গ্রামের দরিদ্র কৃষক রহিম মিয়া। জীবনের সব সঞ্চয়, ঘাম আর শ্রম দিয়ে এক টুকরো জমি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন তিনি। সেই জমিই তার পরিবারের অন্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ আর বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। কিন্তু একদিন প্রভাবশালী এক ব্যক্তি জমিটির মালিকানা দাবি করে বসেন। প্রতিবাদ করতে গিয়ে রহিম মিয়া বুঝতে পারেন, নিজের সত্যকে প্রমাণ করার জন্য শুধু সততা আর ন্যায্য অধিকার থাকলেই চলে না; প্রয়োজন অর্থ, প্রয়োজন আইনজীবী, প্রয়োজন দীর্ঘ বিচারিক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য। বুকভরা সাহস নিয়ে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আইনজীবীর ফি, কাগজপত্র সংগ্রহ, আদালতে যাতায়াত আর মামলার আনুষঙ্গিক খরচের হিসাব শুনে তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। যে মানুষটি প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খান, তার পক্ষে এত টাকা কোথায় পাওয়া সম্ভব? একদিকে নিজের ন্যায্য অধিকার হারানোর ভয়, অন্যদিকে মামলা চালাতে গিয়ে পরিবারকে অনাহার-অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা। শেষ পর্যন্ত আদালতের দরজায় পৌঁছানোর আগেই তার ন্যায়বিচারের স্বপ্ন যেন অর্থের অদৃশ্য দেয়ালে আটকে যায়। রহিম মিয়ার এই গল্প কাল্পনিক হলেও বাংলাদেশের অসংখ্য অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীর জীবনের নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। তাদের অনেকের কাছেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস আছে, সত্যের পক্ষে কথা বলার যুক্তি আছে, কিন্তু নেই সেই সত্যকে আইনের কাঠগড়ায় প্রতিষ্ঠিত করার আর্থিক সামর্থ্য। অথচ একটি সভ্য রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার কখনো অর্থবিত্তের কাছে জিম্মি থাকতে পারে না; আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার ধনী-দরিদ্র, প্রভাবশালী-প্রান্তিকÑ সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত হওয়াই রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও মানবিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের এই বাস্তবতায় সরকারি খরচে আইনগত সহায়তা বা লিগ্যাল এইড অসহায় মানুষের সামনে আশার একটি দরজা খুলে দিয়েছে। জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার মাধ্যমে লাখো মানুষের কাছে আইনি সেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ তাই নিছক কোনো প্রশাসনিক সাফল্য নয়; এটি অর্থের অভাবে থমকে যাওয়া ন্যায়বিচারের পথে মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও আশার আলো ফিরিয়ে আনার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস।
জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার (লিগ্যাল এইড) সর্বশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে এক নতুন আশাবাদ। আইনি পরামর্শ, মামলা পরিচালনা ও সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে এ পর্যন্ত সরকারের বিনা মূল্যে দেওয়া সহায়তার সরাসরি উপকারভোগী হয়েছেন ১৯ লাখ ৫৫ জন মানুষ। এই বিশাল পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, বাংলাদেশ এখন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে ধাবমান কোনো রাষ্ট্র নয়; বরং একটি সুশাসিত ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রকাঠামোর ভিত্তি স্থাপনেও সমানভাবে অগ্রসর হচ্ছে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। অন্যদিকে, সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভকে নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার চরম সত্য হলোÑ উকিল ফি, কোর্ট ফি, সমন জারি ও বিচারপ্রক্রিয়ার আনুষঙ্গিক খরচের চাপে সমাজে পিছিয়ে পড়া মানুষের পক্ষে আদালত পর্যন্ত যাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে ২০০০ সালে পাস হয় আইনগত সহায়তা প্রদান আইন। পরে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের অধীনে গঠিত হয় জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা। এই আইনটি মূলত বাংলাদেশের বিচারিক ব্যবস্থার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। রাষ্ট্র এখানে কোনো দাতা বা সাহায্যকারী নয়; বরং একজন অভিভাবক হিসেবে অসচ্ছল, অসহায় ও বিচারপ্রার্থী নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় সরাসরি এগিয়ে এসেছে।
জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে যে সার্বিক চিত্র ফুটে উঠেছে, তা কেবল কিছু সংখ্যা নয়; তা হলো ১৯ লাখের বেশি মানুষের বিচারিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রামাণ্য দলিল। সার্বিক বিচারিক পরিসংখ্যানে লিগ্যাল এইড সেবার ক্ষেত্রভিত্তিক বিভিন্ন রূপ দেখতে পাওয়া যায়। মূল বিচারিক ব্যবস্থার চালিকাশক্তি হিসেবে ৬৪টি জেলা আদালত কার্যালয়ের মাধ্যমে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চসংখ্যক, অর্থাৎ ১৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬১৭ জন অসচ্ছল বিচারপ্রার্থী জেলা পর্যায়ের এই অফিসগুলোর মাধ্যমে সরাসরি আইনি সহায়তা ও বিনা মূল্যে আইনজীবী সেবা পেয়েছেন। পাশাপাশি, প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে আইনি সেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে জাতীয় হেল্পলাইন কল সেন্টার চালু করা হয়েছে, যেখান থেকে টোল-ফ্রি নম্বর ১৬৬৯৯-এ কল করে বিনা মূল্যে আইনি পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা পেয়েছেন ২ লাখ ৭৪ হাজার ৭৯ জন নাগরিক।
বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তরে, অর্থাৎ হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগেও যেন অর্থের অভাবে কেউ অন্যায়ের শিকার না হন, সে জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস, যার মাধ্যমে সেবা লাভ করেছেন ৩১ হাজার ৪০৯ জন মানুষ। শিল্পাঞ্চল ও উৎপাদন খাতে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের অধিকার সুরক্ষায় ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিশেষভাবে চালু করা শ্রম সেলের মাধ্যমে বিনা মূল্যে সহায়তা পেয়েছেন ৩০ হাজার ৬৫৮ জন শ্রমিক। অন্যদিকে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তরুণ ও প্রযুক্তিবান্ধব প্রজন্মের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে শুরু হওয়া সেবা ইতোমধ্যে ৪৫৭ জন মানুষকে দ্রুত পরামর্শ ও তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে। সব মিলিয়ে সরাসরি বিনা মূল্যে লিগ্যাল এইড সেবাপ্রাপ্ত উপকারভোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৬৩ হাজার ৬২০।
আইনি প্রতিকারের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে জনসচেতনতার ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আইনি অধিকার, যৌতুক নিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের উপায়-সম্পর্কিত বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের আরও ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৩৫ জন মানুষকে আইনি বিষয়ে সচেতন করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় খরচে লিগ্যাল এইডের সুবিধাভোগী মোট জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৫৫।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো মামলার জট। লাখ লাখ মামলা বছরের পর বছর ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে, যা বিচারপ্রার্থীদের জন্য মানসিক ও আর্থিক চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা শুধু আদালতে আইনজীবী নিয়োগ করে মামলা লড়ছে তা-ই নয়, সংস্থাটি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা অল্টারনেটিভ ডিসপিউট রেজল্যুশন ব্যবস্থার ওপরও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। পারিবারিক জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ, দেনমোহর ও খোরপোশ উদ্ধার, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা ছোটখাটো দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধগুলো লিগ্যাল এইড অফিসের মধ্যস্থতায় আপস-মীমাংসা করে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বিচারপ্রার্থী মানুষ আদালতের দীর্ঘসূত্রতা ও অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই দ্রুত সুরাহা পাচ্ছেন এবং জেলা আদালতগুলোর ওপর থেকে মামলার নতুন চাপ বহুলাংশে হ্রাস পাচ্ছে। এতে করে সামাজিক বিরোধ আদালত পর্যন্ত না গড়িয়ে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নিরসন হওয়ায় সমাজে শান্তি বজায় থাকছে।
এই সরকারি ব্যবস্থার সামাজিক প্রভাব বহুমাত্রিক। লিগ্যাল এইডের সুবিধাভোগীদের একটি বড় অংশই হলেন প্রান্তিক নারী, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী এবং দরিদ্র দিনমজুর। বহু নারীÑ যারা স্বামীর দ্বারা পরিত্যক্ত, যৌতুকের কারণে নির্যাতিত কিংবা যৌক্তিক খোরপোশ পাচ্ছিলেন না। আজ লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে বিনা মূল্যে বিচারালয়ে লড়াই করছেন এবং নিজেদের অধিকার ফিরে পাচ্ছেন। একইভাবে, শ্রমজীবী মানুষ, যাদের কারখানা বা মালিকপক্ষের সঙ্গে আইনি লড়াই চালানোর সামর্থ্য ছিল না, তারা ঢাকা ও চট্টগ্রামের শ্রমিক আইনি সহায়তা সেলের মাধ্যমে বিচারিক নিরাপত্তা পাচ্ছেন। টোল-ফ্রি হেল্পলাইনের সুবাদে দূর-দূরান্তের গ্রাম বা চরাঞ্চলের একজন মানুষও ঘরে বসেই ফোনকলের মাধ্যমে নিজের আইনি সমস্যা সমাধান বা করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন, যা আগে ধারণার বাইরে ছিল।
জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা ১৯ লাখ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে ১৮ কোটির বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশে এই সেবার পরিধি ও গুণগত মান আরও বৃদ্ধি করার বড় সুযোগ রয়েছে। লিগ্যাল এইড পরিষেবাকে আরও কার্যকর করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। প্যানেল আইনজীবীরা যাতে আরও আন্তরিকতার সঙ্গে অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের মামলা পরিচালনা করেন, সে লক্ষ্যে তাদের সম্মানী কাঠামো আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন এবং নিয়মিত বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চল, হাওর, চর ও পার্বত্য এলাকার বহু মানুষ এখনো সরকারি এই বিনা মূল্যের সেবার কথা পুরোপুরি জানেন না। তাই স্থানীয় পর্যায় ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালানো জরুরি। একই সঙ্গে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা স্বয়ংক্রিয় সেবা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় বাজেটে আইনগত সহায়তা খাতের জন্য বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করা আবশ্যক।
পরিশেষে বলতে চাই, সবার জন্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়বদ্ধতা। ১৯ লাখের বেশি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে বিচারিক আলো পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে যে বিকাশ কেবল জিডিপি বাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের দরিদ্রতম নাগরিকটিরও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় নিরাপত্তা ও বিচার পাওয়ার সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা রয়েছে। সুতরাং জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখে রাষ্ট্র ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগে দেশের প্রত্যেক নাগরিক যেন আইনের সমান আশ্রয় পান, তা সুনিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। মহান আল্লাহ সুবহানা তায়ালা আমাদের সহায় হোন।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
