সিরাজগঞ্জে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে নাড়ু-মোয়া তৈরি করছেন গৃহিনীরা। কাজের ফাঁকে চলে গল্প, হাসি-আড্ডা ও পারস্পরিক সহযোগিতা। পূজার আগে নারীদের এই মিলনমেলাও হয়ে ওঠে উৎসবের অংশ। মঙ্গলবার সিরাজগঞ্জের সদর উপজেলা সহ কামারখন্দ, বেলকুচি, উল্লাপাড়া, তারাশ প্রতিটি উপজেলায় বিভিন্ন মহল্লায় সনাতন ধর্মালম্বীদের অধিকাংশ বাড়িতে এই কাজে ব্যস্ত নারীরা।
দুর্গাপূজা এলেই সিরাজগঞ্জের উল্লেখিত এলাকায় সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোয় শুরু হয় নাড়ু-মোয়া তৈরির ব্যস্ততা। কোথাও নারকেল কোরানো হচ্ছে, কোথাও গুড়ের পাক তৈরি হচ্ছে। কেউ তিল ভাজছেন, কেউবা মুড়ি ও খইয়ের সঙ্গে গুড় মিশিয়ে তৈরি করছেন মোয়া। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে মিষ্টি ঘ্রাণ।
এসব নাড়ুুমোয়া দিয়ে অতিথি আপ্যায়নের পাশাপাশি স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের বাড়িতে পাঠানো হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপকরণের দাম বেড়েছে। তবে নাড়ু-মোয়া তৈরির এই আয়োজনে তেমন ভাটা পড়েনি।
এবারও দুর্গাপূজা উপলক্ষে জেলার পৌরসভাসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাড়িতে বাড়িতে চলছে হরেক পদের নাড়ু-মোয়া তৈরির কাজ।
নাড়ু-মোয়া তৈরির মূল কারিগর বাড়ির নারীরাই। অনেক সময় ডেকে আনা হয় প্রতিবেশী কিংবা নাড়ু তৈরিতে দক্ষ নারীদের। পূজার মৌসুমে সিরাজগঞ্জের পৌর এলাকাতেই এমন ২০ থেকে ৩০ জন নারীর খোঁজ পাওয়া যায়, যাঁরা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে নাড়ু-মোয়া তৈরি করে দেন।
যেমন শিল্পী রাণী, সুস্মিতা, মলি, ইন্দুবালা হালদার ও গীতারানী হালদার এদের দুর্গাপূজার সময় তাঁদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। এবার এরই মধ্যে ১০টির বেশি বাড়িতে নাড়ুুমোয়া তৈরি করে দিয়েছেন। আরও কয়েকটি বাড়িতে কাজ করছেন।
ইন্দুবালা ও গীতারানী বলেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাড়ু-মোয়া তৈরি করে প্রত্যেকের চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
অনেক জায়গায় আবার প্রতিবেশী নারীরা দল বেঁধে এসব খাবার তৈরি করেন। আজ একজনের বাড়িতে নাড়ু-মোয়া বানালেন তো পরদিন তাঁরা গেলেন আরেকজনের বাড়িতে। এভাবে কাজের পাশাপাশি চলে গল্প, হাসি-আড্ডা। এটা পারস্পরিক সহযোগিতারও দারুণ নজির।
তবে নাড়ু-মোয়া তৈরির উপকরণ কেনার দায়িত্ব মূলত পুরুষদের। কোন পদ কতটা মিষ্টি হবে, কোনটির জন্য গুড়ের পাক কেমন হওয়া দরকার, কিংবা কোন উপকরণ কখন মেশাতে হবে, এসব অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ওপরই নির্ভর করে তৈরি খাবারের স্বাদ।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে তৈরি নাড়ু-মোয়ার পদের সংখ্যাও কম নয়। নারকেলের নাড়ু, তিলের নাড়ু, ক্ষীরের নাড়ু, ছাতুর নাড়ু, মুড়ির মোয়া, ঢ্যাপের মোয়া, ঝুড়ির মোয়া, বাদামের মটকা, তক্তি, পাকানো খই ও মুড়কি—এসব খাবারের প্রচলন রয়েছে।
উপকরণ ও তৈরির পদ্ধতি অনুযায়ী খাবারগুলোর স্বাদ ও ধরন আলাদা। নারকেল ও গুড় দিয়ে তৈরি নাড়ুর রয়েছে পরিচিত মিষ্টি স্বাদ। তিলের নাড়ুতে পাওয়া যায় তিলের ঘ্রাণ। ছাতুর নাড়ু তৈরি হয় ছাতুর সঙ্গে মিষ্টি উপকরণ মিশিয়ে। অন্যদিকে মুড়ি কিংবা খইয়ের সঙ্গে গুড়ের পাক মিশিয়ে তৈরি করা হয় মোয়া। ক্ষীরের নাড়ু ও বাদামের মটকার মতো পদে উপকরণের ভিন্নতা স্বাদে যোগ করে আলাদা মাত্রা।
এবার নাড়ু-মোয়া তৈরির প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে। নারকেল, গুড়, তিল, মুড়ি ও অন্যান্য উপকরণ কিনতে আগের তুলনায় বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এরপরও সব বাড়িতেই সাধ্যমতো নানা পদের মিষ্টান্ন তৈরি করা হচ্ছে। কেননা নাড়ু-মোয়া তো শুধু খাবার নয়, দুর্গাপূজার আনন্দ ও ঐতিহ্যেরও অংশ।
সিরাজগঞ্জ জেলা পূজা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ভিপি অমর কৃষ্ণ দাস ও জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাবেক সভাপতি এ্যাড. সুকুমার চন্দ্র দাস বলেন, দুর্গাপূজায় নাড়ু-মোয়ার বিভিন্ন পদ দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন বেড়ার হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। এ কারণে ছোট-বড়, ধনী-গরিব সবার বাড়িতেই দুর্গাপূজার সময় নাড়ু-মোয়া তৈরির ধুম পড়ে যায়।
নারকেল, গুড়সহ নাড়ু-মোয়ার সব উপকরণের দাম বেড়েছে উল্লেখ করে পৌর এলাকার রাম, লক্ষন বলেন, ঐতিহ্য তো আর বাদ দেওয়া যায় না। প্রায় ৬০-৭০ বছর ধরে দেখে আসছি, দুর্গাপূজা এলেই পাড়ার বাড়িগুলোতে নানা পদের নাড়ু-মোয়া তৈরি হয়।
কামারখন্দের জামতৈল গ্রামের বাসিন্দা প্রভাত কুমার দাস ও স্কুলশিক্ষকা বিনাবানি সাহা বলেন, ‘পূজা উপলক্ষে বানানো নাড়ু-মোয়া আমার পরিচিত হিন্দু-মুসলিম সবারই খুব প্রিয়। এগুলো ছাড়া পূজার আনন্দ যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এগুলো দিয়ে শুধু অতিথি আপ্যায়নই করা হয় না। ঘনিষ্ঠদের বাড়ি বাড়ি এগুলো পাঠানোও হয়ে থাকে।’
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের লক্ষীরাণি সাহা বলেন, এই আয়োজনের ভিন্ন একটি সামাজিক দিকও আছে। নাড়ু-মোয়ার স্বাদ ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে আটকে থাকে না। পরিচিতজনদের মধ্যে এসব খাবার আদান-প্রদানে বাড়ে সৌহার্দ্য ও আন্তরিকতা।
