ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার তারাশী উত্তরপাড়া পান্ডে বাড়ি সার্বজনীন দুর্গামন্দিরে শুরু হয়েছে দুর্গাপূজার আনন্দ উৎসব। এ বছরই প্রথমবারের মতো মন্দিরটিতে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে।
নতুন প্রতিমা, বিশাল প্রবেশদ্বার, সুসজ্জিত প্যান্ডেল আর বর্ণিল আলোকসজ্জায় সেজেছে পান্ডে বাড়ি ও এর আশপাশের এলাকা। দুর্গামন্দিরের সামনে দিনরাত ভিড় করছেন শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষ। প্রথমবারের এই আয়োজন ঘিরে পুরো এলাকায় তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের বাড়ির আঙিনার মন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজন করতে পেরে আনন্দে আপ্লুত মন্দিরের সভাপতি সত্য পান্ডে। তবে আনন্দের এই আয়োজনের পেছনে রয়েছে বাড়তি ব্যয়ের চাপও। পূজাসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক টাকা খরচ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সরকারি সহযোগিতার তালিকায় মন্দিরটির নাম না থাকায় কিছুটা হতাশাও রয়েছে আয়োজকদের মধ্যে। যদিও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান সত্য পান্ডে।
তিনি বলেন, “জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের বাড়ির আঙিনার মন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজন করতে পেরে খুব আনন্দ লাগছে। তবে পূজাসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক টাকা খরচ হচ্ছে। সরকারি সহযোগিতার তালিকা থেকে আমাদের মন্দিরটি বাদ পড়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।”
পান্ডে বাড়ির এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে গোপালগঞ্জজুড়েও ছড়িয়ে পড়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ। ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে শুরু হয়েছে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। দেবী দুর্গাকে বরণ করে নিতে শহর থেকে গ্রামের মণ্ডপগুলোতে চলছে পূজা, আরাধনা ও নানা আয়োজন। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি এবং বর্ণিল আলোকসজ্জায় মুখর হয়ে উঠেছে বিভিন্ন এলাকা।
গোপালগঞ্জ শহরের রঘুনাথপুর, বেদগ্রাম, কেন্দ্রীয় কালী বাড়ি, গোহাটা কালী মন্দির, সিকদারপাড়া ও সাহাপাড়া মণ্ডপে রয়েছে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। জেলার ঐতিহ্যবাহী উলপুর জমিদারবাড়ি, টুঙ্গিপাড়ার মণ্ডলবাড়ি, মুকসুদপুরের কালিনগর, কোটালীপাড়ার ঘাঘর ও কাশিয়ানীর রামদিয়া বাজারের পূজামণ্ডপগুলোতেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। নিজস্ব সাজসজ্জা ও নান্দনিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন আয়োজকেরা।
এ বছর গোপালগঞ্জ জেলার পাঁচ উপজেলায় মোট ১ হাজার ৩১৬টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলায় ৩৫০টি, কোটালীপাড়ায় ৩২৪টি, মুকসুদপুরে ৩০৭টি, কাশিয়ানীতে ২২৬টি এবং টুঙ্গিপাড়ায় ৯০টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। এসব পূজামণ্ডপের প্রতিটিতে সরকারিভাবে ৬০০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করে এখন পূজার আনুষ্ঠানিকতা ও দর্শনার্থীদের বরণে ব্যস্ত আয়োজকেরা। প্রতিমাশিল্পীদের তুলির আঁচড়ে পূর্ণতা পেয়েছে দেবী দুর্গা ও তার পরিবারের প্রতিমাগুলো। দেবী দুর্গার পাশাপাশি বিদ্যার দেবী সরস্বতী, ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মী, দেবসেনাপতি কার্তিক ও সিদ্ধিদাতা গণেশের প্রতিমাও সাজানো হয়েছে যত্নসহকারে।
প্রতিমা তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্পীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা ও পরিশ্রম। মাটির কাঠামো তৈরি থেকে শুরু করে খড়, মাটি, রং ও অলংকারের কাজ—প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন হয় দক্ষতা ও ধৈর্যের। উৎসবের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা প্রস্তুত করতে দিনরাত পরিশ্রম করতে হয়েছে তাদের।
প্রতিমাশিল্পী প্রহ্লাদ বিশ্বাস বলেন, প্রতিমা তৈরির প্রতিটি ধাপেই যত্ন নিতে হয়। বিশেষ করে শেষ পর্যায়ে মুখাবয়ব, রং ও অলংকারের কাজে বাড়তি মনোযোগ দিতে হয়, যাতে প্রতিমায় প্রত্যাশিত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।
প্রতিমাশিল্পী হৃদয় দাস জানান, এবার তারা চারটি মন্দিরের প্রতিমা তৈরির কাজ নিয়েছেন। এর মধ্যে দুটি মন্দিরের প্রতিমায় রং করার কাজ শেষ করেছেন। গোপালগঞ্জের সাহাপাড়া মন্দিরে প্রতিমায় রং করার কাজ শেষ করে অন্য মন্দিরের প্রতিমায় রং দিতে তাকে সাতক্ষীরায় যেতে হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব কাজ শেষ করতে দিনরাত পরিশ্রম করতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
আরেক প্রতিমাশিল্পী সুজন পাল বলেন, প্রতিমা তৈরির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রম করতে হয়। পূজার সময় যত ঘনিয়ে আসে, রং ও সাজসজ্জার কাজে ব্যস্ততা তত বাড়ে। পূজামণ্ডপে দর্শনার্থীরা যখন প্রতিমার সৌন্দর্য উপভোগ করেন, তখনই তাদের পরিশ্রম সার্থক হয়।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের গোপালগঞ্জ জেলা শাখার সহসভাপতি বিমল বিশ্বাস বলেন, দুর্গোৎসব শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যেরও প্রতীক। সবার সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপনের প্রত্যাশা তাদের।
এদিকে দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তৎপর রয়েছে গোপালগঞ্জ জেলা পুলিশ ও প্রশাসন। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা, দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্ন চলাচল এবং সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি। গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধি ও টহল জোরদারের উদ্যোগও রয়েছে।
গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ জানান, দুর্গাপূজা ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। প্রতিটি পূজামণ্ডপে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করবেন। উৎসবের সময় দর্শনার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করতে পারেন, সে বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে।
