মহার্ঘ এখন আন্দোলন-প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। নিরখরচায় নয়, এ বার বিক্ষোভ কর্মসূচির জন্যেও টাকা খসাতে হবে আন্দোলনকারীদের। যন্তর মন্তরকে বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিল্লিতে প্রতিবাদের জন্য তিনটি নতুন জায়গা নির্দিষ্ট করেছে পুলিশ। কিন্তু বিকল্প হিসেবে চিহ্নিত রামলীলা ময়দানে চলতি বছরের বাকি সময়ের মধ্যে বিক্ষোভের জন্য খালি রয়েছে মাত্র তিনটি দিন। তার উপর এক দিনের জন্য গোটা মাঠ ভাড়া নিতে প্রাথমিক খরচ ১.২১ লক্ষ টাকা। ফলে প্রতিবাদের নতুন ঠিকানা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। এতদিন যন্তর মন্তরে কোনও প্রতিবাদ কর্মসূচি করতে গেলে কোনও টাকা দিতে হতো না। তাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের এই সিদ্ধান্তকে বিরুদ্ধ মত দমনের চেষ্টা বলেই মনে করছেন বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের একাংশ।
দিল্লিতে বিক্ষোভ দেখানোর জায়গা বদল করলেই কি সহজে আন্দোলন করা যাবে? যন্তর মন্তরের পরিবর্তে রামলীলা ময়দান, বুরারি গ্রাউন্ড এবং CBD গ্রাউন্ডকে প্রতিবাদের নির্ধারিত স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে দিল্লি পুলিশ। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পরেই সামনে এসেছে নতুন সমস্যা। বিকল্প বিক্ষোভস্থলগুলির অন্যতম রামলীলা ময়দানে আগামী আড়াই মাসের বেশির ভাগ দিনই আগে থেকে বুক করা রয়েছে। সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরের মধ্যে বিক্ষোভের জন্য খালি রয়েছে মাত্র ২৯, ৩০ ও ৩১ ডিসেম্বর। ফলে তাৎক্ষণিক ভাবে কোনও বড় আন্দোলন আয়োজন করতে গেলে সমস্যায় পড়তে পারে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠন।
এক দিনের জন্য খরচ ১.২১ লক্ষ টাকা
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ১২ একর জমির উপর অবস্থিত রামলীলা ময়দানে একসঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ জমায়েত করতে পারেন। কিন্তু বড় জমায়েতের জন্য গোটা মাঠ ব্যবহার করতে হলে দিতে হবে মোটা টাকা। এক দিনের বুকিংয়ের জন্য ৫০ হাজার টাকা ভাড়া এবং ৫৫ হাজার টাকা সিকিউরিটি ডিপোজ়িট হিসেবে দিতে হয়। সব মিলিয়ে রামলীলায় একদিনের কর্মসূচির কর-সহ প্রাথমিক খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১.২১ লক্ষ টাকা।
বুকিংয়ে একাধিক শর্ত
মাঠ বুকিংয়ের দায়িত্বে রয়েছে দিল্লি পুরনিগমের উদ্যান বিভাগ। তবে বুকিং চূড়ান্ত করার আগে দিল্লি পুলিশের কাছ থেকে NOC নিতে হবে। অর্থাৎ, টাকা থাকলেই যে কোনও সংগঠন চাইলেই মাঠ বুক করতে পারবে, এমন নয়।
অবশ্য মাঠের একটি ছোট অংশ বিনামূল্যে বিক্ষোভ ও জমায়েতের জন্য ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সেখানে সর্বাধিক প্রায় ১৫০ জনের জায়গা হতে পারে। ফলে বড় রাজনৈতিক সমাবেশ বা গণআন্দোলনের ক্ষেত্রে এই বিকল্প কার্যত কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। দিল্লি পুরসভা সূত্রে দাবি, বেশি সংখ্যার জমায়েতে ভাড়া ছাড় দিতে হলে, বিপুল টাকা ক্ষতি হবে।
যন্তর মন্তরের বদলে কেন রামলীলা ময়দান?
