সাধারণ কোনও আড্ডায় হঠৎ কেউ হয়ত বলে বসলেন, ‘আরে, তুমি এখনও সিঙ্গেল?’ বা কর্মক্ষেত্রে কেউ কাজের সাধারণ একটু সমালোচনা করলেন। ব্যস! মুহূর্তের মধ্যে আপনার মাথা গরম হয়ে গেল, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে আপনি একের পর এক যুক্তি সাজাতে শুরু করলেন।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই যে নিজেকে বাঁচানোর জন্য মারমুখী হয়ে ওঠা বা অতিরিক্ত আত্মপক্ষ সমর্থন করা, এটি আসলে কোনও চরিত্রের খামতি বা জেদ নয়; এটি মস্তিষ্কের একটি সহজাত ক্রিয়া বা ‘রিফ্লেক্স’।
যখনই মনে হয় কেউ ভুল বুঝছেন বা সমালোচনা করছেন, তখনই মস্তিষ্ক সেটিকে একটি ‘হুমকি’ হিসেবে ধরে নেয়। আর তখনই শুরু হয় যুক্তি আর পাল্টা যুক্তির লড়াই।
তবে এই প্রক্রিয়ায় সামনের মানুষের কথা শোনা বা বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা হয়।
শরীর যখন সঙ্কেত দেয়, থমকে দাঁড়ান
জীবনযাপন-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘সেলফ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে, মিয়ামি-ভিত্তিক মনোরোগ-বিশেষজ্ঞ এবং ‘পারসিভিয়ারেন্স: হাউ ইয়ং পিপল টার্ন ফিয়ার ইনটু হোপ’ বইয়ের লেখক ডা. ক্যারোলিন রুবেনস্টাইন বলেন, “আত্মপক্ষ সমর্থনের এই লড়াইটা কিন্তু মুখ দিয়ে শুরু হয় না, শুরু হয় শরীর থেকে।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “যখনই কেউ সমালোচনা করে, তখনই আপনার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়। আপনার স্নায়ুতন্ত্র যে একটি 'হুমকি'র মুখোমুখি হয়েছে, এগুলো তারই প্রাথমিক শারীরিক লক্ষণ।”
“তাই তর্কে জড়ানোর প্রথম প্রতিরোধটি হতে হবে শারীরিক। যখনই এমন বুঝবেন, নিজের চোয়াল শিথিল করুন, কাঁধ জোড়া ছেড়ে দিন, আড়াআড়ি করে রাখা হাত সোজা করুন এবং একটি দীর্ঘ, গভীর শ্বাস নিন। এই ছোট শারীরিক পরিবর্তনটি মস্তিষ্কের স্বয়ংক্রিয় 'আক্রমণাত্মক' মেজাজটিকে ভেঙে দেবে এবং শান্তভাবে চিন্তা করার সুযোগ করে দেবে”, পরামর্শ দেন এই মনোবিদ।
পাল্টা জবাব দেওয়ার আগে কৌতূহলী হওয়া
সাধারণত কেউ সমালোচনা করলে তার বলার ধরন, কণ্ঠস্বর বা সময় নিয়ে বেশি মাথা ঘামানো হয় না, মূল কথাটা এড়িয়ে যাওয়া হয়।
ক্যালিফোর্নিয়া ও ওয়াশিংটনের উদ্বেগ ও মানসিক আঘাত-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং সাইকোথেরাপিস্ট মায়া নেহেরু বলেন, “এই সংকীর্ণ চিন্তা থেকে বের হওয়ার উপায় হল কৌতূহল।”
সামনের মানুষটির কথা যতই অযৌক্তিক মনে হোক না কেন, নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, ‘এখানে কি অন্তত ৫ শতাংশ হলেও কাজের কোনও কথা আছে?’
