১৭২৭ সালের ৩০ জুন মুর্শিদকুলী খানের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর সুজাউদ্দিন আর কালবিলম্ব না করে উড়িষ্যা থেকে বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে বাংলার উদ্দেশে যাত্রা করেন।
ভাগ্য এবার আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধির পথ করেছে,
এবং আমার নামে রাজ্যের মুদ্রা তৈরির ব্যবস্থা করেছে—
নবাব মুর্শিদকুলী খানের মৃত্যুতে এ উক্তিই করেছিলেন তার জামাতা সুজাউদ্দিন মোহাম্মদ খান। বাংলার নবাবি ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদলের কাহিনী কেবল যুদ্ধ কিংবা রাজদরবারের ষড়যন্ত্রে সীমাবদ্ধ নয়। কখনো কখনো পারিবারিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর দিল্লির দরবারের কূটনৈতিক তৎপরতা মিলেই নির্ধারণ করেছে বাংলার ভাগ্য। নবাব সুজাউদ্দিন মোহাম্মদ খানের বাংলার মসনদে আরোহণ তেমনই এক কাহিনী। বাংলার মাটিতে জন্ম না নিয়েও যিনি একসময় এ অঞ্চলের শাসনভার গ্রহণ করেন, হয়ে ওঠেন বাংলা অঞ্চলের নবাব।
সুজাউদ্দিনের জন্ম বাংলার বাইরে, তার পারিবারিক শিকড়ও প্রোথিত ছিল বহুদূরের ভূখণ্ডে। তিনি ছিলেন আফশার তুর্কি বংশোদ্ভূত। তার পূর্বপুরুষদের একজন আলি ইয়ার সুলতান পারস্যের শাসক তাহমাস্পের আমলে খোরাসানের ফারাহ অঞ্চলের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার পিতা মোগল প্রশাসনের অধীনে বুরহানপুরে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সেই বুরহানপুরেই সুজাউদ্দিনের জীবনের গতিপথ বদলে দেয়ার মতো এক পরিচয়ের সূত্রপাত হয়। সেখানে তার পরিচয় হয় মুর্শিদকুলী খানের সঙ্গে। পরিচয় ক্রমে ঘনিষ্ঠতায় গড়ায়, আর সেই সম্পর্কের পরিণতি ঘটে বিয়েতে। মুর্শিদকুলী খানের কন্যা জিনাত-উন-নিসাকে বিয়ে করে সুজাউদ্দিন যুক্ত হন বাংলার ভবিষ্যৎ নবাবি শাসনের সঙ্গে।
এ বৈবাহিক সম্পর্ক তার জন্য কেবল পারিবারিক পরিচয়ের নতুন দরজা খুলে দেয়নি; খুলে দিয়েছিল বাংলার রাজনীতি ও প্রশাসনের পরিসরে প্রবেশের পথও। মুর্শিদকুলী খান যখন বাংলা ও উড়িষ্যার দেওয়ান ও নাজিমের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন জামাতাকে উড়িষ্যার ডেপুটি গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু প্রশাসনিক দায়িত্বের এ সূচনা শেষ পর্যন্ত তাদের সম্পর্ককে মসৃণ রাখতে পারেনি। ব্যক্তিত্বের পার্থক্য, সুজাউদ্দিনের জীবনযাপনের ধরন এবং তার আচরণ নিয়ে অসন্তোষ—সব মিলিয়ে শ্বশুর ও জামাতার মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। এদিকে তাদের পারিবারিক সমীকরণে যুক্ত হয়েছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র—সুজাউদ্দিনের পুত্র সরফরাজ খান। মুর্শিদকুলী খানের জামাতার প্রতি অসন্তুষ্টি থেকে তিনি তার নাতি সরফরাজকে উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী ছিলেন। আর সেজন্য সম্রাট ফররুখসিয়ারের কাছ থেকে সরফরাজের পক্ষে স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। এমনকি নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে জমি কিনে নাতির ভবিষ্যৎ অবস্থান সুদৃঢ় করার উদ্যোগ নেন। অর্থাৎ বাংলার মসনদকে ঘিরে উত্তরাধিকারের প্রশ্নটি মুর্শিদকুলী খানের জীবদ্দশাতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। একদিকে অভিজ্ঞ শাসকের পছন্দের উত্তরসূরি নাতি, অন্যদিকে সেই শাসকেরই জামাতা—যার নিজেরও ছিল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
সুজাউদ্দিন অবশ্য পরিস্থিতির গতিপথ অনুমান করতে পারছিলেন। বাংলার শাসনভার সরাসরি তার হাতে আসবে, এমন নিশ্চয়তা ছিল না। তাই তিনি অপেক্ষা করলেও নিষ্ক্রিয় থাকেননি। উড়িষ্যায় নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি মুর্শিদাবাদের ঘটনাপ্রবাহের খবর রাখতেন নিয়মিত। তার এ রাজনৈতিক প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল দুই ভাই হাজি আহম্মদ ও আলিবর্দী খানের। তাদের পরামর্শে তিনি দিল্লির দরবারেও নিজের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যান। মুর্শিদকুলী খানের মৃত্যুর পর বাংলার ক্ষমতা কার হাতে যাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর যে শুধু পারিবারিক সম্পর্ক দিয়ে নির্ধারিত হবে না, তা সুজাউদ্দিনের কর্মকাণ্ডেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
