সৌদি আরবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা নতুন করে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। রিয়াদ, জেদ্দা, দাম্মামসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও স্থাপনায় হামলা, তেল অবকাঠামোতে আগুন এবং বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনায় পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
সৌদি আরবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা নতুন করে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। রিয়াদ, জেদ্দা, দাম্মামসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও স্থাপনায় হামলা, তেল অবকাঠামোতে আগুন এবং বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনায় পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। এক সপ্তাহের মধ্যে সৌদি আরবের পাঁচটি বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে অন্তত ১০টি হামলার খবর পাওয়া গেছে। এতে বেশ কয়েক জন নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হয়েছেন। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বারবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় সৌদি কর্তৃপক্ষ বিমান চলাচল বন্ধ বা সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে।
সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্ন হলো দুই পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তা। সারাবিশ্বের মুসলমানদের জন্য এ দুটি পবিত্র নগরী হলো শ্রদ্ধা ও আবেগের স্থান। তারা সারা বছর উমরাহ পালন করতে সেখানে যান এবং জিলহজ মাসে পবিত্র হজ্ব পালন করেন। সেখানে রয়েছে কাবা শরীফ ও মসজিদে নববীসহ বিশেষ বিশেষ পবিত্র স্থাপনা, ধর্মীয় স্থান। ফলে এসব এলাকার সাথে মুসলমানদের আবেগ জড়িত। তারা কোনভাবেই এর ক্ষতি দেখতে আগ্রহী নয়।
গত সেপ্টেম্বরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট মক্কার দিকে আসা একটি হুতি ড্রোন প্রতিহত করার দাবি করেছিল। ওই ঘটনায় মক্কায় নিরাপত্তা সতর্কতাও জারি করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে পবিত্র নগরী ও মুসল্লিদের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখলেও হুতিরা মক্কা বা অন্য কোনো পবিত্র স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছিল। সাম্প্রতিক উত্তেজনায় বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। সৌদি সরকার মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর সতর্কতা দিয়েছে এবং হুতিদের হামলার পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে জানিয়েছে। হুতিদের সাম্প্রতিক বিমানবন্দর-সংক্রান্ত হুমকিতে মক্কা ও মদিনার আকাশসীমাকে লক্ষ্যবস্তু না করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তা মানা হচ্ছে কি না এটা বিশ্লেষকদের প্রশ্ন।
হুতিদের হামলার জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটও পাল্টা সামরিক অভিযান জোরদার করেছে। বুধবার আলজাজিরার খবরে বলা হয়, সৌদি-নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে হুথিদের জ্বালানি টার্মিনাল ও জ্বালানি মজুতাগারে হামলা চালিয়েছে। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছেন , সাধারণ নাগরিকদের কোনো ক্ষতি বা প্রাণহানি এড়াতে বাহিনীগুলো প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করেছে। এদিকে, রিয়াদ প্রদেশের আল-খারজ গভর্নরেটের ওপর দিয়ে ধেয়ে আসা একটি ক্রুজ মিসাইলকে মাঝপথেই প্রতিহত করা হয়েছে। সর্বশেষ পরিস্থিতিতে ইয়েমেনে হুতিদের জ্বালানি মজুত, তেল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে জোট। সৌদি কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, এসব হামলার উদ্দেশ্য হুতিদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং সৌদি আরবের ওপর হামলা ঠেকানো।
সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোতে হামলা, ইয়েমেনে তেল স্থাপনা ঘিরে পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি এবং রিয়াদমুখী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ঘটনা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সামরিক পাল্টা ব্যবস্থা যত বাড়বে, ততই বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বাড়বে। ইয়েমেন এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে থাকা দেশ। যুদ্ধ, খাদ্যসংকট, অবকাঠামো ধ্বংস ও বাস্তুচ্যুতির কারণে দেশটির সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বিপর্যস্ত। নতুন করে যুদ্ধ তীব্র হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। অন্যদিকে সৌদি আরবের জন্যও এই হামলা বড় অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনা হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া মানে শুধু কয়েকটি ভবন বা স্থাপনার ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, তেল রপ্তানি, পর্যটন, ওমরাহ-হজ্ব ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা।
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার পর সৌদি আরবের বিমান চলাচলে যে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, তা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বিমানবন্দর শুধু যাত্রী পরিবহনের কেন্দ্র নয়; সৌদি আরবের অর্থনীতি, ধর্মীয় পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান অবকাঠামো। বাংলাদেশ থেকেও সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়মিত যাতায়াত করেন। সাম্প্রতিক হামলার পর বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবগামী অন্তত আটটি ফ্লাইট বাতিল হওয়ার খবর এসেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আরও ফ্লাইট বাতিল হতে পারে। এতে ওমরাহযাত্রী, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশীদের পরিবারও ভোগান্তিতে পড়বে।