ডা. নেহেরু বলেন, “হয়ত বন্ধুটি খুব বাজেভাবে কথাটি বলেছে, কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে আপনার একটি ভুল সম্পর্ক নিয়ে সে হয়ত সঠিক সতর্কবার্তাই দিচ্ছিল। সমালোচনার ভেতরের এই সত্যটুকু মেনে নেওয়ার মানে কিন্তু অপর পক্ষের সব খারাপ আচরণকে মেনে নেওয়া নয়। এটি আপনার মস্তিষ্ককে ‘সব-অথবা-কিছুই-না’ ধরনের চরম চিন্তা থেকে মুক্ত রাখতে সাহায্য করে।
যা শুনলেন, তা পুনরায় নিশ্চিত করুন
অধিকাংশ সময় আসল কথার ওপর প্রতিক্রিয়া দেখানো হয় না, বরং সেই কথা দিয়ে আমরা মনে মনে যা ধরে নিই, তার ওপর ভিত্তি করে রেগে যাই।
যেমন— সঙ্গী হয়তো বলেছেন, ‘আজকের থালাবাসনগুলো ধোয়া হয়নি।’ আপনি মনে মনে ধরে নিলেন, ‘তার মানে ও বলতে চায় আমি সংসারের কোনও কাজই করি না!’
এই ধরনের ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে ডা. মায়া নেহেরু একটি সহজ কৌশলের পরামর্শ দিয়েছেন, “আপনি যা শুনেছেন তা অপরপক্ষকে আবার মুখে বলে নিশ্চিত করুন। যেমন- আপনি বলতে পারেন, ‘যদি আমি ভুল না বুঝে থাকি, তবে তুমি কি বলতে চাচ্ছ যে এই সপ্তাহে আমার যোগাযোগের ঘাটতি ছিল?’ বা ‘তুমি কি চাচ্ছ সামনের দিনগুলোতে আমি কাপড় ধোয়ার কাজে একটু বেশি সাহায্য করি?’- এতে করে কাল্পনিক কোনও তর্ক নিয়ে নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করার ক্লান্তি থেকে আপনি বেঁচে যাবেন।”
ব্যক্তিগত আক্রমণ ও ক্ষোভকে আলাদা করে দেখুন
ডা. রুবেনস্টাইন একটি বিষয় মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, “অধিকাংশ মানুষ যখন কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়, তখন তারা ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার জন্য করে না, যদিও আপনার মনে হতে পারে যে তারা আক্রমণ করছে।”
আসলে অনেক সময় তারা খুব আনাড়িভাবে বা গুছিয়ে বলতে না পেরে নিজেদের কোনও ক্ষোভ, প্রয়োজন বা সীমানার কথা প্রকাশ করতে চায়।
তাই ডা. নেহেরুর পরামর্শ হল, “তারা আমাকে আক্রমণ করছে’— এই চিন্তার বদলে ভাবুন ‘তারা নিজেদের কোনও অনুভূতি প্রকাশ করার চেষ্টা করছে।’ বন্ধুটি হয়ত আপনাকে খারাপ প্রমাণ করতে চাইছে না, সে কেবল আপনাদের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বটা বজায় রাখতে চাইছে বলেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।”
কোন বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করবেন, তা বেছে নিন
সব কথার পিঠে যুক্তি দেওয়া বা নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করাটা এক ধরনের শক্তি ও সময়ের অপচয়।
কিছু মানুষ হাজারও ব্যাখ্যার পরেও আপনাকে ভুলই বুঝবে। তাই ডা. রুবেনস্টাইন একটি সহজ ‘চেকলিস্ট’ অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
লক্ষ্য স্থির করুন: আপনি কি সত্যি কোনো সমস্যার সমাধান চান, নাকি শুধুই নিজেকে 'সঠিক' প্রমাণ করতে চান?
দীর্ঘমেয়াদী গুরুত্ব ভাবুন: এই বিষয়ে তর্ক করলে কি আপনার চাকরি বা প্রিয় সম্পর্কটির ওপর কোনও বড় প্রভাব পড়বে?
অপরপক্ষ শুনতে প্রস্তুত কি না যাচাই করুন: যে মানুষটি মনে মনে আপনাকে ভুল প্রমাণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে, তার সামনে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করা বৃথা।
সব জায়গায় নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার লড়াইয়ে না নেমে, মাঝে মাঝে চুপ থাকা এবং অপ্রয়োজনীয় তর্কে সায় না দেওয়াটাই হতে পারে মানসিক শান্তির বড় হাতিয়ার।
