খবরের খোঁচায় কি হারিয়ে দেওয়া যায় প্রতিপত্তিকে? নতুন ছবি ‘রিপোর্টিং লাইভ’ দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত।
প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুঘুর বাসা।
ক্ষমতার নামে দেদার দুর্নীতি।
বেআইনি মুনাফায় প্রতিপত্তির মদত।
আর কেউ মুখ খুলতে চাইলে তাকে চিরতরে চুপ করিয়ে দেওয়া।
সরকারি হোক বা বেসরকারি পরিসর, রাজনীতি হোক বা ব্যবসা-বাণিজ্যের সিন্ডিকেট, রাজ্যে-রাজ্যে, দেশে-দেশে এ ছবিটাই তো বরাবর দেখে এসেছে আমজনতা। কখনও সেই ক্ষমতার কাছে মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়েছে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, কখনও বা তুমুল চাপে বিকিয়ে যেতে হয়েছে সংবাদমাধ্যমকেও। তবু আজও তার মধ্যে জেগে থাকে কিছু নাছোড় জেদ, যারা যে কোনও মূল্যেই সত্যিটাকে সামনে আনতে চায়। সে ভয়কে জয় করে ফেলা আদ্যোন্ত ছাপোষা কোনও মানুষই হোক বা কোনও ভাবেই আপস করতে নারাজ সাহসী সাংবাদিক। তারা প্রত্যেকেই জ্বালিয়ে রাখতে চায় আশার আলো। কিন্তু কী হয় তার পরিণতি? সত্যিই কি সত্যিটাকে দিনের আলোয় টেনে বার করে আনা যায়? নাকি মাসুল গুনতে হয় সাহস দেখানোর?
সেই উত্তরগুলোই খুঁজতে চেয়েছে নেটফ্লিক্সের নতুন ছবি ‘রিপোর্টিং লাইভ’। ধ্রুব ত্রিপাঠী পরিচালিত ক্রাইম থ্রিলারে বালি মাফিয়াদের পর্দাফাঁস করতে মরিয়া দুই সাংবাদিকের গল্পে যথারীতি অভিনয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন পরিণীতি চোপড়া এবং দেবেন ভোজানি। যে কাহিনির ভাবনা ঘুরপাক খায় বাস্তবের অপরাধ দুনিয়ার অলিগলি-রাজপথেই। গল্পের দুই মূল চরিত্র, ক্রাইম জার্নালিস্ট সন্ধ্যা যাদব (পরিণীতি) এবং ভিডিও জার্নালিস্ট বিনোদ শর্মা (দেবেন) চাকরি করে মুম্বইয়ের আজাদ ভারত চ্যানেলে। নেশার মতো তাদের তাড়িয়ে বেড়ায় খবরের গন্ধ আর সত্যসন্ধানের খিদে। একালের রেষারেষিময় সাংবাদিক-জীবনের নিয়ম মেনে দিন-রাত ব্রেকিং নিউজ আর প্রাইমটাইমের পিছনে ছোটে দু’জনে। এর মধ্যেই লাগোয়া জেলার বিসরগাঁওয়ে ব্রিজ ভেঙে নদীতে পড়ে যায় স্কুলপড়ুয়া-ভর্তি বাস। সেই দুর্ঘটনা-মৃত্যুর খবর লাইভ করতে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় সন্ধ্যা ও বিনোদ। তারা অবাক হয়ে দেখে রাজনীতির কারবারিরা সন্তানহারা গ্রামবাসীদের বোঝাচ্ছে, সূর্যগ্রহণে ঘর থেকে বেরোনোর দোষেই এমন বিপর্যয়। সন্ধ্যা আঁচ করে কোনও কিছু ঢাকাচাপা দিতেই কুসংস্কারকে হাতিয়ার করা হচ্ছে। তারা পেয়েও যায় বৃদ্ধ শিবা কাকাকে (অমল পালেকর), যিনি ওই ব্রিজের নির্মাণের দিকে আঙুল তুলতেই তাঁর উপর চড়াও হয় রাজনীতিকের দলবল। শিবাকাকার পিছনে ছিনেজোঁকের মতো লেগে থেকে সন্ধ্যা ও বিনোদ জানতে পারে এ চত্বরে বালি-মাফিয়াদের