নিয়াজ মুহম্মদ স্টেডিয়াম মার্কেটের একটি মোটরসাইকেল মেরামতের দোকানে কাজ করেন। মাসে বেতন পান আট-নয় হাজার টাকা। তাঁর আয়েই চলে পুরো সংসার।
সামিয়া নিয়াজ মুহম্মদ উচ্চবিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগ থেকে এই বছর এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনাইটেড কলেজে ভর্তি হয়েছে সে; কিন্তু কলেজের পাঠদান শুরু হলে পরিবারের অর্থ–সংকটের কারণে কোনো বই কিনতে পারেনি। এ কথা জানতে পেরে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভা।
শুক্রবার বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনাইটেড কলেজে উপস্থিত হন বন্ধুসভার সদস্যরা। এ সময় কৃতী শিক্ষার্থী সামিয়াও উপস্থিত হন। শিক্ষা উপকরণ হিসেবে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির মানবিক বিভাগের ১৩টি নতুন বই, তিন ডজন কলম, তিন রিম কাগজ তাঁর হাতে তুলে দেন বন্ধুরা। পাশাপাশি আগামী দুই বছর পড়াশোনার বিষয়ে তাঁকে সব ধরনের সহায়তা করার আশ্বাস দেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভার সভাপতি ও কলেজশিক্ষক শাজাহান মিয়া বলেন, ‘সামিয়া দরিদ্র পরিবারের সন্তান। অভাব-অনটন পরিবারের নিত্যসঙ্গী। তবে দারিদ্র্য তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। টিউশন করে এবং পুরোনো বই পড়ে এসএসসি পরীক্ষায় পেয়েছে জিপিএ-৫। পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনাইটেড কলেজ কর্তৃপক্ষ ভর্তির ফি সম্পূর্ণ মওকুফ করেছে। তবে টাকার জন্য সে বই কিনতে পারেনি। তাঁর উচ্চশিক্ষার পথে অর্থ–সংকটের বিষয়টি কলেজের শিক্ষকদের কাছ থেকে জেনেছি। তাই একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির সব বইসহ শিক্ষা উপকরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সেটি বাস্তবায়ন করেছি। ইচ্ছুক হলে আমার কাছে বাংলা পড়তে আসার আহ্বান জানিয়েছি। এ ছাড়া যেকোনো বিষয়ে কোনো শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে চাইলে, প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক বিনা মূল্যে ব্যবস্থা করে দেবেন।’
সামিয়া বেগম বলেন, ‘পরিবারে আমার বড় ভাই একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। সংসারের খরচ চালাতে ভাই অনেক পরিশ্রম করছেন। সংসারের অভাব–অনটনের জন্য নবম শ্রেণিতে থাকাকালীন টিউশনি করেছি। বর্তমানে বইকেনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। বন্ধুসভা আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের এই ভালো কাজে আমি অনেক উপকৃত হয়েছি। তারা আগামী দিনেও আমার পাশে থাকার ও সব ধরনের সহায়তা দেবে বলে জানিয়েছে। তাদের এই সহায়তা সারা জীবন স্মরণ রাখব। ভালোভাবে পড়াশোনা করে এইচএসসিতে ভালো ফল করে তাদের সহায়তার মান রাখতে চাই।’
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বন্ধুসভার সভাপতি শাজাহান মিয়া, সহসভাপতি শারমীন আক্তার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলিয়া মাহবুব, দুর্যোগ ও ত্রাণ সম্পাদক কৃষ্ণা মৈশান ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক নাজরিন আক্তার এবং বন্ধুসভার উপদেষ্টা ও প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক শাহাদৎ হোসেন। বই ও শিক্ষা উপকরণ সামিয়ার বাড়িতে পৌঁছে দেন বন্ধু শারমীন আক্তার ও নাজরিন আক্তার।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভা
