নেত্রকোনায় উপজেলা যুবদল নেতা ফের বহিষ্কার
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২০ এএম
আপডেট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৮ এএম
যুবদল নেতা মোজাম্মেল হক সোহেল ছবি: খবরের কাগজ
-->নেত্রকোনার বারহাট্টায় এক বিধবা নারীকে মারধরের অভিযোগে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক সোহেলকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (দপ্তরের দায়িত্বে) মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
এর আগে, সোমবার রাতে বারহাট্টা উপজেলা সদরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে যান নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি ডা. আনোয়ারুল হক। পরিদর্শনের এক পর্যায়ে অর্চনা রানী দাস নামে এক বিধবা নারী সংসদ সদস্যের পায়ে পড়ে আকুতি জানান এবং অভিযোগ করেন যে, মোজাম্মেল হক সোহেল তাকে মারধর করেছেন।
আরও পড়ুন
ঘটনাটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি সোহেলকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়নের নির্দেশে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয় বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
আরও পড়ুন
সূত্র জানায়, এর আগেও গত ৪ জুলাই অন্য ঘটনায় মোজাম্মেল হক সোহেলকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ৩০ জুলাই তার বহিষ্কারাদেশ বাতিল করা হয়।
এবারের বহিষ্কার ও অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোজাম্মেল হক সোহেল বলেন, ‘প্রতিবেশী ওই নারীর পরিবারকে মেয়ের বিয়ের জন্য সাত বছর আগে এক লাখ টাকা ধার দিয়েছিলাম। দীর্ঘদিনেও সেই টাকা ফেরত না দেওয়ায় তাদের সঙ্গে সামান্য তর্কবিতর্ক হয়েছিল।’
মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের লোকজন ওই নারীকে প্ররোচিত করে সংসদ সদস্যের কাছে পাঠিয়েছে। সেখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
সঞ্জয় সরকার/অলি/
আরও পড়ুন
অঞ্জলি, আরতি ও যজ্ঞে মহানবমী উদযাপন
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০০ এএম
ময়মনসিংহ নগরীর দুর্গাবাড়ি মন্দিরে নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে মহানবমী। ছবি: খবরের কাগজ
-->ঢাকের বাদ্য, ধূপের গন্ধ আর মন্ত্রোচ্চারণে মুখর ময়মনসিংহের দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলো। দেবী দুর্গার চরণে ফুল, বেলপাতা ও দূর্বা দিয়ে অঞ্জলি, ভোগ নিবেদন, আরতি ও যজ্ঞ এমন নানান ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গতকাল উদযাপিত হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমী।
ময়মনসিংহ নগরীর মণ্ডপগুলোতে ভক্তদের উপস্থিতিতে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে আনন্দের আবহের মধ্যেই বাজতে শুরু করেছে বিদায়ের সুর।
মহানবমী উপলক্ষে নগরীর দুর্গাবাড়ি মন্দিরে সকাল থেকেই ভক্তদের ভিড় দেখা যায়। পূজামণ্ডপে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান ভক্তরা। ফুল, বেলপাতা ও দূর্বাসহ পূজার উপকরণ হাতে নিয়ে তারা দেবীর চরণে অঞ্জলি দেন। পূজা-অর্চনা শেষে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। নগরীর অন্যান্য মন্দির ও পূজামণ্ডপেও বিশেষ পূজা, আরতি, যজ্ঞ ও ভোগ নিবেদনের আয়োজন করা হয়।
আরও পড়ুন
অঞ্জলি দিতে আসা আরতি নামে এক ভক্ত বলেন, ‘মহানবমী আমাদের কাছে শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, আত্মশুদ্ধি ও মঙ্গল কামনারও দিন। আমরা চাই, দেবীর আশীর্বাদে মানুষের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ কমুক, সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হোক।’
শুভ চন্দ্র দাস নামে আরেক ভক্ত বলেন, ‘প্রতিবছর পরিবারের সবাইকে নিয়ে পূজায় আসার চেষ্টা করি। এই উৎসব আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ করে দেয়। তবে উৎসবের শেষ দিনগুলোতে মনটা একটু খারাপও হয়ে যায়। আবার একটি বছরের অপেক্ষা শুরু হবে।’
আরও পড়ুন
মহানবমীর ধর্মীয় তাৎপর্য ঘিরেও ভক্তদের মধ্যে ছিল বিশেষ আগ্রহ। হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুরের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদিকে রামায়ণের কাহিনি অনুসারে, দেবী দুর্গার আশীর্বাদ নিয়ে শ্রীরামচন্দ্র রাবণকে বধ করেছিলেন। এই বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করেই মহানবমীতে বিশেষ পূজা ও যজ্ঞের আয়োজন করা হয়।
