Published on
:
2 min read
সূর্যকান্ত কুমার, কালনা
বয়স ৮১ পেরিয়েছে। অশক্ত শরীর, তার উপর ঝাপসা হয়ে এসেছে দৃষ্টিশক্তিও। তবুও হাতের জাদুতে এতটুকু মরচে পড়েনি। পূর্ব বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলীর পাটুলির মামুদপুরের প্রবীণ শিল্পী মোহন মালাকারের নিখুঁত ছোঁয়ায় তৈরি ডাকের সাজ এ বছরও মহাসমারোহে শোভা পাচ্ছে কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপ্রতিমাগুলিতে। ইতিমধ্যেই কলকাতা থেকে বরাত পেয়ে তৈরি সেই সাজ যথাসময়ে পৌঁছে গিয়েছে মহানগরীতে। তা দিয়ে দেবী প্রতিমাকে পরম যত্নে সাজিয়েও তোলা হয়েছে। পাথুরিয়াঘাটার আনন্দশঙ্কর ঘোষের বাড়ি এবং আলিপুরের অভিষেক ডালমিয়ার বাড়ির সাবেকি প্রতিমার অসামান্য রূপসজ্জা এখন নজর কেড়েছে সবার।
বংশপরম্পরায় প্রায় ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ডাকের সাজ তৈরির কাজ করে চলেছেন মোহন। এই প্রত্যন্ত এলাকায় তিনিই এখন একমাত্র শিল্পী, যিনি প্রাচীন এই শিল্পকে বুকে আগলে বেঁচে রয়েছেন। শারীরিক অসুস্থতা ও চোখের সমস্যার কারণে এ বছর কলকাতার বিখ্যাত ঠনঠনিয়া দত্তবাড়ি সমেত আরও কয়েকটি জায়গার বরাত এবং স্থানীয় এলাকার বহু পুজো কমিটির বায়না ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। থিমের পুজোর ভিড়ে যখন হারিয়ে যেতে বসেছিল সাবেকি ডাকের সাজ, তখন ফের এই শিল্পের কদর বাড়ায় খুশির হাওয়া বইলেও, দুঃখ একটাই— আজ যখন সুদিন এসেছে, তখন তাঁর শরীর আর আগের মতো সঙ্গ দিচ্ছে না।
Ei Samay
শোলা ও বিশেষ কাগজ দিয়ে নিখুঁত নকশা কেটে, মৃদু আগুনে আঠা গলিয়ে তার উপরে রকমারি জরি আর চুমকি বসিয়ে দীর্ঘ দু’মাস ধরে দিনরাত এক করে এই সাজ তৈরি করেছেন মোহন। বার্ধক্যের ক্লান্তিতে যখনই হাত থমকে গিয়েছে, পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন স্ত্রী নমিতা। তাঁদের যৌথ সাধনায় তৈরি হয়েছে এই অনবদ্য শিল্পকর্ম। মোহন স্মৃতিচারণ করে জানান, যৌবনে দু’টি সরকারি চাকরির সুযোগ পেলেও ভালোবাসার টানে পিতৃপুরুষের এই পেশাকেই তিনি আঁকড়ে ধরেছিলেন। একটা সময়ে থিমের রমরমায় ডাকের সাজের চাহিদা কমে গেলেও এখন আবার তার জোয়ার এসেছে, যা দেখে তাঁর মন গর্বে ভরে ওঠে।
তবে এই সাফল্যের আনন্দের মাঝেও প্রবীণ শিল্পীর কণ্ঠে ঝরে পড়েছে চাপা অভিমান ও না–পাওয়ার বেদনা। বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতার কারণে প্রতি মাসে কেবল ওষুধ কিনতেই দেড় হাজার টাকার মতো খরচ হয়। কিন্তু গত প্রায় পাঁচ মাস ধরে তাঁর সরকারি শিল্পী ভাতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম আর্থিক সঙ্কটে দিন কাটাতে হচ্ছে তাঁকে। দপ্তরে বহু কাগজপত্র জমা দিলেও এখনও ভাতা চালু না–হওয়ায় আক্ষেপের সুর শোনা গেল তাঁর গলায়। সরকারের পক্ষ থেকে অন্যান্য শিল্পী ও ভাতার পরিমাণ বাড়ানোয় অনেকের মুখে হাসি ফুটলেও, ৮১ বছরের এই বর্ষীয়ান শিল্পীর দাবি, ভাতাটা যদি আবার নিয়মিত চালু হতো, তবে জীবনের অন্তিম লগ্নে এসে ওষুধপত্র ও সংসার চালাতে অনেকটাই সুবিধা হতো।