রমরমার কথা। বেআইনি ভাবে নিয়মিত নদীর নীচের বালি তোলার ফলেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে এলাকার ব্রিজ, বন্ধ্যা হয়ে পড়েছে চাষের জমি। ট্রাকে ট্রাকে ভর্তি সেই বালি চলে যাচ্ছে শহরে, একের পর এক বহুতল নির্মাণের রসদ হয়ে। আর গোটাটার পিছনে রয়েছে বড়সড় মাথারা। প্রতিরোধ, হেনস্থা, হুমকি বা বিপদের তোয়াক্কা না করে সন্ধ্যা আর বিনোদ লেগে পড়ে প্রমাণ জোগাড়ে। এতে একদিকে তারা যেমন পাশে পায় নিউজ এডিটর বিদুরকে (আদিল হুসেন), তেমনই চ্যালেঞ্জ হয়ে আসে এ খবর বন্ধ করতে চ্যানেল-মালিক শ্যামের (শেখর সুমন) চাপাচাপি। সব বাধা পেরিয়ে সন্ধ্যা আর বিনোদ কি পারবে এই ষড়যন্ত্রের পর্দাফাঁস করতে? খুঁজে পাবে বালি মাফিয়াদের আসল চাঁইকে? এই সাহস দেখানোর বিনিময়ে কোন মাসুল গুনতে হবে তাদের? সে সব নিয়েই এগিয়েছে ঘণ্টা দুয়েকের ছবির গল্প।
দুই সাংবাদিক চরিত্রে আরও একটু কমবয়সী কেউ থাকলে হয়তো ভাল হত। তবে সে খামতিটাকে বুঝতে দেননি পরিণীতি বা দেবেন কেউই। সন্ধ্যা বা বিনোদকে, তাদের খবরের খিদে, হতাশা কিংবা টানাপোড়েনগুলোকে নিখুঁত করে ফুটিয়ে তুলেছে তাঁদের দুরন্ত অভিনয়। বিদুর ও শ্যাম হিসেবে আদিল এবং শেখর দু’জনেই নজরকাড়া হলেও ছোট্ট পরিসরে তাঁদের বিশেষ কিছু করার ছিল না। শিবা কাকার চরিত্রটা এ গল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সংক্ষিপ্ত উপস্থিতিতেই আটকে গিয়েছেন অমল। বলা বাহুল্য, তাতেও তিনি অনবদ্য। তুমুল কর্পোরেট কিং হিসেবে নাসির কিংবা দেবেনের স্ত্রী পূজার চরিত্রে প্রাচী শাহকে ভালই লাগে।
https://www.youtube.com/watch?v=gdk9oKRA8Hc
কিন্তু ছোট্ট ছোট্ট মুহূর্তে আবেগ-অনুভূতির কোলাজ, দুর্নীতি-ক্ষমতার দাপাদাপি কিংবা খবর খোঁজার ডিটেলিং মন কাড়লেও গল্প হাঁটল বড্ড চেনা ছকে। নিউজরুমে সেই খবর বনাম ক্ষমতার চেনা লড়াই। ষড়যন্ত্র ফাঁসের মরণপণ ছোটাছুটি বা বিপদের আশঙ্কাতেও চেনা চেনা গন্ধ। সত্যসন্ধানের ক্লু-ও কেমন যেন হাতের নাগালেই রাখা। ফলে ক্রাইম থ্রিলারের পরতে পরতে যে টানটান উত্তেজনার প্রত্যাশা থাকে, তার দেখা মেলেনি। কেমন যেন সাদামাটা আর ফিকে লাগে সরলরেখায় চলা টানাপোড়েনগুলো। এমনকি, এ গল্প যে উচ্চতায় পৌঁছতে পারত, চড়াতে পারত পারদ, সেখানে ক্লাইম্যাক্স বেশ খানিকটা হতাশই করে।
তবে বালি-মাফিয়ারা পরিবেশ-প্রকৃতির ঠিক কতটা ক্ষতি করে দিচ্ছে, নদীর বুক থেকে অবৈধভাবে ঝুড়ি ঝুড়ি বালি তুলে আনা ঠিক কতখানি বিপদের মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে জনজীবনকে— সে সত্যিটাকে সামনে আনার জন্যই কুর্নিশ প্রাপ্য পরিচালক-কাহিনিকারের। বিশেষত যেখানে পরিচালক ধ্রুবর এটাই প্রথম ছবি। আর সে কারণেই খামতিগুলো হয়তো ক্ষমা করে দেওয়া যায়। কী বলেন?
