কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে কাঠের তৈরি টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে আগুনে পুড়ে মরদেহ বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাদের পরিচয় এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়াসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে যশোরের একই পরিবারের চার সদস্যের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেন মণিরামপুর
পৌর শহরের মোহনপুর এলাকার মতিয়ার রহমানের ছেলে নাহিদুর রহমান (৪১), তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৫) এবং তাদের দুই মেয়ে রুজাইনা ইনায়া (৭) ও সুনাইনা ইহানা (৩)। তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে স্বজনদের। উদ্ধার হওয়া মরদেহের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে প্রশাসন।
নিখোঁজ নাহিদুর রহমানের বড় ভাই জাহিদুর রহমান জানান, নাহিদুর ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। তিনি মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় বসবাস করেন।
জাহিদুর রহমান বলেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অবকাশযাপনে গিয়েছিলেন নাহিদুর। ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত রিসোর্টের একটি কক্ষ বুকিং দিয়েছিলেন। ১৮ অক্টোবর দুপুর ১টায় তাদের রিসোর্ট ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। শুক্রবার কক্সবাজার যাওয়ার কথা আমাদের জানিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, শনিবার রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর নাহিদুরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। কিন্তু তার ও পরিবারের অন্য সদস্যদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ঘটনার পর থেকে তাদের খোঁজ নেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোনো সন্ধান পাচ্ছি না। তারা বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন, কিছুই নিশ্চিত হতে পারছি না। আমরা খুবই উদ্বেগের মধ্যে আছি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, ‘১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আমরা ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করেছি। আমাদের জানা মতে, কেউ নিখোঁজ নেই। মরদেহগুলো পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্তে জটিলতা তৈরি হয়েছে।’
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) ফিরোজ কবির বলেন, ১০টি মরদেহের দাবিদার হিসেবে অনেক পরিবার সামনে এসেছে। মরদেহগুলোর মুখমণ্ডল পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্তে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সে জন্য দাবিদার পরিবারগুলোর সদস্যদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ চলছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহগুলো তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে উখিয়া থানায় মামলা করেছে। মামলায় রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়াকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে। এজাহারে চারজনের নাম উল্লেখ করে ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রিসোর্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমন আহমদকেও মামলায় আসামি করা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আটক সুমনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান জানান, রিসোর্টের মালিকদের বাসায় অভিযান চালানো হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।
অনুমোদন ছাড়াই চলছিল রিসোর্ট
অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।
রবিবার দুপুর ১২টার দিকে তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় ব্যক্তিদের বক্তব্য নেন এবং আগুনের সূত্রপাত ও রিসোর্ট পরিচালনার বিভিন্ন অনিয়ম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তদন্ত কমিটির প্রধান তাসনীম জাহান সাংবাদিকদের বলেন, অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া রিসোর্টটির ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছিল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটিকে এর আগে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কার্যকর ব্যবস্থা নেননি বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তদন্ত শেষে প্রতিষ্ঠানটির অনিয়ম ও দায়দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হবে।
শনিবার সকালে ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। পুরো রিসোর্ট পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতায় উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। প্রায় সাত ঘণ্টার অভিযান শেষে ১০টি মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে অভিযান শেষ হয়।
ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে ছয়টি একটি কক্ষে এবং চারটি ওয়াশরুমে পাওয়া গেছে। ছয়জন ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যরা আগুন থেকে বাঁচতে ওয়াশরুমে আশ্রয় নিয়ে থাকতে পারেন।
ডিএনএ পরীক্ষার পর হস্তান্তর হবে মরদেহ
১০টি মরদেহ আগুনে পুড়ে মারাত্মকভাবে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় প্রচলিত উপায়ে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে মরদেহগুলোর ময়নাতদন্তের পাশাপাশি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা ডা. সবক্তগীন মাহমুদ জানান, রবিবার মরদেহগুলোর ময়নাতদন্ত এবং ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের নমুনার সঙ্গে সেগুলো মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার পর মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।
অতিথিদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং অতিথিদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত কমিটি এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে। আগুনের সূত্রপাত, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি এবং দায়িত্ব পালনে কারও অবহেলা ছিল কি না, তদন্ত শেষে তা স্পষ্ট হবে।
