ছেলে ও মেয়েদের রান মিলিয়েই নির্ধারিত হবে দলের জয়-পরাজয়। ৮০ ওভারের ব্যতিক্রমী এই ক্রিকেট সংস্করণের অভিষেক হতে যাচ্ছে আগামী ১৪ নভেম্বর, শ্রীলঙ্কার কলম্বোয়।
টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির পর এবার মাঠে গড়াতে যাচ্ছে ক্রিকেটের নতুন সংস্করণ ‘টেস্ট টোয়েন্টি’। এই ফরম্যাটের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, একই দলের হয়ে ছেলে ও মেয়েরা আলাদা একাদশে খেললেও দুই দলের রান যোগ করে নির্ধারণ করা হবে ম্যাচের ফল।
আগামী ১৪ থেকে ২৯ নভেম্বর শ্রীলঙ্কার কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব (এসএসসি) মাঠে বসবে টেস্ট টোয়েন্টির প্রথম আসর। ৩০ নভেম্বর রাখা হয়েছে বিকল্প দিন হিসেবে। আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৪ নভেম্বর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হবে প্রতিযোগিতা, আর ২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাছাই করা ১৩ থেকে ২১ বছর বয়সী ১৬০ জন তরুণ ক্রিকেটার অংশ নেবেন এই টুর্নামেন্টে। চারটি মহাদেশীয় দলে ভাগ করা হবে তাদের। প্রতিটি দলে থাকবেন ৪০ জন খেলোয়াড়, ২০ জন ছেলে ও ২০ জন মেয়ে।
টেস্ট টোয়েন্টির নিয়ম প্রচলিত ক্রিকেটের তিনটি প্রধান সংস্করণের চেয়ে আলাদা। প্রতিটি ম্যাচে থাকবে মোট ৮০ ওভার। দিনের প্রথম ৪০ ওভার খেলা হবে সাদা পোশাকে লাল বলে। এরপর দ্বিতীয় ৪০ ওভার অনুষ্ঠিত হবে রঙিন পোশাকে সাদা বলে, এসএসসি মাঠের ফ্লাডলাইটের আলোয়।
একই ম্যাচে লাল ও সাদা বল ব্যবহারের পাশাপাশি এই ফরম্যাটের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, প্রথমার্ধের রান দ্বিতীয়ার্ধে নতুন করে শূন্য থেকে শুরু হবে না। অর্থাৎ, দিনের প্রথম ৪০ ওভারে করা রান দলের মোট সংগ্রহে যোগ থাকবে। দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শেষে দুই পর্বের সম্মিলিত রানই নির্ধারণ করবে জয়ী দল।
প্রতিটি মহাদেশীয় দলের আলাদা মেয়েদের একাদশ ও ছেলেদের একাদশ থাকবে। মেয়েরা খেলবেন মেয়েদের বিপক্ষে, আর ছেলেরা খেলবেন ছেলেদের বিপক্ষে। তবে দুই একাদশের রান যোগ হয়ে তৈরি হবে দলের সম্মিলিত স্কোর।
টসের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে কোন দল আগে ব্যাট করবে এবং প্রথমে মাঠে নামবে সেই দলের মেয়েদের নাকি ছেলেদের একাদশ। ‘প্যারিটি রুল’ অনুযায়ী, দিনের প্রথম পর্বে মেয়েদের করা রান রাতের ফ্লাডলাইটের নিচে ছেলেদের একাদশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একইভাবে, দ্বিতীয় পর্বে ছেলেদের করা রানও দলের সামগ্রিক ফল নির্ধারণে মেয়েদের একাদশের অবদান হিসেবে গণ্য হবে। পরবর্তী ম্যাচে টসের ওপর নির্ভর করে এই ক্রম বদলে যেতে পারে।
আয়োজকদের ভাষ্য, এই ব্যবস্থায় মেয়েদের ম্যাচকে মূল খেলার আগে আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে দেখা হবে না। বরং দলের মোট ফলাফলের অর্ধেক নির্ভর করবে তাদের পারফরম্যান্সের ওপর। ছেলে ও মেয়েরা পুরো দিন একই ডাগআউটে বসে সতীর্থদের খেলা দেখবেন, কারণ প্রত্যেকের রানই দলের সম্মিলিত সাফল্যে ভূমিকা রাখবে।
