দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো-রাজনৈতিক মতাদর্শ, সুশাসন বা জনকল্যাণমুখী ভাবনার চেয়ে ধর্মীয় আবেগ ও পরিচয়ভিত্তিক সংবেদনশীলতাকে ব্যবহার করার প্রবণতা। কোনো কোনো রাজনীতি বিশ্লেষক বিদ্রূপ করে হোক বা শ্লেষাত্মক ভাষায় হোক, রাজনৈতিক দলগুলোর এমন অন্ধ আনুগত্য ও সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় এজেন্ডাভিত্তিক অবস্থানকে ব্যঙ্গাত্মক পরিভাষায় সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেন। তবে এই হালকা চটুলতার গভীরে লুকিয়ে আছে দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির এক বিষাদময় ভূ-রাজনৈতিক সত্য।
ভারতের ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং বাংলাদেশের কিছু ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতির ইতিহাস, রূপরেখা ও কার্যপদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়-উভয় দলই ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় আবেগকে ভিত্তি করে নিজস্ব সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে তুলেছে। একদিকে ভারতে বিজেপি যখন ‘গো-রক্ষা’ বা ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে বহুল আলোচিত জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় এজেন্ডা সামনে এনে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভোট ব্যাঙ্ক সুসংগঠিত করে, অন্যদিকে বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল ধর্মভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা ও কঠোর সাংগঠনিক কাঠামোর দোহাই দিয়ে তাদের দলীয় বলয় ও আদর্শিক ভিত্তি বজায় রাখে।
প্রথমত, বিজেপি-র রাজনীতির ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বা সামাজিক সংকটের চেয়ে অনেক সময় প্রতীকী ধর্মীয় বিষয়াদি প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। ‘গো-রক্ষা’ কেন্দ্রিক রাজনীতি বা নির্দিষ্ট ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের প্রসার সমাজে কেবল উগ্রতাই বাড়ায়নি, বরং প্রান্তিক গোষ্ঠী ও সংখ্যালঘুদের মাঝে তৈরি করেছে গভীর নিরাপত্তাহীনতা। অর্থনৈতিক নীতি কিংবা জাতীয় উন্নয়নের চটকদার বিজ্ঞাপনের পেছনে এই পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিই মূলত তাদের শক্তির মূল আধার হিসেবে কাজ করে।
আরও পড়ুন
ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও রাস্তা সম্প্রসারণের নামে একের পর এক ঐতিহাসিক মসজিদ, সুফি দরগাহ ও ধর্মীয় স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এর পাশাপাশি ঈদুল আজহায় ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী পশু কোরবানি দিতে গিয়ে প্রশাসনিক নানা বিধিনিষেধ ও চরম সামাজিকভাবে হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে দেশটির মুসলিম ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের। মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ দলের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
মানবাধিকার ও গবেষণা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুসারে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কয়েক ডজন (বা অন্তত ২০ থেকে ৩০টিরও বেশি) মসজিদ, মাদ্রাসা ও সুফি দরগাহ প্রশাসনিক উচ্ছেদ কিংবা বিরোধের জেরে ভেঙে ফেলা হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতির একটি বড় দিক হলো তাদের কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যকার অন্ধ আনুগত্য বা প্রথাবদ্ধ আদর্শিক চর্চা। যেখানে আধুনিক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে নেতৃত্বকে প্রশ্ন করা এবং স্বাধীন চিন্তার সুযোগ থাকা আবশ্যক, সেখানে দলটির রাজনীতিতে একক আদর্শিক সিদ্ধান্তের প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্য প্রদর্শনই মুখ্য হয়ে ওঠে। এর ফলে রাজনৈতিক দলে চিন্তার স্বাধীনতা বা উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির চর্চা সংকুচিত হয়ে পড়ে।
এই দুই দেশের দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক হলো সমাজে বিভাজন সৃষ্টি। ধর্ম ও পরিচয়কে রাজনীতির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় দক্ষিণ এশিয়ায় যে মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তা অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং সামাজিক সম্প্রীতির জন্য এক বিশাল হুমকি। যখন রাজনৈতিক দলগুলো কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সুশাসনের মতো মৌলিক বিষয়গুলোর চেয়ে আবেগভিত্তিক রূপক ও এজেন্ডাকে সামনে আনে, তখন আখেরে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ জনগণই।
দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর টেকসই উন্নয়ন ও স্থায়ী শান্তির জন্য পরিচয়ভিত্তিক ও আবেগকেন্দ্রিক রাজনীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। রাজনীতি হতে হবে জনকল্যাণমুখী, পরমতসহিষ্ণু এবং প্রগতিশীল। ধর্মাশ্রয়ী পপুলিজম কিংবা অন্ধ অনুসরনের রাজনীতি কোনো দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করতে পারে না; বরং এটি সমাজকে আরও সংঘাত ও পিছিয়ে পড়ার দিকে ঠেলে দেয়।