১১ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে যন্তর মন্তর রোডকে নির্দিষ্ট বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। তার পরিবর্তে মধ্য দিল্লির রামলীলা ময়দান, উত্তর দিল্লির বুরারি গ্রাউন্ড এবং পূর্ব দিল্লির CBD গ্রাউন্ডকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
এ দিকে বিক্ষোভ প্রদর্শনের নতুন তালিকায় নাম থাকলেও রামলীলা ময়দানে বুকিংয়ের সীমাবদ্ধতা আন্দোলনকারীদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট মহলের। কারণ, দুর্গাপুজো-পরবর্তী রামলীলা অনুষ্ঠান, দশেরা, দীপাবলি-সহ বিভিন্ন উৎসব ও কর্মসূচির কারণে মাঠটি আগে থেকেই বুক করা রয়েছে বলে জানিয়েছেন আধিকারিকেরা। আপাতত, শুধু ২৯, ৩০ এবং ৩১ ডিসেম্বর তারিখগুলিই ফাঁকা আছে।
যানজটের আশঙ্কাও বড় সমস্যা
রামলীলা ময়দান মধ্য দিল্লির ব্যস্ত এলাকায় অবস্থিত। আশপাশে একাধিক হাসপাতাল, বাণিজ্যিক এলাকা এবং দিল্লি পুরনিগমের সদর দপ্তর রয়েছে। বড় জমায়েত হলে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে আসফ আলি রোডে একমুখী যান চলাচল চালু করতে হয়। দেশবন্ধু গুপ্ত রোডের যানবাহনকেও অন্য রাস্তা দিয়ে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।
অতীতে এই মাঠে বড় রাজনৈতিক সমাবেশের কারণে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট তৈরি হওয়ার নজির রয়েছে। ফলে নতুন বিক্ষোভস্থল হিসেবে রামলীলা ময়দানকে বেছে নেওয়ার পর তার ব্যবহারিক সুবিধা-অসুবিধা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক
স্বাধীনতার পর থেকে রামলীলা ময়দান ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে রয়েছে। ১৯৫২ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে জরুরি অবস্থার দিনগুলিতে জয়প্রকাশ নারায়ণ— বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনের সাক্ষী এই মাঠ। ১৯৬২ সালে এই মাঠেই রানি এলিজ়াবেথকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে অরবিন্দ কেজরিওয়ালও এখানে একাধিক কর্মসূচি করেছেন। এমনকী এই গ্রাউন্ডে দাঁড়িয়েই তিন বার দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, যন্তর মন্তর দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন ও নাগরিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল। সেই জায়গার মর্যাদা প্রত্যাহার করে নতুন তিনটি স্থান নির্দিষ্ট করার সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই বিতর্ক তৈরি করেছে।
১৯৮৮–তে ইন্ডিয়া গেট সংলগ্ন বোট ক্লাব এলাকায় বিক্ষোভ প্রদর্শন বন্ধ করেছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার। এর পরে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নরসিনহা রাওয়ের সরকারের আমলে, ১৯৯৩ থেকে যন্তর মন্তরেই সব বিক্ষোভ প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়। মাঝেমধ্যে ব্যবহার করা হতো রামলীলা ময়দানকেও। ইউপিএ সরকারের কার্যকালের শেষ দিকে প্রথমে রামলীলা এবং পরে যন্তর মন্তরেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন করেছিলেন সমাজসেবক আন্না হাজারে এবং তাঁর সহযোগী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, মণীশ সিসোদিয়া, কিরণ বেদীরা। তবে, সোমবার নরেন্দ্র মোদী সরকারের জারি করা নির্দেশিকার পরে পরিস্থিতি যা দাঁড়াল, তাতে নয়াদিল্লিতে আর কোনও প্রতিবাদ কর্মসূচি হবে না। নতুন নির্ধারিত স্থানগুলো সবই পুরোনো দিল্লিতে।
এখন প্রশ্ন, প্রতিবাদের জন্য বিকল্প জায়গা নির্দিষ্ট করলেও যদি সেখানে সময় পাওয়া কঠিন হয় এবং বড় জমায়েতের জন্য বিপুল খরচ করতে হয়, তা হলে সাধারণ নাগরিক ও ছোট সংগঠনগুলির পক্ষে আন্দোলন করা কতটা সহজ হবে? রামলীলা ময়দানের সীমিত বুকিং এবং খরচের অঙ্ক সামনে আসতেই সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