মক্কা শরীফের দিকে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হওয়াই মুসলিম বিশ্বের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। পবিত্র নগরীর নিরাপত্তা নিয়ে সামান্য সন্দেহও বিপুলসংখ্যক মুসল্লি ও ওমরাহযাত্রীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। তাই হুতি কিংবা সৌদি— কোনো পক্ষেরই এমন কর্মকাণ্ড বা বক্তব্য দেওয়া উচিত নয়, যা পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা। ১৩ অক্টোবর ধাহরানে সৌদি আরামকোর একটি প্রশাসনিক ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ভবনের ওপরের তিনটি তলা ক্ষতিগ্রস্ত এবং সীমিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এতে কেউ হতাহত হয় নি। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদক। তাই তেল উৎপাদন ও পরিবহন অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলা হলে তার প্রভাব শুধু সৌদি অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক বাজারেও জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে রিয়াদে হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে।
বাংলাদেশীদের জন্যও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবে লাখ লাখ বাংলাদেশী কাজ করেন—তাঁদের বড় একটি অংশ নির্মাণ, সেবা, পরিবহন, ব্যবসা ও বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। আমাদের রেমিটেন্সের বড় একটি অংশ আসে সেখান থেকে। ফলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি বাংলাদেশের জন্য শুধু কূটনৈতিক বা মধ্যপ্রাচ্যসংক্রান্ত বিষয় নয়; এটি সরাসরি লাখ লাখ বাংলাদেশী পরিবারের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক রিয়াদ বিমানবন্দর হামলার পর বাংলাদেশীদের হতাহতের ঘটনা সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। নিহত দুই বাংলাদেশীর একজন ছিলেন কর্মজীবী এবং অন্যজন ওমরাহ পালন করতে যাওয়া ব্যক্তি। আহত ২৪ বাংলাদেশীর মধ্যে প্রবাসী শ্রমিক যেমন রয়েছেন, তেমনি ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরবে যাওয়া ব্যক্তিও রয়েছেন। এর আগে ৪ অক্টোবর আল খুরাইস এলাকায় আরামকোর একটি স্থাপনায় হুতি হামলায় সাজিব হোসাইন নামে এক বাংলাদেশী নিহত হওয়ার খবরও বাংলাদেশ সরকার নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে সৌদি আরবে হুতি হামলায় বাংলাদেশীদের মৃত্যুর ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে।
প্রশ্ন হলো, ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যে যুদ্ধবিরতি ইয়েমেন-সৌদি সীমান্তে তুলনামূলক শান্তি এনেছিল, তা কেন আবার ভেঙে পড়ল? এর পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট, হুতিদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে তাদের বিরোধ এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংঘাত। ইয়েমেনে হুতিরা রাজধানী সানা ও দেশের বিস্তীর্ণ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের প্রতি সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশের সমর্থন রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনে আবার তীব্র লড়াই শুরু হয়েছে। তায়েজসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ও গোলাবর্ষণ বেড়েছে। ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ এখন আবার সৌদি ভূখণ্ডেও তার প্রভাব বিস্তার করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব। হুতিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বহুদিনের। ফলে ইয়েমেনের সংঘাতকে শুধু স্থানীয় গৃহযুদ্ধ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। ইরান, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের কৌশলগত অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে সংঘাতটি এখন বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংকটের অংশ হয়ে উঠেছে।
সৌদি আরবের বেসামরিক বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা বা আবাসিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান যত বাড়বে, ততই সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। ফলে পাল্টাপাল্টি হামলার মাধ্যমে এ সংঘাতের স্থায়ী সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক উদ্যোগই সবচেয়ে জরুরি। ইরান সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এসেছে। এই উদ্যোগ বাস্তব আলোচনায় রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘেরও আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। ইয়েমেনে একটি রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি না হলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগও যৌক্তিক। কারণ সৌদি আরবের ওপর ধারাবাহিক হামলা শুধু একটি দেশের নিরাপত্তা সমস্যা নয়; এর সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জড়িত।
সৌদি আরবের আত্মরক্ষার অধিকার অবশ্যই রয়েছে। একইভাবে কোনো রাষ্ট্রের বেসামরিক স্থাপনা, বিমানবন্দর বা সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। হুতিদের হামলা যেমন নিন্দনীয়, তেমনি পাল্টা হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটাও কাম্য নয়। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। জাতিসংঘের উচিত দ্রুত মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়া। সৌদি আরব, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার, হুতি এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে হবে। লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব ও সৌদি ভূখণ্ডের নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়বে।
বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি চাপে রয়েছে। নতুন করে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দর বা বিমানবন্দর আক্রান্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে তাদের ধারণা। তার আগেই কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।
