জার্মানির বোখুম শহরে একটি আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডে নিহত তিন ভারতীয় নাগরিকই ভারতের কেরালা রাজ্যের বাসিন্দা। তাদের পরিচয় শনাক্ত করেছে তদন্তকারীরা। এ ঘটনায় একই ভবনে বসবাসকারী ৪১ বছর বয়সী এক রোমানীয় নাগরিককে হত্যার সন্দেহে গ্রেফতার করেছে জার্মান পুলিশ। নিহতরা হলেন- ইদুক্কি জেলার কাট্টাপ্পানার বাসিন্দা নোভা সাবু (২৫), কোল্লাম জেলার অঞ্জলি শীলা জয় (২৫) এবং এর্নাকুলাম জেলার কালাডির বাসিন্দা শিভিন জনি (২৬)।
জার্মান সংবাদমাধ্যম এন-টিভি জার্মান সংবাদ সংস্থা ডিপিএর বরাতে জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বোখুম পুলিশের এক মুখপাত্র স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ডব্লিউডিআরকে বলেন, হত্যার অভিযোগে সন্দেহ করার প্রাথমিক ভিত্তি পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে পুলিশের হত্যাকাণ্ড তদন্ত ইউনিটের কর্মকর্তারা ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।
স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ১৫ মিনিটের দিকে বোখুমের হফস্টেড এলাকায় পোস্টস্ট্রাসে সড়কের একটি বহুতল আবাসিক ভবনে আগুন লাগে। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভবনটির দ্বিতীয় তলার একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কেরালার এক শিক্ষার্থীও রয়েছেন, যার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
তদন্তকারীরা আগুন লাগার কারণ হিসেবে বৈদ্যুতিক বা অন্য কোনো কারিগরি ত্রুটির সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তাদের ধারণা, ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানো হয়ে থাকতে পারে। পুলিশের সন্দেহ, ভবনটির নিচতলায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে আগুন কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সিঁড়িটি ছিল ভবন থেকে বের হওয়ার প্রধান পথ। এ সময় ঘন ধোঁয়ায় করিডরগুলো ভরে যায়।
প্রতিবেশীরা পুলিশকে জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের আগের দিন ভবনের বাসিন্দাদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল।
নোভা সাবু ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক কে পি সাবু ও চেম্বাকাপ্পারা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জনস্বাস্থ্য নার্স পি এন জ্যোতির মেয়ে। গত ৩ জুলাই তিনি জার্মানিতে যান। সেখানে খণ্ডকালীন জিম প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি।
শিভিন জনি উচ্চশিক্ষার জন্য মাত্র দুই সপ্তাহ আগে জার্মানিতে পৌঁছেছিলেন। তার ভাই সালভিন জার্মানিতে থাকেন এবং বোন সিমি আয়ারল্যান্ডে বসবাস করেন। অঞ্জলি শীলা জয়ের বিএড ডিগ্রি ছিল। চাকরির উদ্দেশ্যে গত জুলাইয়ে জার্মানিতে যান তিনি। সেখানে একটি গুদামে কাজ করতেন।
পরিবারের আত্মীয় ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি প্রসন্ন প্রয়াস জানান, জয় সব সময় কেরালায় সরকারি চাকরি করার স্বপ্ন দেখতেন। তিনি বলেন, ‘জয় একাধিকবার সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। কিন্তু সফল না হওয়ায় বিদেশে চলে যায়। সে বলত, নিজের এলাকায় কাজ করতে ও বসবাস করতে চায়। সরকারি চাকরি ছিল তার স্বপ্ন।’
জয়ের চাচা জনসন জানান, মঙ্গলবার রাতে পরিবারের সদস্যরা তার নিয়মিত ফোনকল না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তারা ফোন করলেও জয় সাড়া দেননি, যদিও ফোনে রিং হচ্ছিল। পরে দুবাইয়ে থাকা এক বন্ধু তাদের অগ্নিকাণ্ডের খবর জানান। সকালে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নিহতদের তালিকায় জয়ের নাম দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা।
জনসন বলেন, ‘জার্মানি থেকে আমরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য পাইনি।’ পরে জার্মানিতে থাকা পরিবারের এক আত্মীয় ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে কথা বলে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। অস্ট্রিয়া থেকেও পরিবারের আরেক সদস্য সেখানে যান।
নিহত তিন ভারতীয়ের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে জার্মানিতে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত অজিত গুপ্তের সহায়তা চেয়েছেন কোল্লামের সংসদ সদস্য এন কে প্রেমচন্দ্রন। কেরালার পর্যটনমন্ত্রী পি সি বিষ্ণুনাথ জানিয়েছেন, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে প্রবাসী কেরালাবাসীদের কল্যাণবিষয়ক বিভাগ এবং ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে রাজ্য সরকার।
জার্মানিতে বসবাসরত মালয়ালি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠনও পরিবারগুলোকে সহায়তা করছে। জয়ের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার খরচ বহনের প্রস্তাব দিয়েছে এসব সংগঠন।
সূত্র: এনডিটিভি