পূজামণ্ডপে আসা অয়ন সাহা নামে এক তরুণ ভক্ত বলেন, ‘দুর্গাপূজা আমাদের কাছে আনন্দের পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধেও দাঁড়ানোর প্রেরণা। দেবী দুর্গার বিজয়ের তাৎপর্য থেকে আমরা সাহস, ন্যায়বোধ ও মানবিকতার শিক্ষা নিতে পারি।’
এদিকে মহানবমীর পূজা শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের সমাপ্তির ক্ষণ আরও ঘনিয়ে এসেছে। বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। শেষ দিনের আনুষ্ঠানিকতা ঘিরে ভক্তদের মধ্যে যেমন রয়েছে প্রস্তুতি, তেমনি রয়েছে প্রিয় দেবীকে বিদায় জানানোর আবেগ।
ভক্তদের প্রত্যাশা, দেবী দুর্গার আশীর্বাদে অশুভ শক্তির বিনাশ হবে, মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর হবে এবং পৃথিবীতে শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হবে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মহানবমীর এই আয়োজন মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আরও জোরদার করবে।
ময়মনসিংহ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় ৮০৬টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহ নগরীতেই রয়েছে ৯০টি মন্দিরে পূজার আয়োজন।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক শংকর সাহা বলেন, ‘এবার খুবই উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। ধর্মীয় আচার, প্রার্থনা আর মানুষের মিলনমেলায় নগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে শারদীয় উৎসবের আবহ।’
ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, ‘পূজাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে। আশা করছি, বিসর্জন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে না এবং এই আনন্দমুখর পরিবেশ বজায় থাকবে।’
আরও পড়ুন
শুঁটকি উৎপাদনে ধস চলনবিলে দেশি মাছের সংকট
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৫ এএম
শুঁটকি মৌসুমেও চলনবিলে মাছসংকটে বাঁশের মাচা ফাঁকা পড়ে আছে। গতকাল সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মহিষলুটি এলাকায় । ছবি: খবরের কাগজ
-->একসময় দেশি মাছের প্রাচুর্যে ভরপুর ছিল উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ চলনবিল। সময়ের সঙ্গে কমেছে মাছের উৎপাদন, দেখা দিয়েছে দেশি থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সংকট। অপরিকল্পিত পুকুর খনন, বর্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পানি না থাকা ও বাদাই জালে মা মাছ নিধনের কারণে ব্যাহত হচ্ছে বংশবিস্তার। এর প্রভাব পড়েছে শুঁটকি উৎপাদনে। মাছের অভাবে একের পর এক বন্ধ হচ্ছে শুঁটকির চাতাল। এতে বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ী, জেলে ও শ্রমজীবীরা।
সিরাজগঞ্জ মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলনবিলের মাছ ঘিরে প্রতি বছর আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কর্মব্যস্ত হয়ে ওঠে শুঁটকিপল্লির চাতালগুলো। তবে মাছের সংকটে কমছে শুঁটকি উৎপাদন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উল্লাপাড়া ও তাড়াশ উপজেলার ৬০টি শুঁটকি মহালে ৩০২ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদিত হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৮৫ দশমিক ১৭ মেট্রিক টনে। এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এতে কয়েক কোটি টাকার বাজার হারানোর পাশাপাশি সংকটে পড়েছেন এ পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলনবিলের শুঁটকিপল্লিতে দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরি এসব শুঁটকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি রপ্তানি করা হয় বিদেশেও। তাড়াশের মহিষলুটি মাছের আড়ত, চাটমোহরের বোয়ালমারী ও সিংড়া বাজারসহ বিভিন্ন আড়ত থেকে মাছ কিনে আনা হয় চাতালে। সেখানে শোল, বোয়াল, খলসা, টাকি, টেংরা ও চাঁদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শুকিয়ে তৈরি করা হয় শুঁটকি। পরে এসব শুঁটকি সৈয়দপুর, নীলফামারী ও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়।
আরও পড়ুন
সম্প্রতি হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়কের মহিষলুটি শুঁটকিপল্লিতে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের দুই পাশে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে শুঁটকি তৈরির চাতাল। কয়েকটি চাতালে সামান্য পুঁটি মাছ রোদে শুকানো হচ্ছে। অন্য চাতালগুলোতে পড়ে আছে গোছানো চাটাই। মাছের অভাবে অধিকাংশ চাতালেই উৎপাদন বন্ধ। কাজ না থাকায় অলস সময় পার করছেন চাতালমালিক ও শ্রমিকেরা।
তাড়াশ উপজেলার মহিষলুটি এলাকার শুঁটকি চাতাল মালিক আলী আসলাম বলেন, ‘বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এ বছর আশঙ্কাজনকহারে বিলের মাছ কমেছে। আড়তে মাছ পাওয়া গেলেও মাছের দাম অনেক বেশি। এত বেশি দামে মাছ ক্রয় করে শুটকি বানানো আমাদের জন্য দুস্কর।’
আরও পড়ুন
তাড়াশ উপজেলার মান্নান নগর এলাকার শুঁটকি ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম বলেন, ‘চলনবিলে মাছের সংকটের কারণে প্রায় ৫০ শতাংশ মহালে শুঁটকি উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এতে প্রায় ৬ হাজার শ্রমজীবী মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন।’
মান্নান নগর মৎস্য আড়তদার রাসেল আহমেদ বলেন, ‘আড়তে মাছ সংকটের কারণে এখানকার অনেক চাতালের কার্যক্রম পুরাপুরি শুরু করতে পারেনি। এ মৌসুমে যে পরিমাণ মাছ আড়তে আমদানি হওয়ার কথা এর কিছুই হচ্ছে না।’ একই ধরনের কথা বলেন সিরাজ সরকার নামে আরেক মৎস্য আড়ৎদার।
সিরাজগঞ্জ সরকারী কলেজের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ‘একসময় চলনবিলের যেসব এলাকায় সারা বছর পানি থাকত, সেসব স্থানে এখন বর্ষা ছাড়া অন্য সময় পানি থাকে না। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট, পুকুর খনন, অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট ও বাঁধ নির্মাণ, বসতবাড়ি এবং শিল্প-কারখানা সম্প্রসারণের ফলে মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। চলনবিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা না গেলে এক সময় সব হারিয়ে যাবে।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘চলনবিলে মাছের সংকটের কারণে শুঁটকি উৎপাদনে ব্যবসায়ীদের কিছুটা হিমশিম খেতে হচ্ছে। নিরাপদ উপায়ে শুঁটকি উৎপাদন নিশ্চিত করতে স্থানীয় মৎস্য অফিস থেকে চাতাল মালিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শুঁটকির গুণগত মান উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে।’
আরও পড়ুন
পূজামণ্ডপে অভয়ার বার্তা
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩০ এএম
নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে ‘অভয়া’ থিমে সাজানো হয়েছে পূজামণ্ডপ। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের সবুজবাগ যুব দুর্গাপূজা উদযাপন পরিষদের পূজামণ্ডপে। ছবি: খবরের কাগজ
-->মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের সবুজবাগ এলাকার একটি পূজামণ্ডপে দেবী দুর্গার প্রতিমার পাশাপাশি স্থান পেয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্লোগান। দেয়ালে কোথাও মুষ্টিবদ্ধ হাত, কোথাও চোখ বাঁধা নারীর প্রতিকৃতি। লাল রঙের হাতের ছাপে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নিপীড়ন, রক্তক্ষরণ ও প্রতিরোধের প্রতীকী চিত্র। বড় অক্ষরে লেখা ‘ভয় নয়, প্রতিবাদ হোক’।
নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির বার্তা নিয়ে এবার দুর্গাপূজার আয়োজন করেছে সবুজবাগ যুব দুর্গাপূজা উদযাপন পরিষদ। ১৮তম বর্ষের আয়োজনে তাদের থিম ‘অভয়া’। দেবী দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি নারীর সাহস, অধিকার ও আত্মমর্যাদার বিষয়টি তুলে ধরতেই এ উদ্যোগ।
মণ্ডপে ঢুকতেই চোখে পড়ে নারী জাগরণ, অধিকার ও সমতার নানা বার্তা। বেদিতে দেবী দুর্গার প্রতিমার ওপরে ও আশপাশে লেখা রয়েছে ‘ভয় নয়, প্রতিবাদ হোক’ এবং ‘অভয়া, প্রতিবাদী নারীর কণ্ঠস্বর’। মণ্ডপের দেয়াল সাজানো হয়েছে নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া, কবি সুফিয়া কামাল, ইলা মিত্র, রানি রাসমণি ও কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর বাণী দিয়ে।
আরও পড়ুন
