জর্ডানের মধ্যাঞ্চলে কারাক গভর্নরেটের হামুদ এলাকায় একটি গির্জায় বন্দুকধারীদের হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৩৪ জন। গতকাল শুক্রবার এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানায় ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসি।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিচয় না জানা বন্দুকধারীরা একটি গাড়িতে করে এসে গির্জায় প্রবেশ করে গুলি চালাতে শুরু করে। পরে তারা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী এ হামলার দায় স্বীকার করেনি।
সংবাদ সম্মেলনে জর্ডানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাজেন আল-ফারায়া হামলাকারীদের ‘চরমপন্থী গোষ্ঠী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ।
জর্ডানের রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ বলেছেন, কারাককে লক্ষ্য করে চালানো ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হামলার পর হতাহতের সংখ্যা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়। প্রাথমিক প্রতিবেদনে সাতজন নিহত হওয়ার কথা জানানো হলেও পরে সরকারের এক মুখপাত্র নিহতের সংখ্যা ছয় বলে জানান। পরে কর্মকর্তারা আবারও নিহতের সংখ্যা সাত বলে নিশ্চিত করেন।
বিবিসি যাচাই করা সিসিটিভি ফুটেজে তিনজন বন্দুকধারীকে সড়ক থেকে গির্জার দিকে এগিয়ে যেতে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে দুজনকে গির্জা প্রাঙ্গণে গাড়ি প্রবেশের পথে যেতে দেখা যায়। পরে তারা কিছুক্ষণের জন্য সরে গিয়ে তৃতীয় একজনকে নিয়ে ফিরে আসেন। তিনজনের হাতেই পিস্তল ছিল বলে ফুটেজে দেখা যায়।
হামলার সময় গির্জার ভেতরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গুলির শব্দে প্রাণ বাঁচাতে অনেকে গির্জার বেঞ্চের নিচে আশ্রয় নেন এবং জানালা থেকে দূরে সরে যান। প্রার্থনার শব্দের সঙ্গে মানুষের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। কেউ কেউ পালানোর চেষ্টা করেন।
গির্জায় উপস্থিত খালিদ আল-মদানাত বিবিসি আরবিকে বলেন, প্রায় ১৫ মিনিট ধরে হামলা চলে। এ সময় গুলি চলতে থাকলেও মানুষ পালানোর চেষ্টা করছিলেন।
তিনি বলেন, ‘মানুষ ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন এবং মাটিতে শুয়ে পড়েন। কেউ আত্মরক্ষার জন্য আশ্রয় নিচ্ছিলেন, কেউ নিহত ব্যক্তিদের জড়িয়ে ধরে ছিলেন। কেউ সন্তানদের বুকে আগলে রাখছিলেন, আবার কেউ শিশুদের নিয়ে পালাচ্ছিলেন।’
খালিদ জানান, হামলাকারীরা গির্জার দরজা দিয়ে বেরিয়ে একটি পিকআপে করে পালিয়ে যায়। পালানোর সময়ও তারা গুলি চালাচ্ছিল।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, প্রথমে তার মনে হয়েছিল যুদ্ধ শুরু হয়েছে। পরে তিনি মাটিতে আহত ব্যক্তিদের পড়ে থাকতে দেখেন। তার ভাষায়, ‘দৃশ্যটি ছিল ভয়াবহ।’
গির্জায় উপস্থিত এক নারী জানান, প্রার্থনার কয়েক সেকেন্ড পর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এরপর মেশিনগানের গুলি ও কাচ ভাঙার শব্দে সবাই বুঝতে পারেন, সেখানে কিছু একটা ঘটছে। পরিস্থিতি টানা প্রায় ১০ মিনিট ধরে আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। গির্জা থেকে বেরিয়ে তিনি প্রাঙ্গণজুড়ে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আল-ফারায়া এ ঘটনাকে ‘বেদনাদায়ক ও ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, জর্ডানের ইতিহাসে এমন ঘটনা নজিরবিহীন।
হামলায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসাদানকারী হাসপাতালে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের স্বজনদের মধ্যে শোক, ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দেয়। নিরাপত্তার জন্য হাসপাতালের আশপাশের সড়ক বন্ধ করে দেওয়ায় অনেককে গাড়ি রেখে হেঁটে যেতে হয়। আহত ব্যক্তিদের দেখতে রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহর হাসপাতাল পরিদর্শনকে কেন্দ্র করেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের মধ্যে অনেকে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করেন।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ জর্ডানে কারাক এলাকায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক খ্রিষ্টান বাস করেন। দেশটিতে এ ধরনের সহিংস হামলা বিরল হলেও অতীতে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটেছে।
লেবাননের গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, দেশটির প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি একে ‘জঘন্য সন্ত্রাসী হামলা’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এ ঘটনা মৃত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা ও শেষকৃত্যে অংশ নেওয়া শোকাহত মানুষের পবিত্রতা লঙ্ঘন করেছে এবং ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
