প্রশাসনের কর্মকর্তা পরিচয়ে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) লেখা কালো কটি পরে ব্যবসায়ীকে অপহরণ, ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি ও হত্যার হুমকি- এসব অভিযোগে চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্যসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। এছাড়া অপহরণের চারদিন পর জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকেও।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।
জানা গেছে, অপহৃত ব্যক্তিকে আটকে রাখা হয় টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকায়। তবে শেষরক্ষা হয়নি তাদের। অভিযানে গ্রেপ্তার হন চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য সুমন মুন্সি, মিজানুর রহমান, জয়নাল উদ্দিন, মো. আব্বাস উদ্দিন, মো. ছলিম ওরফে সেলিম এবং দেলোয়ার হোসেন। এসময় তাদের কাছ থেকে একটি প্রাইভেট কার, এসআরবি লেখা পাঁচটি কালো কটি, দুটি ভুয়া পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করেছে পুলিশ।
ঘটনার সূত্রপাত ১৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে। বাঁশখালীর পুঁইছড়ি প্রেমবাজারে মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি হার্ডওয়্যারের দোকানে ঢুকে চার-পাঁচজন ব্যক্তি। তাদের পরনে ছিল এসআরবি লেখা কালো কটি, মাথায় ক্যাপ ও মুখে মাস্ক। নিজেদের এসআরবির সদস্য পরিচয় দিয়ে হাসানের বিরুদ্ধে মামলা থাকার কথা বলে প্রথমে তাকে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়। এরপর তাকে দোকান থেকে তুলে প্রথমে সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং পরে মাইক্রোবাসে করে নিয়ে যায়।
অপহরণের পর হাসানের স্ত্রী ও দোকানের ব্যবস্থাপকের কাছে বিভিন্ন ফোন নম্বর থেকে কল করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাকে হত্যা করার হুমকি দেওয়া হয়। পরিবারের কাছে গলায় ছুরি ধরে হত্যার হুমকির ভিডিও পাঠানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে হাসানের ভাই মো. হোছাইম বাঁশখালী থানায় মামলা করেন।
মামলার সূত্র ধরে অপহরণকারীদের শনাক্ত ও ব্যবসায়ীকে উদ্ধারে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বাঁশখালী থানা পুলিশের যৌথ দল কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায়। পরে অভিযুক্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে অপহরণকারীদের শনাক্ত করা হয়। পরে কক্সবাজার থেকে উখিয়া পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য সুমন মুন্সিসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, অপহৃত হাসানকে টেকনাফের ২৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছে। ক্যাম্পের ভেতরে সরাসরি অভিযান ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কৌশলে অপহরণকারীদের মাধ্যমে তাকে বাইরে আনার ব্যবস্থা করা হয়। পরে ২১ অক্টোবর ভোর চারটার দিকে লেদা-আলীখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকা থেকে হাসানকে উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, উদ্ধারের সময় হাসানের চোখ ও হাত বাঁধা ছিল। প্রায় চার দিন তাকে আটকে রেখে মাত্র একবার খাবার দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। তার সঙ্গে নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে। সুমন মুন্সি ২০২১ সালে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে চাকরি থেকে অপসারিত হন। তার বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা রয়েছে। এছাড়া জয়নাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে তিনটি, ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে দুটি এবং আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে একটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ এও জানিয়েছে, বাঁশখালীর স্থানীয় ব্যক্তি আব্বাস উদ্দিন অপহরণের ঘটনায় তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ে জড়িত ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। চক্রটি কক্সবাজার, উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া, কুতুবদিয়া, বান্দরবান ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের সঙ্গে জড়িত কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
অপহরণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ব্যবসায়ী হাসান জানান, রাত সাড়ে ৮টার দিকে চার-পাঁচজন এসআরবি লেখা পোশাক পরে তার দোকানে ঢুকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যায়। পরে মুখে টেপ লাগিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নেওয়া হয়। একটি বাড়িতে আটকে রেখে অস্ত্র দেখিয়ে হত্যার ভয় দেখানো হয়। তার হাত ও চোখ বাঁধা ছিল। পুলিশ তাকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করায় চট্টগ্রাম পুলিশ প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান তিনি। একইসঙ্গে জনসাধারণকে পুলিশের প্রতি আস্থা রাখার অনুরোধ করেন।