ক্ষমতায় আরোহণ
১৭২৭ সালের ৩০ জুন মুর্শিদকুলী খানের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর সুজাউদ্দিন আর কালবিলম্ব না করে উড়িষ্যা থেকে বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে বাংলার উদ্দেশে যাত্রা করেন। যাওয়ার আগে উড়িষ্যার প্রশাসনিক দায়িত্ব নিজের পুত্র মুহাম্মদ তকি খানের হাতে তুলে দিয়ে তিনি এগিয়ে চলেন মুর্শিদাবাদের দিকে। তবে তার এ যাত্রা ছিল কেবল এক প্রদেশ থেকে আরেক প্রদেশে অগ্রসর হওয়া নয়; ছিল বাংলার মসনদের দাবিদার হিসেবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠার অভিযান।
কিন্তু শুধু শ্বশুরের মৃত্যু তার জন্য যথেষ্ট ছিল না। প্রয়োজন ছিল সম্রাটের স্বীকৃতি—যে স্বীকৃতি তার ক্ষমতার দাবিকে বৈধতা দেবে। দিল্লির দরবারে প্রভাবশালী অভিজাত খান-ই-দৌরানের সহায়তায় তিনি বাংলার শাসনভার গ্রহণের রাজকীয় সনদ লাভ করেন। মেদিনীপুরের কাছাকাছি অবস্থানকালে এ স্বীকৃতি পাওয়ার পর তার অগ্রযাত্রা নতুন অর্থ পায়।
মুর্শিদাবাদে পৌঁছে তিনি সরাসরি প্রবেশ করেন চেহেল সেতুনে—মুর্শিদকুলী খানের নির্মিত ৪০ স্তম্ভের প্রাসাদে। এখানেই বাংলার ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। সুজাউদ্দিন আনুষ্ঠানিকভাবে মসনদের প্রতি নিজের আনুগত্য ঘোষণা করেন। কিন্তু তার সামনে তখনো একটি সম্ভাব্য বাধা ছিল—নিজের পুত্র সরফরাজ খান, যাকে মুর্শিদকুলী খান উত্তরসূরি হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। পরিস্থিতির আকস্মিক পরিবর্তনে সরফরাজ হতবাক হয়ে পড়েন। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, বিশেষত নিজের মায়ের পরামর্শে তিনি পিতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার চিন্তা থেকে সরে আসেন। এবং শেষ পর্যন্ত সংঘাতের পথ পরিহার করে নীরবে পিতার কর্তৃত্ব মেনে নেন।
এভাবেই বাংলার নবাবি ইতিহাসে একটি সম্ভাব্য উত্তরাধিকার সংঘাত বড় ধরনের সামরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়ার আগেই থেমে যায়। মুর্শিদকুলী খানের মনোনীত উত্তরসূরি সরফরাজ সরে দাঁড়ান, আর তারই জামাতা সুজাউদ্দিন মোহাম্মদ খান বাংলার মসনদে অধিষ্ঠিত হন। তার উত্থানের পেছনে ছিল পারিবারিক সম্পর্কের সুযোগ, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সামরিক শক্তি এবং দিল্লির দরবারে সমর্থন আদায়ের কৌশল। বাংলার বাইরে জন্ম নেয়া এ মানুষটির ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত জুটেছিল বাংলার শাসনভার—যে ভূখণ্ডে তার আগমন হয়েছিল বৈবাহিক সূত্রে, সেখানেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নিজের নবাবি কর্তৃত্ব।
বাংলায় নতুন প্রশাসনিক বিন্যাস
বাংলার মসনদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর সুজাউদ্দিন মোহাম্মদ খানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে নবাবি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং রাজস্ব আদায় থেকে শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা পর্যন্ত প্রশাসনের প্রতিটি স্তরকে কার্যকর রাখা। বাংলা ও উড়িষ্যার শাসনভার দিয়ে তার যাত্রা শুরু হলেও ১৭৩৩ সালে সম্রাট মোহাম্মদ শাহ বিহারকে বাংলা সুবার সঙ্গে যুক্ত করলে তার অধীনস্থ অঞ্চলের পরিধি আরো বেড়ে যায়। বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা—তিন প্রদেশের সুবাদার হিসেবে তখন তাকে এমন এক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হয়, যার মাধ্যমে রাজধানী মুর্শিদাবাদের সঙ্গে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সম্ভব। এ প্রয়োজন থেকেই তার শাসনামলে প্রদেশগুলোকে চারটি প্রশাসনিক বিভাগে বিন্যস্ত করা হয়—কেন্দ্রীয় বাংলা, ঢাকা, বিহার