মোহাম্মদ রিদুয়ান হাফিজ, চকরিয়া প্রতিনিধি
কক্সবাজারের চকরিয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে বইছে উৎসবের আমেজ। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। দেবী দুর্গাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। কোথাও চলছে প্রতিমায় রং করার কাজ, কোথাও চোখ আঁকা ও সাজসজ্জার প্রস্তুতি। পাশাপাশি পূজামণ্ডপে চলছে বর্ণিল প্যান্ডেল নির্মাণ, আলোকসজ্জা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ।
এবার চকরিয়া ও মাতামুহুরী মিলিয়ে মোট ৪৯টি মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে শারদীয় দুর্গাপূজা। এর মধ্যে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় রয়েছে চারটি পূজামণ্ডপ। উৎসবকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে যেমন আনন্দ-উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে, তেমনি এ আয়োজনকে ঘিরে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেও।
গত শনিবার (১০ অক্টোবর) মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের সূচনা হয়। আগামী ১৬ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে মূল পূজার আনুষ্ঠানিকতা। এ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) চকরিয়া ও মাতামুহুরীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, প্রতিমা তৈরির শেষ মুহূর্তের কাজে ব্যস্ত শিল্পীরা।
কাদা-মাটি, খড় ও বাঁশ দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরির কাজ শেষ করে এখন চলছে রং-তুলির নিপুণ আঁচড়ে দেবী দুর্গা ও অন্যান্য প্রতিমাকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলার কাজ।
শিল্পীদের দক্ষ হাতে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে দেবীর মুখাবয়ব। প্রতিমার চোখ আঁকা থেকে শুরু করে পোশাক, অলংকার ও অন্যান্য সাজসজ্জায় দেওয়া হচ্ছে শেষ ছোঁয়া। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করে মণ্ডপে পৌঁছে দিতে নিরলস পরিশ্রম করছেন মৃৎশিল্পীরা।
উপকরণের দাম বাড়লেও প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত শিল্পীরা
প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত শিল্পী সুমন পাল বলেন, ‘আর এক-দুই দিনের মধ্যেই রং-তুলির কাজ পুরোপুরি শেষ হবে। প্রতিটি প্রতিমা যেন নিখুঁত ও দৃষ্টিনন্দন হয়, সে জন্য সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়ে কাজ করছি। আশা করছি, নির্ধারিত সময়ের আগেই সব কাজ শেষ করতে পারব।
তবে প্রতিমা তৈরির উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন এই শিল্পী। তিনি বলেন, ‘মাটি, বাঁশ, খড়, রং ও শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় প্রতিমার দাম বাড়ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ভক্ত ও ক্রেতারা কম দামে প্রতিমা নিতে চান। ফলে খরচ মিটিয়ে তেমন লাভ থাকে না। তারপরও বংশপরম্পরায় চলে আসা এই শিল্প ও ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকায় কাজ করে যাচ্ছি।’
৪৯ মণ্ডপে পূজার আয়োজন, সম্প্রীতির উৎসব গড়ার প্রত্যাশা
চকরিয়া উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি তপন কান্তি দাশ জানান, চকরিয়া ও মাতামুহুরী মিলিয়ে এবার ৪৯টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে মাতামুহুরী উপজেলায় চারটি মণ্ডপ রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিটি মণ্ডপের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সব সম্প্রদায়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দুর্গোৎসবকে সম্প্রীতির উৎসবে পরিণত করতে চাই। পূজার আনন্দ যেন কারও জন্য অস্বস্তির কারণ না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে পূজাকে ঘিরে মণ্ডপগুলোতে প্রতিমা নির্মাণের পাশাপাশি চলছে আকর্ষণীয় আলোকসজ্জা, বর্ণিল প্যান্ডেল নির্মাণ ও সার্বিক সাজসজ্জার কাজ। উৎসবকে নির্বিঘ্ন ও আনন্দমুখর করতে আয়োজকরাও ব্যস্ত সময় পার করছেন।
নিরাপত্তায় প্রশাসন ও পুলিশের প্রস্তুতি
শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ।
চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুর রহমান জানান, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন করতে পুলিশ সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছে। প্রতিটি পূজামণ্ডপে টহল ও নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি পূজা উদযাপন কমিটি এবং স্থানীয়দের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, ‘শারদীয় দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি আবহমান বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের প্রতীক। এই উৎসবকে ঘিরে যেন কোনো অশুভ শক্তি বা মহল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ না পায়, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যাতে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
উৎসবের অপেক্ষায় চকরিয়া-মাতামুহুরী
প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা ও প্রস্তুতি। ঢাকের বাদ্য, আরতি, পূজা-অর্চনা এবং নানা আয়োজনে মুখর হয়ে উঠবে পূজামণ্ডপগুলো—এমন প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দা ও আয়োজকদের।
সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রশাসন, পুলিশ, পূজা উদযাপন কমিটি ও স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগে চকরিয়া ও মাতামুহুরীতে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপিত হবে শান্তিপূর্ণ, আনন্দঘন ও সম্প্রীতির পরিবেশে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে এ উৎসব হয়ে উঠবে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের এক অনন্য মিলনমেলা।
চট্টগ্রামনিউজ/ এসডি/