মুষ্টিবদ্ধ হাত, চোখ বাঁধা নারীর প্রতিকৃতি এবং লাল হাতের ছাপের চিত্রকর্মে তুলে ধরা হয়েছে নারীর ওপর নিপীড়ন, অবদমন ও প্রতিবাদের ভাষা। দেয়ালে সাঁটানো স্লোগানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘প্রতিবাদ মানেই বিদ্রোহ নয়, প্রতিবাদ মানেই বিবেক’, ‘অপরাধীর লজ্জা, ভুক্তভোগীর নয়’ এবং ‘পোশাক নয়, মানসিকতা বদলাও’। এসব স্লোগানে মণ্ডপটি হয়ে উঠেছে নারীর অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে এক প্রতিবাদী মঞ্চ।
আয়োজকরা জানান, ‘অভয়া’ শুধু একটি নাম নয়, এটি ভয়কে জয় করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নারীর সাহস ও প্রতিবাদের প্রতীক। নারী ও শিশুর প্রতি নির্যাতনসহ বিভিন্ন সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাতেই এ থিম বেছে নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন
সেখানে আসা শিক্ষার্থী সুস্মিতা দেব বলেন, ‘দুর্গাকে আমরা অশুভ শক্তির বিনাশ ও ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে দেখি। সেই ভাবনার সঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের বার্তা যুক্ত করায় আয়োজনটি আরও অর্থবহ হয়েছে। সমাজের সবার এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।’
সাংস্কৃতিক কর্মী ঐন্দিলা চাকলাদার বলেন, ‘দুর্গাপূজায় সাধারণত প্রতিমা ও আলোকসজ্জা দেখতে আসি। কিন্তু এই মণ্ডপে এসে নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো নতুন করে ভাবার সুযোগ হয়েছে। ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে এমন সামাজিক বার্তা যুক্ত করা প্রশংসনীয়।’
আরেক দর্শনার্থী শিক্ষিকা সুপ্তা আচার্য বলেন, ‘থিমভিত্তিক পূজা এখন অনেক জায়গায় হয়। তবে সামাজিক সমস্যাকে এভাবে তুলে ধরলে মানুষ শুধু দেখে চলে যাবে না, বিষয়টি নিয়ে ভাববেও। নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে এ ধরনের সচেতনতামূলক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।’
আয়োজক কমিটির সভাপতি ত্রিদিব রক্ষিত বলেন, ‘আমরা প্রতি বছরই থিমভিত্তিক পূজা করি। এবার আমাদের থিম অভয়া। সমাজে নারী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। অভয়া কোনো নাম নয়, এটি প্রতিবাদী নারীর কণ্ঠস্বর। নারীদের অন্ধকারে রাখলে সমাজ কখনো এগোতে পারে না। এসব চিন্তা থেকেই আমরা মণ্ডপ সাজিয়েছি।’
আরও পড়ুন
মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশে বাড়ি ছেড়েছিলেন ৪ জন, ১৪ বছরেও মেলেনি খোঁজ
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৫ এএম
আপডেট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৩ এএম
নিখোঁজ গঞ্জের আলীর স্ত্রী ও মেয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন (বাঁয়ে)। তাদের পাশে পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন নিখোঁজ রিফাজুল ইসলামের ভাই। সামনে চেয়ারে বসে আছেন বাবলু হোসেনের দুই ভাই। ছবি: খবরের কাগজ
-->পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে স্থানীয় দালালের মাধ্যমে ২০১২ সালে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে বাড়ি ছেড়েছিলেন মেহেরপুরের গাংনীর রুইয়েরকান্দি গ্রামের চার যুবক গঞ্জের আলী, আহাদ আলী, রিফাজুল ইসলাম ও বাবলু হোসেন। কিন্তু ঢাকায় পৌঁছানোর পর তাদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের খোঁজ মেলেনি। স্বজনদের অভিযোগ, নিখোঁজদের সন্ধান চাইতে গিয়ে দালালদের হুমকি ও মারধরের শিকার হতে হয়েছে তাদের। দালালচক্রের সদস্যরা প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ে মুখ খুলতেও সাহস পাচ্ছেন না পরিবারের সদস্যরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে মালয়েশিয়া পাঠানোর কথা বলে গাংনীর হেমায়েতপুর গ্রামের আবুল কাশেম ও চুয়াডাঙ্গার হাঁটুভাঙ্গা গ্রামের আকিম উদ্দিনের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার উদ্যোগ নেন ওই চার যুবক।
নিখোঁজ আহাদ আলীর স্ত্রী শরিফা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী পাশের গ্রামের কাশেমের মাধ্যমে ১৪ বছর আগে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হন। এরপর আর কখনো তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। দীর্ঘদিন কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছি। কাশেমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ভয়ভীতি দেখিয়েছে। থানায় গেলে ক্ষতি করার হুমকি দেওয়ায় সেখানেও যেতে পারিনি।’
