মঙ্গলগ্রহে দীর্ঘ সময় অবস্থান এবং সবচেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রমের রেকর্ড গড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার রোভার পারসিভিয়ারেন্স। ২০২১ সালে মঙ্গলে পৌঁছানোর পর থেকে এ পর্যন্ত রোভারটি ৪৫ দশমিক ২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে।
মঙ্গলে অতীতে অণুজীবের অস্তিত্বের উপযোগী পরিবেশ ছিল কি না, তা অনুসন্ধানের লক্ষ্যে পরিচালিত অভিযানের সাড়ে পাঁচ বছর পর এই মাইলফলক অর্জন করল ছয় চাকার গাড়ির আকারের রোবটটি। এ যাত্রায় পারসিভিয়ারেন্স মঙ্গলের প্রাচীন ভূখণ্ডের বিভিন্ন এলাকা পর্যবেক্ষণ করছে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির কর্মকর্তা স্টিভেন লি বলেন, পারসিভিয়ারেন্সের প্রকৌশলগত সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি চমৎকার অবস্থায় রয়েছে। এর সব বিকল্প ব্যবস্থা এখনো সচল রয়েছে।
নাসার পারসিভিয়ারেন্স ও কিউরিওসিটি রোভার প্রকল্পের ব্যবস্থাপক লি আরও বলেন, সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রোভারটির সব ব্যবস্থা ২০৩০-এর দশক এবং সম্ভবত তার পরেও কার্যকরভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারবে।
এর আগে ২০০৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নাসার অপরচুনিটি রোভার মঙ্গলের পৃষ্ঠে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিল। পারসিভিয়ারেন্স সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। দুটি রোভারই চাঁদে চলাচল করা যেকোনো রোভারের অতিক্রান্ত দূরত্বের রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে।
জেজেরো গহ্বর পরিভ্রমণ
বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত পারসিভিয়ারেন্স মূলত মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধের জেজেরো গহ্বর এলাকায় অনুসন্ধান চালাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, কোটি কোটি বছর আগে অঞ্চলটি পানিতে প্লাবিত ছিল এবং সেখানে একটি হ্রদ ছিল।
সম্প্রতি গহ্বরটির পশ্চিম প্রান্তের কাছে ল্যাক ডি চার্মস এলাকা অতিক্রম করে ইডুবি নামের একটি অঞ্চলের দিকে যাওয়ার পথে রোভারটি নতুন এই মাইলফলক অর্জন করে।
পারসিভিয়ারেন্সের সহযোগী রোভার কিউরিওসিটি বর্তমানে মঙ্গলের বিষুবরেখার কাছাকাছি অবস্থিত গেল গহ্বর এলাকায় অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
লি জানান, পারসিভিয়ারেন্সের গতি কমে আসার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। তবে রোভারটির চলাচলব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়মিত পরীক্ষা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, রোভারটি ১০০ কিলোমিটার বা তার বেশি পথ পাড়ি দিতে সক্ষম কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এর যন্ত্রপাতি ১৫০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রমের উপযোগী করা সম্ভব কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
নাসা জানিয়েছে, পারসিভিয়ারেন্সের সাফল্যের পেছনে এর স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। লির ভাষ্য অনুযায়ী, রোভারটির প্রায় ৯০ শতাংশ যাত্রা মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই সম্পন্ন হয়।
পারসিভিয়ারেন্স সামনের ভূখণ্ডের ত্রিমাত্রিক ছবি তোলে, সেগুলোর সাহায্যে ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করে এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ বেছে নেয়।
রোভারটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ভিশন কম্পিউট এলিমেন্ট। এটি একটি দ্রুতগতির সহায়ক প্রসেসর, যা ছবি বিশ্লেষণ এবং চলাচলের সময় স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ সফটওয়্যার দ্রুত চালাতে সাহায্য করে।
লি বলেন, আগের রোভারগুলোর সঙ্গে পারসিভিয়ারেন্সের পার্থক্য রয়েছে। আগের রোভারগুলোকে যাত্রার প্রতিটি ধাপ শুরুর আগে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য থামতে হতো। কিন্তু পারসিভিয়ারেন্স চলাচলের সময়ই অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, পারসিভিয়ারেন্সের নকশা তৈরিতে সোজোর্নার, স্পিরিট, অপরচুনিটি ও কিউরিওসিটি রোভারের প্রায় ২৯ বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হয়েছে। প্রতিটি অভিযান থেকে পাওয়া শিক্ষা অন্য গ্রহে চলাচলের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করেছে।
সম্ভাব্য জৈবচিহ্নের সন্ধান
বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা ধারণা করে আসছেন, পৃথিবীর মতো মঙ্গলেও একসময় প্রাণের বিকাশ ঘটেছিল। গ্রহটির ভূতাত্ত্বিক ও আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্য এ ধারণার ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
লি জানান, পারসিভিয়ারেন্সের অন্যতম বড় সাফল্য হলো সম্ভাব্য জৈবচিহ্ন বা প্রাচীন অণুজীবের অস্তিত্বের সম্ভাব্য প্রমাণ শনাক্ত করা। এ বিষয়ে গত বছর গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়েছিল।
মঙ্গলে একসময় পানির অস্তিত্ব ছিল, এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে গ্রহটির একটি লালচে পাথরে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পাথরটি ৩২০ কোটি থেকে ৩৮০ কোটি বছর আগে এমন একটি নদীর খাতে তৈরি হয়েছিল, যেটি জেজেরো গহ্বরের হ্রদে পানি সরবরাহ করত।
লি বলেন, ল্যাক ডি চার্মস এলাকার ভূখণ্ড থেকে মঙ্গলের প্রাথমিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বিশাল উল্কাপাতের প্রভাব, যার ফলে গ্রহটির ইতিহাসের শুরুর দিকে জেজেরো গহ্বর তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
কক্ষপথ থেকে পাওয়া প্রমাণের কথা উল্লেখ করে লি জানান, গহ্বরের প্রান্তের কিছু এলাকায় একসময় উষ্ণ ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহব্যবস্থা ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এসব এলাকা হয়তো একসময় জীবনের বিকাশের উপযোগী উষ্ণ ও পানিসমৃদ্ধ ভূগর্ভস্থ পরিবেশ তৈরি করেছিল। অনেক জীবাশ্মবিদ মনে করেন, পৃথিবীতেও এ ধরনের পরিবেশে জীবনের সূচনা হয়ে থাকতে পারে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, পারসিভিয়ারেন্সের মাত্র ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার কথা ছিল। তবে নাসা সম্প্রতি এর অভিযানের মেয়াদ বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ রোভারটি জেজেরো গহ্বরের প্রান্তবর্তী এলাকা অনুসন্ধান করবে।
লি জানান, রোভারটির প্লুটোনিয়ামচালিত বিদ্যুৎব্যবস্থা প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে। এতে আরও বহু বছর ব্যবহারের মতো শক্তি অবশিষ্ট রয়েছে।
এমএ
