বাইরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি, কিংবা ঘড়ির কাঁটা গভীর রাতে পৌঁছেছে। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ, খবরের কাগজে ছেপে বেরোনো এক অদ্ভুত খুনির হুমকি, মফস্বলের কোনও হারানো দুপুরের গন্ধ, কিংবা পাহাড়ের কোল থেকে ফিরে আসা কোনও মৃত বিপ্লবী — কিছু গল্প এমনই হয়, যা পাতা উল্টে আপনাকে এক নিমেষে টেনে নিয়ে যায় অন্য এক দুনিয়ায়। কখনও বুক ধুকপুক করে ওঠে স্লিপার সেলের ভয়ে, কখনও বা গা ছমছম করে বিড়ালের ডাকে। আপনি যদি রহস্য, নস্ট্যালজিয়া আর রোমাঞ্চের নেশায় বুঁদ হতে ভালোবাসেন, তবে এই ৬ বই আপনার জন্যই অপেক্ষা করছে। চলুন, খাতার পাতা উল্টে একে একে প্রবেশ করা যাক সেই রহস্যময় ভুবনে।
ঝাল লজেন — স্মরণজিৎ চক্রবর্তীছবি: সংগৃহীত।
স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর এই বইটি কোনও উপন্যাস নয়, একেবারে নিজের হাতে ছোঁয়া এক টুকরো স্মৃতিকথা। মনে করিয়ে দেয় সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের মফস্বলের জীবন — যখন ফ্রিজ, টিভি আর অ্যান্টেনা ছিল দারুণ সব দামি জিনিস, আর পুজো, নেমন্তন্ন বাড়ি, পাড়ার জলসা মানেই ছিল বুকের ভিতর আনন্দের জোয়ার। কলকাতার সেই পরিচিত ট্রাম, ট্রেন, রেস্তোরাঁ, ঋতু বদলের গন্ধ আর কলেজ স্ট্রিটের আলো-ছায়ার রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়বে স্কুল-কলেজের দিনগুলো, লুকিয়ে দেওয়া প্রেমপত্র আর মনখারাপ করা বিকেলগুলো। অনাড়ম্বরের মধ্যেও বেঁচে থাকার সেই নিখাদ আনন্দ আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে আপনারই ফেলে আসা দিনে।
মৌষলকাল — সমরেশ মজুমদারছবি: সংগৃহীত।
সমরেশ মজুমদারের অমর সৃষ্টি অনিমেষকে নিয়ে লেখা চারটি উপন্যাসের শেষ পর্ব এই ‘মৌষলকাল’। উত্তরাধিকার, কালবেলা আর কালপুরুষের সেই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এখানে এসে হাত ধরে অনিমেষ আর মাধবীলতা, আর তাঁদের বড় হয়ে ওঠা ছেলে অর্ক। আগের বইগুলো পড়া থাকলে এর সুতো ধরতে সুবিধা হয় আর গল্পের শেকড় ছড়ায় আরও গভীরে।
ব্লু ফ্লাওয়ার ১ — অভীক দত্তছবি: সংগৃহীত।
‘স্লিপার সেল’— শব্দ দুটির সঙ্গে আমরা অনেকেই পরিচিত। দেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যা আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই গল্প শুরু হচ্ছে একদম সাধারণ একটা ছেলের হঠাৎ করে বিপদে পড়ে যাওয়ার ঘটনা থেকে। কাহিনি যত এগোতে থাকে, লেখক উন্মোচন করতে থাকেন কী ভাবে আমাদের দেশের ইন্টেলিজেন্স প্রতিনিয়ত দেশের নিরাপত্তার্থে লড়াই করে চলেছে। কাশ্মীর সমস্যা, পাকিস্তানের কাশ্মীর যোগ এবং স্লিপার সেলের সক্রিয়তা — সব মিলিয়ে এক ভয়ঙ্কর টান টান উত্তেজনা। একজন সাধারণ ছেলের জীবনে হঠাৎই এমন একটা দিন আসে, যখন সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না সে কি আদৌ বেঁচে আছে, নাকি যা ঘটছে তার সবই স্রেফ স্বপ্ন!
