বিল্টু মামার মেজাজ তিরিক্ষি। শত চেষ্টা করেও নিউজে আসতে পারছেন না। গত শীতে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছেন; ছবিতে কম্বলের আড়ালে মুখ ঢাকা পড়েছে। বৃক্ষরোপণ করেছেন; পত্রিকায় নাম এসেছে সভাপতির, মামাকে দেখা গেছে পেছনে কোদাল হাতে। প্রতিবাদে মানববন্ধনে দাঁড়িয়েছিলেন; ব্যানারটা তাঁর উচ্চতার চেয়ে বড় হওয়ায় কেবল তাঁর পা দেখা যাচ্ছে।
অথচ দুই দিনের তারকাদের ঘর ভাঙলেও সংবাদ হয়! কেউ ঘর ভেঙে আলোচনায় আসেন, কেউ আলোচনায় আসার জন্য ঘর ভাঙেন। মামা দুটো পথই পরীক্ষা করতে চান। সমস্যা হলো, তিনি তারকা নন। মামি নিজেও ডিভোর্সে রাজি নন। মামা নাছোড় হয়ে তিন দিন বোঝালেন। বললেন, ‘প্রতিবছর আমরা ঘটা করে “বিচ্ছেদ দিবস” পালন করব।’ উম, মামি এতেও রাজি নন।
মামা মনে মনে বুদ্ধি আঁটলেন। বাড়ির সামনের পুরোনো ঘরটা বহুদিন ধরে খালি। এ ঘরটাই ভাঙবেন।
ঘর ভাঙার শ্রমিক ডাকলেন। সংবাদকর্মীদের আমন্ত্রণ পাঠালেন। দুই সাংবাদিক এলেন। একজন স্থানীয়, অন্যজন ভুল ঠিকানায়। মামা দুজনকেই সমান যত্নে বসালেন। ভুল করে আসা মানুষটিকেও বিরিয়ানি খাইয়ে সঠিক মানুষ বানানোর চেষ্টা করলেন।
একজন বুদ্ধি দিল, স্ত্রীকে সামনে রাখেন। মেয়েরা উদ্যোগ নিলে নিউজ করতে সুবিধা হয়।
ঘর ভাঙা শুরু হতেই পাশের স্কুলের প্রধান শিক্ষক এসে মামাকে জড়িয়ে ধরলেন। মামা ভাবলেন, ব্যক্তিগত শোক প্রকাশ করছেন। কিন্তু কাহিনি ভিন্ন। ঘরটির বাড়তি অংশের জন্য স্কুলের গলিটা সরু ছিল। শিশুদের চলাচলে অসুবিধা হতো। ঘর সরায় রাস্তা চওড়া হবে।
মামা বুক ফুলিয়ে ক্যামেরার দিকে ফেরেন। প্রধান শিক্ষক বললেন, ‘এই মহৎ কাজের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ভাবিকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। তিনি সত্যিই একজন মহীয়সী নারী।...’
মামি মাথা নেড়ে মৃদু হাসলেন। এদিকে মামার হাতের হাতুড়ি হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
পরদিন সংবাদ বেরোল, ‘শিশুদের নিরাপত্তায় নিজের ঘর ভাঙলেন নারী’।
বড় ছবিতে মামি। পাশে প্রধান শিক্ষক। নিচের কোণে মামা, হাতে হাতুড়ি। সঙ্গে সঙ্গে মামা সাংবাদিককে ফোন করে নিজের নাম কোথায় আছে তা জানতে চাইলেন।
প্রতিবেদনে নাকি স্ত্রীকে স্বামীর সহযোগিতার কথা উল্লেখ আছে।
খুশির চোটে সন্ধ্যায় মামি সংবাদটি বাঁধিয়ে আনলেন। এদিকে মামা হিসাব কষছেন, ঘর ভাঙার মজুরি, মাইক, ব্যানার, বিরিয়ানি...। নিজের নামের প্রতি অক্ষরে প্রায় হাজার দুই খরচা।
এর মধ্যে মামি ফেসবুকে সংবাদটি দিয়েছেন। অভিনন্দন আসছে। এক সংগঠন তাকে সংবর্ধনাও দেবে। মামার দায়িত্ব মামিকে ঠিকমতো পৌঁছে দেওয়া।
মামা ভারাক্রান্ত মনে বাঁধানো সংবাদটি নামিয়ে সেখানে নিজের একটা বড় ছবি টাঙালেন।
মামি খেপে গেলেন। এমন মানুষের সঙ্গে সংসার করার চেয়ে আলাদা থাকাই ভালো।
কথাটা শুনে মামার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এত দিনে গিন্নি রাজি! তা ছাড়া মামি এখন পরিচিত মুখ। তার ঘর ভাঙলে নিশ্চয়ই খবর হবে!
সাংবাদিককে ফোন করতেই সম্ভাব্য শিরোনামও জানালেন, ‘ঘর ভাঙা সেই নারীর সংসারও ভাঙছে!’
মামা নিজের নামের জায়গাটার কথা জানতে চান, সাংবাদিক আশ্বস্ত করে বলেন, ভেতরে থাকবে, স্বামীর কারণেই সংসার ভাঙছে...!
মামা ফোন রেখে তাড়াতাড়ি মামির সংবাদের ছবিটা আবার টাঙিয়ে দিলেন।
