জুলাই বিপ্লবের উত্তাল সময়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ছাত্র-জনতার কর্মসূচিতে অংশ নেন মোহাম্মদ ইসমাইল। এক পর্যায়ে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন তিনি। ঢাকা মেডিকেলে খুঁজতে গিয়ে মা জানতে পারেন, ছেলে বেঁচে নেই—তার লাশ মর্গে রাখা হয়েছে। পরে মর্গে রাখা ৩ থেকে ৪০০ লাশের ভেতর থেকে পোশাক দেখে ছেলেকে শনাক্ত করেন তিনি।
সোমবার (১২ অক্টোবর )আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ শহীদ ইসমাইলের মা তাসলিমা আক্তারের জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে আসে। জুলাই বিপ্লবে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস এবং সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে দশম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আমি শহীদ মোহাম্মদ ইসমাইলের মা। আমার ছেলে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজ শেষে দুপুরের খাবার খেয়ে আনুমানিক ৩টার সময় বাসা থেকে বের হয়ে আন্দোলনে যোগ দেয়। ছেলের বন্ধু মনির ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আমাকে জানায়, ইসমাইলকে আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে দেখেছে এবং সে তাকে বাসায় চলে আসতে বলে। ছেলে বাসায় ফিরে না এসে আন্দোলনে থেকে যায়। আমি আমার ছেলেকে ফোন করতে পারিনি, কারণ আমার ফোনে টাকা ছিল না।
পরে আমার বোন আকলিমা ছেলেকে ফোন দেয়, কিন্তু সে ফোন ধরে না। কয়েকবার ফোন দেওয়ার পর তার বন্ধু কালু ফোন ধরে বলে, ইসমাইল আপনার কে হয়। আমার বোন বলে, আমি তার খালা। তখন কালু বলে, ইসমাইল গুলি খাইছে। তাকে আমরা ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।
তখন ঢাকা উদ্যান থেকে রিকশা নিয়ে আমি, আমার মা এবং আমার বোনসহ ঢাকা মেডিকেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। কিছু দূর যাওয়ার পর রাস্তায় আগুন জ্বলতে দেখি। তখন সেখানে কমিশনার আসিফ, কমিশনার রাজিব, জাহাঙ্গীর কবির নানক, ফজলে নূর তাপস ও বিপ্লব কুমার জোয়ার্দার অস্ত্রসহ ছিল। আমার সামনে একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
তাসলিমা আক্তার বলেন, আমরা রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে পৌঁছাই। আমরা প্রথমে জরুরি বিভাগে যাই, সেখানে গুলিবিদ্ধ বহু লোককে জীবিত ও মৃত অবস্থায় দেখতে পাই। আমরা তলায় তলায় আমার ছেলেকে খুঁজতে থাকি। তারপর একজন ডাক্তারকে আমার ছেলেকে খুঁজে দিতে বললে, তিনি আমাকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। আমি দেখি, সেখানে আমার ছেলে নেই।
কিছুক্ষণ পর তিনি মোবাইলে কিছু ছবি দেখান। ছবি দেখে আমি ছেলেকে শনাক্ত করি। ছেলে কোথায় আছে জিজ্ঞাসা করলে তিনি আমাকে মর্গে নিয়ে যান। মর্গে গিয়ে দেখি, ৩০০ থেকে ৪০০ লাশ একটার ওপর একটা পড়ে আছে। ছেলের পরনের পোশাক দেখে আমি চিনতে পারি। দেখি, তার মাথায় গুলি লেগেছে।
আমি ছেলের লাশ চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলে, লাশ দেওয়া যাবে না। যার যার থানার ওসি এলে তারপর লাশ দেবে। পরদিন সকাল ১১টার দিকে মোহাম্মদপুর থানা থেকে সাইফুল দারোগা হাসপাতালে আসেন। এরপর সন্ধ্যা ৭টার দিকে লাশ পেয়ে বাসায় নিয়ে আসি। হাসপাতাল থেকে মামলা করব না, এই শর্তে আমার স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
আমার ছেলেকে হত্যার জন্য শেখ হাসিনা, তাপস, নানক, কমিশনার আসিফ, কমিশনার রাজিব, রাসেল, মোল্লা রুবেল, বিপ্লব কুমারসহ অনেকে দায়ী। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই। এ সময় সাক্ষী কান্নায় ভেঙে পড়েন।
খুলনা গেজেট/উউরা
