ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আবারও হামলা শুরুর আশঙ্কা বাড়ছে। এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে সাতটি তেলবাহী জাহাজে আগুন লাগা বা ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছে ইরান। দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে আরও বড় পরিসরে জবাব দেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালানোর সম্ভাবনা কম। তবে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হুমকিতে সংঘাত শুরুর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন হরমুজ প্রণালি ও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা। অথচ ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে প্রথম হামলা চালানোর আগে হরমুজ প্রণালি নিয়ে এমন উত্তেজনা ছিল না। তখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনাও চলছিল।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সংঘাতের ভৌগোলিক পরিসর, রাজনৈতিক সমীকরণ, সামরিক সক্ষমতা ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে।
আরও পড়ুন
যুদ্ধের ভূগোল কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে?
প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের নেতৃত্বকে উৎখাত করা এবং হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো আঞ্চলিক মিত্রদের দুর্বল করা। ইরান সরকারের পতন না হলেও ইসরায়েলের হামলায় গাজায় হামাসের শক্তি কমেছে। গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও গাজায় ১ হাজার ৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে।
ফেব্রুয়ারির হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে হামলা চালায়। মার্চের শুরুতে লেবাননও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতের উপকণ্ঠে হামলা চালায়। একপর্যায়ে দেশটির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা দখলে নেয় ইসরায়েল। এতে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। লেবাননের দক্ষিণ সীমান্তে এখনো ইসরায়েলের দখল রয়েছে।
যুদ্ধের আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো উপসাগরীয় অঞ্চলের নৌপথ ও জ্বালানি স্থাপনা হামলার লক্ষ্য হয়ে ওঠা। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। ইরান সেই পথে জাহাজ চলাচলে বাধা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরে অবরোধ বজায় রেখেছে। ফলে তেল-গ্যাস সরবরাহ ও জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ইয়েমেনেও নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেন সরকার ও ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের লড়াইয়ের মধ্যে সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। এতে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করা বাব আল-মান্দেব প্রণালিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে হরমুজ প্রণালির সংকট আরও বাড়তে পারে।
রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ
ইরানে যুদ্ধের আগে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার দরপতন নিয়ে জনরোষ ছিল। জানুয়ারিতে বিক্ষোভ দমনে সরকারের প্রাণঘাতী অভিযানের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। যুদ্ধে খামেনি ও নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানি নিহত হলেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন হয়নি। খামেনির ছেলে মোজতবা তার স্থলাভিষিক্ত হন। এতে সরকারের কট্টরপন্থিদের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন। রয়টার্স-ইপসোসের জরিপে যুদ্ধ শুরুর আগে তার প্রতি সমর্থন ছিল ৪০ শতাংশ। গত সোমবার প্রকাশিত জরিপে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩১ শতাংশে। জ্বালানির উচ্চমূল্য ও যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থনের অভাব এ চাপ বাড়িয়েছে।
যুদ্ধের আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা ও বিদেশে জব্দ সম্পদের কারণে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষয়ক্ষতি ২৭০ বিলিয়ন ডলার বলে এপ্রিলে জানিয়েছে ইরান সরকার। আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেশটিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নেয়। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত এক বছরে ইরানের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১০ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে।
মার্কিন অবরোধে জ্বালানি রপ্তানিও ব্যাহত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের যুদ্ধসংক্রান্ত ব্যয় ১ আগস্ট পর্যন্ত ৩৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে সেপ্টেম্বরে জানিয়েছে কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস। যুদ্ধের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে প্রতি মাসে আরও ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। আগস্টে দেশটির সরকারি ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
সামরিক শক্তির হিসাব
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভেতরে গভীর পর্যন্ত হামলা চালানোর সক্ষমতা দেখালেও দেশটির সরকারকে উৎখাত করতে পারেনি। প্রতিবেশী দেশগুলোয় মার্কিন স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোয় পাল্টা হামলার ক্ষমতাও ধরে রেখেছে ইরান।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক আরবান কনিংহাম বলেন, ‘সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে কৌশলগত সাফল্যে রূপ দেওয়াই ওয়াশিংটনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইরানের নৌবাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটি এখন ছোট নৌযান, দ্রুতগতির স্পিডবোট ও তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ব্যবহার করছে। যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিহত হওয়ার পরও বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর কারণে আইআরজিসি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পেরেছে।’
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত কমে আসার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে ইরানের তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ঠেকাতে গিয়ে এই সংকট তৈরি হয়েছে। ফক্স নিউজ জানিয়েছে, ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরি ও ১৩তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট নভেম্বরের শেষ নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে পারে। এতে প্রায় ১০ হাজার সামরিক সদস্য থাকবেন।
যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগের দিন, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭২ দশমিক ৪৮ ডলার। ৩০ এপ্রিল তা বেড়ে ১২৬ দশমিক ৪১ ডলারে পৌঁছায়, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। শুক্রবারের লেনদেন শুরুর দিকে দাম ছিল ১১৪ দশমিক ৪৭ ডলার।
সংকট শুধু অপরিশোধিত তেলে সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং রাশিয়ার সরবরাহে নিষেধাজ্ঞার কারণে ডিজেলের বাজারেও চাপ বেড়েছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা অক্টোবরে সতর্ক করেছে, ২০২৭ সাল পর্যন্ত সরবরাহের সংকট চলতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প বন্দর, পাইপলাইন ও জাহাজ থেকে জাহাজে জ্বালানি স্থানান্তরের মাধ্যমে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং হামলার ঝুঁকিও থাকছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এখন যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
