গভীর রাতে বাসের মধ্যে ঘুমিয়ে ছিলেন যাত্রীরা। হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তাদের। চোখ খুলতেই দেখেন, বাসের ভেতর চারদিকে রক্তাক্ত মানুষ। কেউ কাতরাচ্ছেন, কারও হাত-পা ভেঙে গেছে। একজনের ওপর পড়ে আছেন আরেকজন। পড়ে আছে কয়েকজনের নিথর দেহও। চারদিকে চিৎকার আর কান্না। দুর্ঘটনার ধাক্কায় প্রথমে অনেকে বুঝতেই পারেননি, নিজেরাও আহত হয়েছেন। কিছুক্ষণ পর শরীরের আঘাত টের পান তারা। প্রায় পাঁচ মিনিট পর উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন স্থানীয় লোকজন।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোররাতে নাটোরের বড়াইগ্রামে বালুবাহী ট্রাকের সঙ্গে আরপি পরিবহনের একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষের পর এমন দৃশ্যের অবতারণা হয়। এ দুর্ঘটনায় ১৪ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে নাটোর জেলা প্রশাসন। আহত যাত্রীদের মধ্যে ২২ জনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
তাদের সাতজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্ঘটনার সময় তারা সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে সংঘর্ষের আগের বাসের বেপরোয়া গতি এবং দুর্ঘটনার পরের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা।
হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সিয়াম আলী (১৮)। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ভাটা গ্রামের এই তরুণের ডান পা ভেঙে গেছে। বরিশাল থেকে রাজশাহী ফিরছিলেন তিনি। পটুয়াখালী থেকে বাসে ওঠা সিয়াম জানান, রাত ২টার দিকে কুষ্টিয়ায় খাবারের বিরতি দেওয়া হয়। খাওয়া শেষে বাসে উঠে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। ভোররাত সাড়ে ৩টার দিকে বিকট শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়।
সিয়ামের অভিযোগ, যাত্রাপথে বাসটি বেপরোয়া গতিতে চলছিল। নির্ধারিত আসনের বাইরেও তোলা হয়েছিল অতিরিক্ত যাত্রী। চালককে কয়েকবার গতি কমানোর অনুরোধ জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি।
সিয়াম বলেন, ‘ঘুম ভাঙতেই দেখছি ট্রাকের সঙ্গে বাসের সংঘর্ষ। দেখি, ডান পা ফ্র্যাকচার হয়ে গেছে। সাথে সাথে অনেকজন মারা গেছেন। বিকেলের দিকে বাসটি দ্রুত চলছিল। বাউড়ি মারছিল। তখন খুব ভয় লাগছিল। হোটেল বিরতির পরও রাফ চালাচ্ছিলেন। যাত্রীরা কয়েকবার বলেছিলেন গাড়ি আস্তে চালানোর জন্য। কয়েকবার গালিও দিল। তারপরও জোরেই চলছিল।’
এই বাসেই এক সপ্তাহ আগে পটুয়াখালী থেকে রাজশাহী এসেছিলেন সিয়াম। সেবারও বাসটির বেপরোয়া গতিতে চলার অভিজ্ঞতা হয়েছিল তার। সিয়াম জানান, ওই দিন কয়েকজন যাত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে সুপারভাইজারকে মারতে উদ্যত হয়েছিলেন। এরপর বাসের গতি কিছুটা কমানো হয়েছিল।
দুর্ঘটনার জন্য বাস চালকের বেপরোয়া গতিকেই দায়ী করছেন আরেক আহত যাত্রী রুবেল আলী (২৪)। নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার পিকরুল সেন্টার এলাকার বাসিন্দা রুবেল পেশায় রডমিস্ত্রি। ফরিদপুরের ভাঙা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। দুর্ঘটনায় তার পা ও দাঁত ভেঙে গেছে। বর্তমানে রামেক হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রুবেল বলেন, ‘এ দুর্ঘটনার জন্য বাসই দায়ী। নিয়ম মেনে গাড়ি চালালে দুর্ঘটনা হতো না। বাস রং সাইডে গিয়ে ট্রাককে মেরে দিয়েছে।’
দুর্ঘটনার পর বাসের ভেতরের পরিস্থিতি বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘যাত্রীরা সবাই ঘুমাচ্ছিল। আমি ঘুম ভেঙে দেখি মানুষজন ছোটাছুটি করার চেষ্টা করছে। একজনের গায়ের ওপরে আরেকজন পড়ে আছে। চিৎকার করছে। আমার পা ভেঙে গেছে, দাঁত ভেঙেছে। এসব দেখে অজ্ঞান হয়ে যাই। পরে ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার করে।’
