সাত বছর বয়সে থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ে জামালপুরের আবিয়ার। বিয়ের চার বছর পর অসুস্থতা ও চিকিৎসার ব্যয়ের কারণে স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যান। এখন ছেলেকে নিয়ে মা-বাবার সঙ্গে থাকেন তিনি। চিকিৎসার জন্য মাসে একবার, কখনো দুবার ঢাকায় আসতে হয় তাকে। যাতায়াত ও থাকা-খাওয়াসহ চিকিৎসায় প্রতি মাসে তার পরিবারের ব্যয় হয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার বেশি। গত বছর তার যকৃতে সমস্যা ধরা পড়েছে। গত সাত মাস ধরে রক্তদাতার ব্যবস্থা করাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
আবিয়ার মতো থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত প্রায় ৯ হাজারের অধিক রোগীদের চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তায় কাজ করছে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন। তবে বিশেষজ্ঞরা মতে, শুধু চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেই এ রোগের বোঝা কমানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, বাহক শনাক্তে পরীক্ষা এবং বিয়ের আগে বা সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনার সময় প্রয়োজনীয় পরামর্শ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের জাতীয় থ্যালাসেমিয়া জরিপ অনুযায়ী, দেশে থ্যালাসেমিয়ার বাহক ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। তাদের ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ জানেন না যে তারা এ রোগের বাহক। জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ৯৬ শতাংশ কখনো থ্যালাসেমিয়া শনাক্তের পরীক্ষা করাননি। ৮ হাজার ৬৮০ জনের ওপর এ জরিপ পরিচালিত হয়।
বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দা মাসুমা রহমান বলেন, থ্যালাসেমিয়া বংশগত রোগ। বাবা-মা দুজনই এ রোগের বাহক হলে তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বিয়ের আগে কিংবা সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনার সময় দুজনেরই পরীক্ষা করানো জরুরি। এতে ঝুঁকি সম্পর্কে আগেই জানা যায় এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।

তিনি বলেন, থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এ জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে রোগটির কারণ, বাহক শনাক্তের পরীক্ষা এবং প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে জানাতে হবে। থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না, তা জানতে হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস পরীক্ষা করা হয়। ফাউন্ডেশনে এ পরীক্ষার খরচ প্রায় এক হাজার টাকা বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তবে দেশে অনেক মানুষ এ পরীক্ষা সম্পর্কে জানেন না, আবার অনেকে খরচের কথা ভেবে পরীক্ষা করাতে আগ্রহী হন না।
বিবিএসের জরিপে দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের ৮৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক হওয়ার বিষয়ে জানেন না। শহরাঞ্চলে এ হার ৬৭ দশমিক ২ শতাংশ। ময়মনসিংহ বিভাগে এ বিষয়ে অজ্ঞতার হার ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ। জরিপ অনুযায়ী, পুরুষদের ৯৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং নারীদের ৯৭ দশমিক ৭ শতাংশ কখনো থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করাননি।

২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন রোগীদের চিকিৎসাসেবা, রক্ত সঞ্চালন, পরীক্ষাগার ও ওষুধ সরবরাহের মতো সেবা দিয়ে আসছে। ফাউন্ডেশনের যাকাত তহবিল থেকে গত বছর ২ হাজার ৮০০ রোগীকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। অমুসলিম দরিদ্র রোগীদের জন্যও রয়েছে পৃথক সহায়তা তহবিল। ঢাকার বাইরে থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের জন্য তিন দিনের বিনা মূল্যের আবাসনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
থ্যালাসেমিয়ার গুরুতর ধরনে আক্রান্ত অনেক রোগীকে নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন করতে হয়। বারবার রক্ত নেওয়ার ফলে শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমতে পারে, যা যকৃৎ ও হৃৎপিণ্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। এ ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শে আয়রন অপসারণের ওষুধ বা ‘আয়রন চিলেশন থেরাপি’ নিতে হয়। রোগের জটিলতা ও চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী তাঁদের প্রতি মাসে প্রায় ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা বা তারও বেশি ব্যয় হতে পারে। আবিয়ার মতো রোগীদের জন্য চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে যখন নিয়মিত রক্ত, ওষুধ ও যাতায়াতের ব্যয় বহন করতে হয়। ফাউন্ডেশন থেকে সহায়তা পেলেও সব খরচ মেটানো অনেক পরিবারের পক্ষে সম্ভব হয় না।

অধ্যাপক ডা. সৈয়দা মাসুমা রহমানের মতে, থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ ও আক্রান্ত ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। সাশ্রয়ী পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো, নিরাপদ রক্তের সরবরাহ নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় ওষুধ সহজলভ্য করা এবং জেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ জরুরি। থ্যালাসেমিয়ার বাহক হওয়া মানেই অসুস্থ হওয়া নয়। কিন্তু নিজের বাহক-অবস্থা না জানার কারণে ভবিষ্যৎ সন্তানের জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই বিয়ের আগে বা সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনার সময় একটি পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে ইতোমধ্যে আক্রান্ত রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে আবিয়ার মতো মানুষকে শুধু রোগের সঙ্গে নয়, চিকিৎসার ব্যয় ও সামাজিক প্রতিকূলতার সঙ্গেও একা লড়তে না হয়।
এমএল/এমএন
