৮-২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মুন্সিগঞ্জসহ দেশের ২০ জেলায় ইলিশসহ সব ধরনের মৎস্য আহরণের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে।
মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে চলমান নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে ইলিশ শিকারে নামছেন অসাধু জেলেরা। নদীতে টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মুন্সিগঞ্জের পদ্মা ও মেঘনায় জাল ফেলে ধরা হচ্ছে ইলিশ। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর জেলেরা নদীতে বেশি নামছেন। জানা গেছে, অভিযান শেষে নদী থেকে কোস্টগার্ড ও প্রশাসনের দল ফিরে গেলেই শুরু হয় ইলিশ মাছ শিকার। অভিযোগ রয়েছে, দিনে কিছুটা কড়াকড়ি থাকলেও সন্ধ্যার পর থেকে নদীর পাড়েই জমে ওঠে বেচাকেনা। নদী-তীরবর্তী এলাকাগুলোয় বসে অস্থায়ী ও ভাসমান হাট, যেখানে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে ডিমওয়ালা মা ইলিশ।
৮-২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মুন্সিগঞ্জসহ দেশের ২০ জেলায় ইলিশসহ সব ধরনের মৎস্য আহরণের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। মা ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম রক্ষার্থে প্রতি বছর এ সময় নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। এ বিশেষ সময়ে ইলিশ মাছ পরিবহন, মজুদ, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রি ও যেকোনো ধরনের বিনিময় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
তবে মুন্সিগঞ্জের পদ্মা ও মেঘনার বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সরকারি এ কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মুন্সিগঞ্জের পদ্মা ও মেঘনা নদীতে অসাধু জেলেরা জাল ফেলে ইলিশ শিকার করে চলেছেন। তাদের এ কর্মকাণ্ড দেখে দূর থেকে বোঝার উপায় নেই, এটি মা ইলিশ সংরক্ষণের মৌসুম চলছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একশ্রেণীর অসাধু জেলেরা এ নিষিদ্ধ সময়টাকে উল্টো ‘ইলিশ উৎসব’ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৎস্য বিভাগ ও প্রশাসনের যৌথ অভিযান সাধারণত সকাল থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বেশি সক্রিয় থাকে। দুপুরের পর বা বিকালে অভিযানকারী দল নদী বা এর তীরবর্তী এলাকা থেকে চলে গেলে সে সুযোগে অসাধু জেলেরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই রাতভর ইলিশ শিকার করেন তারা। ভোররাত পর্যন্ত অবাধে চলতে থাকে এ নিধনযজ্ঞ। পদ্মার উজানে লৌহজং-টঙ্গীবাড়ি পয়েন্ট ও সিডারচর পয়েন্টের পদ্মা নদীতে প্রতিদিন শতাধিক নৌকা নিয়ে দলে দলে মা ইলিশ ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি টঙ্গিবাড়ীর দিঘিরপাড়, হাসাইল এলাকা ও মেঘনা নদীর বিভিন্ন অংশে ট্রলার নিয়ে নেমে পড়েন জেলেরা।
নিষেধাজ্ঞার দিনগুলোয় থেমে নেই অবৈধভাবে শিকার করা মাছের বিক্রি। বরং নদীতীরেই বসছে ভাসমান ও অস্থায়ী হাট। গজারিয়া উপজেলার মেঘনার তীরের ইসমানিরচর, কালীরচর ও গজারিয়া ঘাটসংলগ্ন এলাকা, মুন্সিগঞ্জ সদরের বাংলাবাজার, চরঝাপটা, কাউয়াদি ও বকচর-সংলগ্ন মেঘনা নদীর পাড়, টঙ্গীবাড়ি ও লৌহজংয়ের দিঘিরপাড়, হাসাইল, কলমা ইউনিয়নের মারৈল, শামুরবাড়ি, কুমারভোগ, সিংহেরহাটি ও বেজগাঁও এবং শ্রীনগর উপজেলার বাঘরা ও ভাগ্যকুল ইউনিয়নের পদ্মা-তীরবর্তী চর এলাকায় নিয়মিত চলছে মা ইলিশ কেনাবেচা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ক্রেতা বলেন, ‘গত সোমবার লৌহজংয়ের কলমা ইউনিয়ন ঘেঁষা পদ্মা নদীর তীর থেকে ইলিশ মাছ কিনেছি। সেখানে মেঘনা ও পদ্মা থেকে ইলিশ ধরে জেলেরা বিক্রি করতে নিয়ে আসছেন। দাম মোটামুটি কম হওয়ায় অনেক ক্রেতা দূর-দূরান্ত থেকে এসে মাছ কিনছেন। প্রতিদিন এ সব পয়েন্টে লাখ লাখ টাকার ইলিশ বেচা-কেনা হচ্ছে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে অসাধু চক্র পদ্মায় মাছ নিধন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন এলাকা ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে নদীতীরগুলো জমজমাট হাটে রূপ নেয়।
তবে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এরই মধ্যে লৌহজং ও শ্রীনগরের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে বেশ কয়েকজন জেলেকে আটক করে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে লৌহজং উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, মৎস্য বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন যৌথভাবে নিয়মিত ও কঠোর অভিযান পরিচালনা করছে। অবৈধ জাল জব্দ করার পাশাপাশি অসাধু জেলেদের আইনের আওতায় এনে সাজা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া নদী-তীরবর্তী এলাকায় ভাসমান হাট বসানোর সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের নাম-পরিচয় শনাক্তে কাজ চলছে। দ্রুতই তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
মুন্সিগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা গোলাম মেহেদী হাসান বণিক বার্তাকে জানান, এ বছর জেলা মৎস্য অধিদপ্তর থেকে ইলিশ শিকারে জড়িত প্রতিটি জেলে পরিবারকে ২৫ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে, যাতে তারা নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ শিকার না করে এবং নিজের পরিবার নিয়ে চলতে পারে। তার পরও কিছু জেলে ইলিশ শিকার করছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যেন কেউ ইলিশ ধরতে না পারে, সেজন্য প্রতিদিনই মৎস্য কর্মকর্তা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে পুলিশ, কোস্টগার্ড, আনসার, নৌ-পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। গতকাল পর্যন্ত অর্ধশতাধিকের বেশি জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