বাসটি অন্য একটি গাড়িকে অতিক্রম করতে গিয়ে বিপরীত লেনে চলে গিয়েছিল বলে জানিয়েছেন আহত যাত্রী তৌহিদুল ইসলাম (৩০)। যশোরের কেশবপুরের বাসিন্দা তৌহিদুল ঝিনাইদহ থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাচ্ছিলেন। দুর্ঘটনার সময় তিনিও ঘুমিয়ে ছিলেন।
তৌহিদুল বলেন, ‘একটা গাড়িকে ওভারটেক করার সময় বাসটা ডান দিকে ঢুকে যায়। তখন সামনে থেকে আসা ট্রাকের সঙ্গে দুর্ঘটনা ঘটে। ঘুম ভাঙতেই দেখি একজন আরেকজনের ওপর পড়ে আছে।’
চালক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কি না, তা নিশ্চিত নন আহত যাত্রী মো. মজুন (৪০)। তবে দুর্ঘটনার পর বাসটিকে সড়কের বিপরীত পাশে দেখতে পান তিনি। রাজশাহীর গোদাগাড়ী সদরের মেডিকেল মোড় এলাকার বাসিন্দা মজুন বর্তমানে রামেক হাসপাতালের অজ্ঞাত রোগীদের ওয়ার্ডের সামনে চিকিৎসাধীন। তার ধারণা, চালক ঘুমিয়ে পড়ায় বাসটি বিপরীত লেনে চলে গিয়ে থাকতে পারে।
দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন বাসের হেলপার নয়ন আলীও (২৪)। তার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের পিটিআই এলাকায়। নয়নের দুলাভাই মো. ইসলাম জানান, আগে অটোরিকশা চালাতেন নয়ন। সোমবারই প্রথম বাসের হেলপার হিসেবে কাজে যোগ দেন তিনি। প্রথম দিনেই দুর্ঘটনার শিকার হন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার ফুটানিবাজারের বাসিন্দা তামিম আলী (২০) ওই বাসের যাত্রী ছিলেন। পেশায় নির্মাণশ্রমিক তামিমও রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার মামা রুবেল উদ্দিন জানান, তামিমের কাছে তিনি শুনেছেন, বাসটি বিপরীত লেনে চলে গিয়ে বালুবাহী ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধারকাজে অংশ নেন। আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হলেও এক যাত্রীর খোঁজ না পেয়ে উদ্বিগ্ন তার স্বজনেরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের বাসিন্দা মো. ওয়াহিদ ওই বাসের যাত্রী ছিলেন। তাঁকে খুঁজতে রামেক হাসপাতালে আসেন তার খালু কাজেম আলী। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি আহতদের মধ্যে ওয়াহিদকে খুঁজে পাননি তিনি।
কাজেম আলী বলেন, ‘আমরা ওয়াহিদের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। সে জীবিত না মৃত সেটাও জানি না।’
দুর্ঘটনায় নিহত বাসচালক সোহেল রানার বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরাদপুর গ্রামে। চালকসহ ১৪ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে নাটোর জেলা প্রশাসন। তবে দুর্ঘটনায় মোট কতজন আহত হয়েছেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। যাত্রীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৪৫ আসনের বাসটিতে নির্ধারিত আসনের বাইরে আরও প্রায় ১৫ জন যাত্রী ছিলেন।
রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্য আহত ব্যক্তিরা হলেন- রাজশাহীর কাজলা ধরমপুরের ফজলুল হক (৫০), বরিশালের বাবুগঞ্জের শহিদুল ইসলাম (৩৫), চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের শামিম হোসেন (১৮) ও সদরের ববি (৩০), নাটোরের বাগাতিপাড়ার জুলফিকার আলী (৫০), নওগাঁর সাপাহারের বন্দিয়াঘাটের আব্দুর নূর (৪০) ও নিয়ামতপুরের চিরঞ্জিত (৩০) এবং ডালিম (৩০), ঝিনাইদহ সদরের তাওহীদ (৩০) ও জুয়েল কিবরিয়া (৩৮), পটুয়াখালির রুবিনা (৪২) ও নাবিব (১২), যশোর সদরের নাদিম (২৪) এবং মাদারীপুর সদরের ইমা (২১) ও নারগিস (৫০)।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে আনার পর জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকেরা তাদের পরীক্ষা করেছেন। তাদের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল। তবে মাথায় আঘাত পাওয়া রোগীদের বিষয়ে ৪৮ ঘণ্টা পার হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। সকালে হাসপাতালের পরিচালক প্রত্যেক রোগীকে দেখে গেছেন। তাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