আরও পড়ুন
নিখোঁজ রিফাজুল ইসলামের স্ত্রী আঁখি আক্তার বলেন, ‘১৪ বছর ধরে আমার স্বামীর কোনো খোঁজখবর পাইনি। বিদেশ যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর ফোন করে জানিয়েছিলেন, তিনি সমুদ্রপথে যাচ্ছেন। তাদের সঙ্গে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মানুষ ছিলেন। এরপর তাদের কারও কোনো খোঁজখবর পাওয়া যায়নি।’
নিখোঁজ গঞ্জের আলীর মেয়ে ফিরোজা খাতুন বলেন, ‘আমার বাবার নিখোঁজের ঘটনায় দালালের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছি। আদালতে মামলা চলছে। তবে দালাল নিখোঁজ থাকায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।’
আরও পড়ুন
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত দালাল চক্রের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নেই। তাদের বাড়িঘর তালাবদ্ধ। কেউ সেখানে থাকেন না, তারাও আর এলাকায় আসেন না। যাদের বিদেশে পাঠানো হয়েছিল, তাদেরও কোনো খোঁজ নেই। যারা পাঠিয়েছেন, তাদেরও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তবে শুনেছি তারা ঢাকার দিকে থাকেন। ভয়ে গ্রামে আসেন না।’
মেহেরপুরে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও জেলার অনেক মানুষ বিদেশে পাঠানোর নামে দালালচক্রের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তবে দালালচক্রের প্রভাব ও ভয়ে অনেকে আইনি সহায়তা নিতে সাহস পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গাংনী উপজেলার কাজিপুর গ্রামের ৬০ জনকে কম খরচে মালয়েশিয়া নেওয়ার স্বপ্ন দেখায় একটি দালাল চক্র। তাদের প্রলোভনে পড়ে কেউ শেষ সম্বল, কেউ ভিটেমাটি বিক্রি করেন। আবার কয়েকজন উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের জিম্মি করে আরও টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এভাবে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়া গিয়ে ফিরে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে কাজিপুর গ্রামের নুরুজ্জামানের ছেলে শাহীন আলম, কাবের আলীর ছেলে রাজন আলী ও আনারুল ইসলামের ছেলে রেজাউল আলমের সঙ্গে আমরা কথা বলি।
শাহীন আলম বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় নেওয়ার পর কোনো কাজ দেওয়া হয়নি। উল্টো একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। প্রথমদিকে খাবার ও পানি দেওয়া হলেও পরে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। খাবার চাইলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হতো। আমাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়ায় পালিয়েও যেতে পারিনি। পরে বাড়ি থেকে আবারও টাকা পাঠানোর পর আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এখন দেশে ফিরে চাষাবাদ করে দিন পার করছি।’
রেজাউল আলম বলেন, ‘আমাদের অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। সেখানে যাওয়ার পর দালালরা কোনো কাজের ব্যবস্থা করতে পারেনি। উল্টো আমাদের জিম্মি করে রাখা হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা আবারও টাকা পাঠানোর পর আমাদের মুক্তি দেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা একেবারেই নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমার অনুরোধ, কেউ যেন দালালদের মাধ্যমে অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করে আমাদের মতো নিঃস্ব না হন।’
এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সমাজের সচেতন ব্যক্তিরা। মেহেরপুরের সমাজসচেতক অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল আমিন ধুমকেতু বলেন, ‘মানব পাচারকারীরা সব সময় অভাবগ্রস্ত মানুষদের লক্ষ্য করে। ভাগ্যের উন্নয়নে যারা কম খরচে বিদেশে যেতে চান, তাদেরই ফাঁদে ফেলেন তারা। কিন্তু কম খরচে বিদেশে যেতে গিয়ে ভাগ্যের উন্নয়নের বদলে অনেকেই মৃত্যুঝুঁকিতে পড়েন। আধুনিক এই যুগে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে মানুষকে সচেতন করতে হবে। মানবপাচার রোধে সচেতনতাই একমাত্র সমাধানের পথ দেখাতে পারে।’
মেহেরপুর জেলা পুলিশ সুপার আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘নিখোঁজের বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সংশ্লিষ্ট থানায় লিখিত অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
