আজকাল ওয়েবডেস্ক: অরুণাচল প্রদেশে চীনা বাহিনীর সঙ্গে সাম্প্রতিক মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) ডিজি শত্রুজিৎ সিং কাপুরের মন্তব্যের বিষয়ে শুক্রবার প্রতিক্রিয়া দিল বিদেশ মন্ত্রক। জানানো হয়েছে যে, এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্যের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। একই সঙ্গে বিদেশ মন্ত্রক জোর দিয়ে বলেছে যে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য ভারত-চীন সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অপরিহার্য।
লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) বা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর পরিস্থিতি নিয়ে শত্রুজিৎ সিং কাপুরের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে বিদেশ মন্ত্রক জানায়, "এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের জন্য আমি আপনাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেব।"
সীমান্তবর্তী পরিস্থিতির বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে মন্ত্রক জানিয়েছে, যখনই চীনা বাহিনী তাদের নির্ধারিত টহল পদ্ধতি থেকে বিচ্যুত হয়, তখনই ভারত-চীন সীমান্ত এলাকায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটে বা অস্থিরতা তৈরি হয়। বিদেশ মন্ত্রকের আরও দাবি, "আমরা আগেও যেমনটি উল্লেখ করেছি, ভারত-চীন সীমান্ত এলাকায় যখনই চীনা বাহিনী তাদের প্রচলিত টহল পদ্ধতি থেকে সরে আসে, তখনই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।" এতে আরও বলা হয়েছে যে, সীমান্ত এলাকায় অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান করতে এবং ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে উভয় পক্ষই বিদ্যমান কূটনৈতিক ও সামরিক পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে চলেছে।
মন্ত্রক জানিয়েছে, "উভয় পক্ষই অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান করতে এবং প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর ভুল বোঝাবুঝি ও ভুল হিসাব-নিকাশ এড়াতে বিদ্যমান কূটনৈতিক ও সামরিক পদ্ধতিগুলো ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে।"
বিদেশ মন্ত্রক আরও জানিয়েছে যে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদার করার জন্য ভারত ও চীন নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) সম্পর্কে নিজেদের বোঝাপড়া উন্নত করার উপায় নিয়ে আলোচনা করতে সম্মত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, "উভয় পক্ষই সীমান্ত ব্যবস্থাপনার উন্নতির জন্য উপযুক্ত এলাকাগুলোতে এলএসি সম্পর্কে বোঝাপড়া আরও ভাল করার উপায় নিয়ে আলোচনা করতে সম্মত হয়েছে।"
সীমান্ত এলাকায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রক বলেছে, "আরও জোর দিয়ে বলতে হচ্ছে যে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অপরিহার্য।"
আইটিবিপি প্রধানের দাবি: একাধিক স্থানে মুখোমুখি অবস্থান
বিদেশ মন্ত্রকের এই প্রতিক্রিয়াটি এমন সময়ে এল, যখন আইটিবিপি-র ডিজি শত্রুজিৎ সিং কাপুর বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন যে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অরুণাচল প্রদেশ সীমান্তে চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)-এর সৈন্যদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি স্থানে মুখোমুখি সংঘাতের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং এই পরিস্থিতি এখনও অব্যাহত রয়েছে।
রাজস্থানের আলওয়ারে আইটিবিপি-এর একটি ঘাঁটিতে কর্মীদের উদ্দেশে কাপুর বলেন, “গত কয়েক দিনে অরুণাচল প্রদেশের বেশ কয়েকটি স্থানে মুখোমুখি অবস্থানের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং তা এখনও অব্যাহত রয়েছে।” কাপুর আরও জানান যে, চলমান এই মুখোমুখি পরিস্থিতির মধ্যেই আইটিবিপি-র নবগঠিত ‘শৌর্য কমান্ডো’ তাদের ক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিটি সীমান্ত ব্যাটালিয়নে এই কমান্ডোদের মোতায়েন করা হবে, যা বাহিনীর কার্যক্ষমতাকে আরও জোরদার করবে।
সংবাদ সংস্থা আইএএনএস-এর সূত্র অনুযায়ী, আইটিবিপি প্রধানের এই মন্তব্যটি ছিল সীমান্ত বরাবর নিয়মিত অপারেশনাল প্রস্তুতি ও বাহিনী মোতায়েনের প্রেক্ষাপটে, এটি কোনও নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, এই বাহিনী সরকারি নীতি, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রদত্ত নির্দেশনা এবং সুপ্রতিষ্ঠিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) মেনে কাজ করে। ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইটিবিপি ভারত ও চীনের মধ্যকার ৩,৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এলএসি বা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা পাহারা দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত।
আইটিবিপি-র আধুনিকায়ন ও প্রস্তুতি
এদিকে, সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে কাপুর জানিয়েছেন যে, পরিবর্তিত যুদ্ধ পরিস্থিতির মোকাবিলায় আইটিবিপি নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সীমান্ত ইউনিটগুলোতে ড্রোন প্লাটুন গঠন করা হচ্ছে, ‘স্ট্রাইক’ নামে একটি নতুন প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা হচ্ছে এবং সম্মুখবর্তী অবস্থানগুলোতে ভূগর্ভস্থ পরিকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে।
কাপুর জানান, বাহিনীটি ড্রোন ও অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করছে, অস্ত্র ও যানবাহনকে আধুনিকায়ন করছে এবং চরম প্রতিকূল আবহাওয়ায় মোতায়েন করা কর্মীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা উন্নত করছে। তিনি আরও বলেন, ২০২০ সালের জুন মাসে গালওয়ান উপত্যকায় যে সংঘাত হয়েছিল (যাতে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন) ঠিক তেমন পরিস্থিতির মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ‘স্ট্রাইক’ নামে একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্স তৈরি করা হয়েছে।
আইটিবিপি প্রধান জানান, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ পুরো বাহিনীকে এই নতুন প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। তিনি ‘শৌর্য কমান্ডো’ গঠনের বিষয়টিও তুলে ধরেন এবং জানান যে, তাদের বিভিন্ন সীমান্ত ব্যাটালিয়নে মোতায়েন করা হবে।
ভারত-চীন সম্পর্ক ও সীমান্ত স্থিতিশীলতা
এলএসি বরাবর দীর্ঘ কয়েক বছরের সামরিক উত্তেজনার পর ভারত ও চীন যখন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই এই মন্তব্যগুলো এল।
আইএএনএস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল এন এস রাজা সুব্রামানি গত মাসে বলেছিলেন যে, সীমান্ত পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে এবং উদ্বেগের কোনও কারণ নেই।
বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শঙ্করও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
পূর্ব লাদাখে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা সামরিক অচলাবস্থা (যা দুই দেশের সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল) তা নিরসনের লক্ষ্যে ভারত ও চীন ২০২৪ সালের অক্টোবরে একটি সমঝোতায় পৌঁছায়।