টেস্ট টোয়েন্টির প্রথম আসরের জন্য শ্রীলঙ্কাকে বেছে নেওয়ার পেছনে দেশটির সমৃদ্ধ স্কুল ক্রিকেট সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী আন্তস্কুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন আয়োজকেরা।
দেশটির বিখ্যাত স্কুল ক্রিকেট প্রতিযোগিতা ‘রয়্যাল-থমিয়ান’ প্রথম অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৭৯ সালে। ২০২৬ সালের মার্চে এসএসসি মাঠে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ১৪৭তম আসর অনুষ্ঠিত হয়। শ্রীলঙ্কায় স্কুল ক্রিকেট ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ নতুন ফরম্যাটটির অভিষেকের জন্য দেশটিকে উপযুক্ত বলে মনে করছেন আয়োজকেরা।
সনৎ জয়াসুরিয়া, মুত্তিয়া মুরালিধরন, কুমার সাঙ্গাকারা ও মাহেলা জয়াবর্ধনের মতো বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটার উপহার দিয়েছে শ্রীলঙ্কা। ২০০৬ সালে এসএসসি মাঠেই সাঙ্গাকারা ও জয়াবর্ধন টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৬২৪ রানের জুটি গড়েছিলেন।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, দেশটির ক্রিকেট ঐতিহ্য ও তরুণ ক্রিকেটারদের প্রতি মানুষের আগ্রহ টেস্ট টোয়েন্টির যাত্রাকে আরো অর্থবহ করে তুলবে।
টুর্নামেন্টে জায়গা পেতে পাঁচ মহাদেশের হাজারো তরুণ ক্রিকেটার আবেদন করেছিলেন। প্রায় ৩০০ দিন ধরে মাঠপর্যায়ের ও অনলাইন ট্রায়ালের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত খেলোয়াড় নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে রয়েছে গ্লোবাল সিলেকশন কমিটি, যার চেয়ারম্যান ভারতের কোচ রাজকুমার শর্মা। তরুণ বয়সে বিরাট কোহলির প্রতিভা শনাক্ত করা এবং তার ক্রিকেটীয় বিকাশে ভূমিকা রাখার জন্য পরিচিত এই কোচ।
অক্টোবরের শেষ দিকে খেলোয়াড়দের ড্রাফটের মাধ্যমে চূড়ান্ত ১৬০ জনের নাম ঘোষণা করা হবে। তাদের মধ্যে থাকবেন ৮০ জন ছেলে ও ৮০ জন মেয়ে। তারাই হবেন টেস্ট টোয়েন্টির প্রথম প্রজন্মের ক্রিকেটার।
নতুন এই ফরম্যাটের উপদেষ্টা পর্ষদে রয়েছেন সাবেক কিংবদন্তি ক্রিকেটার এবি ডি ভিলিয়ার্স, ম্যাথু হেইডেন ও স্যার ক্লাইভ লয়েড। টুর্নামেন্ট পরিচালনার দায়িত্বে আছেন মাইক ফোর্ডহ্যাম, আর বাণিজ্যিক কৌশল দেখভাল করছেন সহ-প্রতিষ্ঠাতা রোহিত মারু।
টেস্ট টোয়েন্টির প্রতিষ্ঠাতা ও ‘প্যারিটি রুল’-এর প্রণেতা গৌরব বাহিরওয়ানি জানিয়েছেন, তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য নতুন একটি ফরম্যাট ও প্রতিযোগিতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে এই আয়োজনের মাধ্যমে।
তার মতে, ছেলে ও মেয়েদের সমান অংশগ্রহণ শুধু খেলার নিয়মে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং সম্প্রচারেও থাকবে সেই সমতার প্রতিফলন। কোনো রাতে মেয়েরা ফ্লাডলাইটের নিচে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে খেলবেন, অন্য রাতে সেই সুযোগ পাবেন ছেলেরা। তবে প্রতিটি ম্যাচের ফল নির্ধারিত হবে একটি সম্মিলিত স্কোরবোর্ডে।
