কুমিল্লা জেলা পরিষদের অধীন লাকসামের মুদাফফরগঞ্জ বাজার জেলা পরিষদ মার্কেটের দোকান বরাদ্দ, লিজ, নির্মাণ ব্যয় ও অর্থ লেনদেনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের জটিলতা দেখা দিয়েছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দোকানমালিকদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এনামুল হক বশিরের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
এনামুল হক বশির ২০০৩ সালে কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি দীর্ঘ সময় একই জেলা পরিষদে কর্মরত ছিলেন। মাঝখানে দেবিদ্বারের একটি পুকুরসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগের কারণে তাঁকে আট মাসের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদে বদলি করা হয়েছিল। পরে বিভিন্ন জায়গায় অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে তিনি আবার কুমিল্লা জেলা পরিষদে ফিরে আসেন। কুমিল্লায় ফিরে জেলা পরিষদের অধীন বিভিন্ন মার্কেট থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন এবং পরবর্তীতে নিজেকে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে জেলা পরিষদে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মুদাফফরগঞ্জ বাজার জেলা পরিষদ মার্কেটের বিরোধের সূত্রপাত ২০০৩ সালে। তৎকালীন সংসদ সদস্য কর্নেল আজিমের মৌখিক নির্দেশে ওই বছর মার্কেটের জন্য জমিতে মাটি ভরাটের কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে সেখানে টিনশেড মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সে সময় প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের মাধ্যমে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত কার্যকর করার কথা ছিল। তাঁদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০৬টি দোকান নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। ওই সময়ের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা বিভিন্নভাবে ২০৬ জনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাবি। তবে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে মাটি ভরাট, জমি লিজ নেওয়া এবং মার্কেট নির্মাণের আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করা হয়নি। যাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছিল, তাঁদের অনেককেই অর্থ ফেরত দেওয়া হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, এসব অসম্পূর্ণ কাজ ও আর্থিক হিসাবের জটিলতা পরবর্তী সময়ে মার্কেট নির্মাণের বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
দোকানের জন্য সংগৃহীত অর্থ ঠিকাদারের কাছ থেকে এনামুল হক জেলা পরিষদে জমা দেওয়ার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে দুই কোটি ৬০ লাখ টাকা নেন। কিন্তু ওই অর্থ জেলা পরিষদে জমা দেওয়া হয়নি।
পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করে পুনরায় কাজ শুরু করা হয় এবং কয়েকটি দোকান প্রস্তুত করা হয় বলে তিনি জানান। যাঁরা আগে দোকান নেবেন না বলেছিলেন, তাঁদের স্থানে নতুন কয়েকজনকে যুক্ত করে তাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। সেই অর্থের কিছু অংশ জেলা পরিষদে জমা দেওয়া হয় এবং বাকি অর্থ দিয়ে দোকান প্রস্তুতের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয় বলে তাঁর বক্তব্য। চুক্তি অনুযায়ী মোট বিলের ৪৫ শতাংশ ঠিকাদার এবং ৫৫ শতাংশ তাঁদের পাওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদার তাঁদের কোনো টাকা দেননি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
বর্তমানে যাঁদের কাছে তিনি দোকান বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করেছেন ওই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তাঁর ভাষ্য, শত চেষ্টা সত্ত্বেও প্রশাসনিক জটিলতা, আর্থিক দুর্বলতা এবং অন্যান্য সমস্যার কারণে দোকানমালিকদের দোকানসংক্রান্ত কাগজপত্র বুঝিয়ে দিতে পারেননি। এ ব্যর্থতার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এনামুল হক বশির তাঁর স্ত্রীর নামে একটি দোকান বরাদ্দ নেন, যা জেলা পরিষদ আইনের নীতিপরিপন্থী। আইন অনুযায়ী, জেলা পরিষদের কোনো কর্মকর্তা তাঁদের আত্মীয়স্বজন ও নিজের নামে কোনো দোকান বরাদ্দ নিতে পারেন না। কিন্তু তিনি আইনের তোয়াক্কা না করে নিজের স্ত্রীর নামে একটি দোকান বরাদ্দ নেন।
এই মার্কেটের কার্যক্রম যখন ২০০৩ সালে শুরু হয়, তখন অধিকাংশ দোকান বরাদ্দ নেন বিএনপিপন্থী নেতাকর্মীরা। এখন এই প্রশাসনিক কর্মকর্তার অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার কারণে এলাকায় সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
মার্কেটসংক্রান্ত বিরোধের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি নিজের কয়েকটি সিদ্ধান্তকেও ভুল বলে স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, ২০০৩ সালে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের মৌখিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে অন্যদের সম্পৃক্ত করা ছিল তাঁর ভুল সিদ্ধান্ত। একইভাবে ২০০৩ সালে নির্ধারিত নামগুলো পরিবর্তন না করা, ২০০৮ সালে পুনরায় তাঁদের নামে লিজ নেওয়া এবং ২০১৫ সালে তাঁদের নামে দোকান বরাদ্দ নেওয়াকেও তিনি নিজের বড় ভুল হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর আশঙ্কা, একই ধরনের প্রক্রিয়ায় অন্যরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এই প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিজেকে কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতার ভাই পরিচয় দিয়ে জেলা পরিষদে একক আধিপত্য নিয়ে একটি বলয় তৈরি করছেন। জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার জহিরুল আলমের মাধ্যমে বিভিন্ন দোকানমালিককে হুমকি দিচ্ছেন—যদি দোকান খালি করে না দেন, তাহলে ওই দোকান লুটপাট ও ভাঙচুরের ব্যবস্থা করবেন। জেলা পরিষদের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে এই ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলে জেলা পরিষদের কর্মকাণ্ডে বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, ২০০৩ সালে মাটি ভরাট, ২০০৮ সালে লিজ গ্রহণ ও নবায়ন এবং ২০১৫ সালে দোকান বরাদ্দ নেওয়া থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কয়েকজন তাঁকে এক টাকাও দেননি। অথচ তাঁদের নামের কারণে তাঁকে বিভিন্ন আর্থিক দায় বহন করতে হয়েছে।