মজন্তালী সরকার — রোহন রায়ছবি: সংগৃহীত।
২০১৩ সালের অগস্ট মাস। একই রাতে শহরের একাধিক জায়গায় ঘটে গেল নৃশংস কয়েকটি হত্যাকাণ্ড। প্রতিটি জায়গায় পাওয়া গেল একটা করে চিরকুট — ‘ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যু’। আর সেই চিরকুটেই স্পষ্ট লেখা হত্যাকারীর নাম — মজন্তালী সরকার! পরদিন খবরের কাগজে এই একই হত্যাকারীর নামে বেরোল আশ্চর্য এক বিজ্ঞাপন। সেখানে দাবি করা হলো, আগামী বারোই সেপ্টেম্বর ফড়িয়াপুকুরের ধর্ষণ মামলার আসামীকে আলিপুর জেলের মধ্যে হত্যা করা হবে! উপেন্দ্রকিশোরের গল্পের বিখ্যাত চরিত্রের নামের আড়ালে কে এই অজ্ঞাতপরিচয় ‘এথিকাল’ খুনি? সোশাল মিডিয়ায় ক্যাটওম্যানের কায়দায় পোশাক পরা মুখোশধারী এক নারীর ছবি ভাইরাল হতেই কলকাতা ও সংলগ্ন শহরতলি জুড়ে শুরু হয়ে গেল তার উৎপাত। সিআইডির তদন্তভার, তিন তদন্তকারী অফিসার, তিন টিভি-সাংবাদিক, এক মনোবিদ আর এক নির্যাতিতাকে ঘিরে ক্রাইম, পানিশমেন্ট, প্রেম আর পলিটিক্সের এই রোলার কোস্টার রাইড আপনাকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখ সরাতে দেবে না।
ম্যাও — অভিষেক চট্টোপাধ্যায়ছবি: সংগৃহীত।
অরুণা, দিয়া, সুস্মিতা, মৃত্তিকা — এই ফোর মাস্কেটিয়ার্সের সঙ্গে দু’জন ফাউ ছিল প্রিয়াংশু আর তমাল। সময়ের চোরাপথে জীবনের জটিল সমীকরণে এরা নিজেদের এমন ভাবে হারিয়ে ফেলেছিল যার পরিণতি হলো ভয়ানক বীভৎস মৃত্যু! আর সেই যমদূতের সঙ্কেত হিসেবে ঠিক প্রতিবারই বয়ে আসত একটি বিড়ালের ডাক — ম্যাও। কিন্তু কেন? কেসটা নিজেই হাতে নিল লালবাজারের তরুণ গোয়েন্দা স্বয়ম্ভু সেন, সঙ্গে যোগ্য সহকারী শিবাঙ্গী বসু। কিন্তু ভাবুন তো, গোয়েন্দাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে তাঁরই সামনে যখন একের পর এক খুন হতে থাকে, এমনকী খুনের ভিডিয়োও পাঠিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয় খুনের কায়দা — তখন কী অবস্থা হবে? বিড়ালের ডাকের সঙ্গে এই নরহত্যার সম্পর্ক কী? এই কেসের সমাধান করতে না পারলে স্বয়ম্ভুকে বেছে নিতে হবে স্বেচ্ছাসাজা, যাবজ্জীবন অথবা ফাঁসি। স্বয়ম্ভু কী ভাবে রহস্যের ঝুলি থেকে আসল বিড়ালটাকে খুঁজে বের করবে?
হামারটিয়া — শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যছবি: সংগৃহীত।
আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে সমাধান হয়ে যাওয়া এক পুরোনো খুন। কিন্তু হঠাৎ আসা একটি চিঠি এসে আবার খুলে দেয় সেই পুরোনো কেস। বদ্ধঘরের রহস্য, মানুষের মনের জমে থাকা অপরাধবোধ আর ভুলে যাওয়া স্মৃতিগুলো একে একে কড়া নাড়তে শুরু করে। তদন্ত যত এগোয়, ততই স্পষ্ট হতে থাকে — এটা শুধু কোনও সাধারণ খুনের গল্প নয়, এটা অপরাধ ও মানুষের ভাগ্যের এক গভীর ‘হামারটিয়া’র আখ্যান।
একনজরে: বইপ্রেমীদের জন্য ৬টি বাংলা বই
বইয়ের সংখ্যা: ৬টি
ধরন: রহস্য, ক্রাইম থ্রিলার, স্পাই থ্রিলার ও স্মৃতিকথা
বিশেষ আকর্ষণ: মফস্বলের নস্ট্যালজিয়া, স্লিপার সেল, ধারাবাহিক খুন ও অপরাধবোধের মনস্তত্ত্ব
যাঁদের জন্য: রহস্য, রোমাঞ্চ ও সমকালীন বাংলা সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য
FAQ: পাঠকদের সাধারণ প্রশ্ন
১. রহস্য ও থ্রিলারপ্রেমীদের জন্য কোন বাংলা বইগুলি পড়া যেতে পারে?
‘ব্লু ফ্লাওয়ার ১’, ‘মজন্তালী সরকার’, ‘ম্যাও’ এবং ‘হামারটিয়া’ রহস্য, অপরাধ ও তদন্তকেন্দ্রিক গল্পের প্রতি আগ্রহী পাঠকদের জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে।
২. মফস্বলের নস্ট্যালজিয়া নিয়ে কোন বইটি পড়বেন?
স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর ‘ঝাল লজেন্স’ মফস্বলের জীবন, পুরোনো দিনের স্মৃতি এবং ফেলে আসা সময়ের অনুভূতি নিয়ে লেখা।
৩. ‘মৌষলকাল’ পড়ার আগে কোন বইগুলি পড়া উচিত?
সমরেশ মজুমদারের অনিমেষকে কেন্দ্র করে লেখা ধারাবাহিকের আগের তিনটি উপন্যাস—‘উত্তরাধিকার’, ‘কালবেলা’ ও ‘কালপুরুষ’ পড়ে নিলে ‘মৌষলকাল’-এর কাহিনি বুঝতে সুবিধা হবে।
৪. ‘ব্লু ফ্লাওয়ার ১’ বইটির মূল বিষয় কী?
বইটির কাহিনিতে স্লিপার সেল, জাতীয় নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা কার্যকলাপের মতো বিষয় উঠে এসেছে।
৫. ‘মজন্তালী সরকার’ বইটিতে কী ধরনের রহস্য রয়েছে?
একাধিক হত্যাকাণ্ড, হত্যাকারীর বার্তা, তদন্ত এবং অপরাধের নৈতিকতা—এই উপাদানগুলিকে ঘিরে কাহিনি এগিয়েছে।
৬. ‘ম্যাও’ নামের সঙ্গে বিড়ালের ডাকের সম্পর্ক কী?
বইটির কাহিনিতে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের আগে বিড়ালের ডাক একটি রহস্যময় সংকেত হিসেবে উঠে আসে। সেই সংকেতের সঙ্গে খুনগুলির সম্পর্ক অনুসন্ধানই গল্পের অন্যতম আকর্ষণ।
৭. ‘হামারটিয়া’ বইটির কেন্দ্রীয় বিষয় কী?
একটি পুরোনো খুনের ঘটনা নতুন করে সামনে আসা, অপরাধবোধ, স্মৃতি এবং মানুষের মানসিক দ্বন্দ্ব বইটির কাহিনির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