ও উড়িষ্যা। পশ্চিম, মধ্য ও উত্তর বাংলার বিস্তীর্ণ অংশ নিয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় বিভাগ নবাব নিজে উপদেষ্টা পরিষদের সহায়তায় পরিচালনা করতেন। অন্যদিকে পূর্বও দক্ষিণ বাংলা, উত্তরবঙ্গের কিছু অংশ, সিলেট ও চট্টগ্রাম নিয়ে গঠিত ঢাকা বিভাগের পাশাপাশি বিহার ও উড়িষ্যার দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয় পৃথক নায়েব নাজিম বা ডেপুটি গভর্নরের হাতে। এ ব্যবস্থায় আঞ্চলিক প্রশাসনের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ওপর নবাবের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
এ প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা অনেকাংশেই নির্ভর করত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ওপর। নবাব তার আস্থাভাজন ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে সেই ব্যবস্থাকে সচল রাখার চেষ্টা করেন। বিহারের নায়েব নাজিম নিযুক্ত হন আলিবর্দী খান, যিনি পরবর্তী সময়ে বাংলার রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। ঢাকার দায়িত্ব পান নবাবের জামাতা দ্বিতীয় মুর্শিদকুলী খান। কাব্যচর্চা ও ক্যালিগ্রাফিতে আগ্রহী এ শাসক প্রশাসনিক কাজে তার দক্ষ প্রতিনিধি মীর হাবিবের সহায়তা নিতেন। মীর হাবিব ছিলেন হিসাবনিকাশ, ব্যয়সংকোচন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় মনোযোগী একজন কর্মকর্তা। তার উদ্যোগে নৌবহর, গোলন্দাজ বাহিনী ও সামরিক বিভাগের ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হয়। ফলে ঢাকার প্রশাসনে মীর হাবিবের ভূমিকা একই সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের একটি বিতর্কিত দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।
তবে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ফল সব সময় একরকম ছিল না। মীর হাবিবের সময়ে ঢাকায় কিছু বাণিজ্যিক পণ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও শস্যের ওপর আরোপিত শুল্ক জনজীবনে চাপ সৃষ্টি করেছিল। পরে যশবন্ত রায় ঢাকার প্রশাসনের দায়িত্ব পেলে এসব বিধিনিষেধের কয়েকটি প্রত্যাহার করা হয়। ফলস্বরূপ জিনিসপত্রের দাম শায়েস্তা খানের আমলের মতো কমে যায় অর্থাৎ প্রতি রুপিতে কয়েক টন চাল পাওয়া যেত। এবং ঢাকা শহরের পশ্চিম ফটক, যা শায়েস্তা খান এ নির্দেশ দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন যে শস্যের দাম সেই পর্যায়ে না কমানো পর্যন্ত কোনো গভর্নর যেন তা না খোলে, সেটি এই প্রথমবারের মতো পুনরায় খুলে দেয়া হলো।
উড়িষ্যার প্রশাসনেও একই সঙ্গে রাজস্ব পুনরুদ্ধার ও স্থানীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা যায়। দ্বিতীয় মুর্শিদকুলী খান সেখানে দায়িত্ব পাওয়ার পর মীর হাবিবের সহায়তায় স্থানীয় জমিদারদের নিয়ন্ত্রণে আনা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেন। সুজাউদ্দিনের প্রশাসনে রাজস্বনীতি শুধু কর আদায়ের হিসাবেই সীমাবদ্ধ ছিল না; স্থানীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, আঞ্চলিক কর্তৃত্ব ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পারস্পরিক সম্পর্কও শাসন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
ভাগ্য ও দূরদর্শিতার সমন্বয়ে বাংলার নবাবি মসনদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন সুজাউদ্দিন মোহাম্মদ খান। বাংলার বাইরে জন্ম, বৈবাহিক সূত্রে এ অঞ্চলের রাজনীতির সঙ্গে পরিচয়, আর শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছানো—তার জীবনের পথচলা ছিল নানা বাঁকে ভরা। তবে নবাব হিসেবে তার পরিচয় কেবল ক্ষমতা অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজ্যের প্রশাসন পরিচালনা, রাজস্ব ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস এবং প্রজাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার উদ্যোগেও তিনি নিজের শাসনকে অর্থবহ করে তুলতে চেয়েছিলেন।
শুচিস্মিতা সিদরা: প্রাবন্ধিক
