পুজোতেও একই সুতোয় গাঁথা পড়ে গিয়েছে বারুইপুরের সেই তিন পরিবার। গ্রাফিক: রাতুল মণ্ডল
Published on
:
5 min read
দৃশ্য এক: বাড়ির বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা সিসি ক্যামেরার সামনে
পাকা রাস্তাটা ধরে কিছু হাঁটলেই বাড়িটা। রাস্তাটাও পাকা অর্থাৎ ঢালাই হয়েছে সদ্য। দেখলেই তা বোঝা যায়। আগে জল-কাদায় মাখামাখি হয়ে থাকত। হাঁটাচলা করাই দায় হতো। এখন দিব্যি হেঁটে যাওয়া যায়। তবে বাড়ির মুখটায় এসে থমকাতে হয় — কারণ পুলিশ প্রহরা। অচেনা কাউকে নির্দ্বিধায় ঢুকতে না দেওয়ার নিষেধাজ্ঞা। যদিও নামধাম-পরিচয় জানিয়ে যা-ও বা এগোনো গেল, কিন্তু ঘরে প্রবেশের অনুমতি নেই। বাড়ির কারও সঙ্গে কথা বলতে গেলে তা উঠোনে দাঁড়িয়েই বলতে হবে। তা-ও সিসি ক্যামেরার চোখের সামনে। গত তিন মাস ধরে এমনই নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রয়েছেন এই বাড়ির বাসিন্দারা। তাঁরাও নিজেদের চারপাশে এক রকম প্রাচীর তুলে রেখেছেন। যে প্রাচীর তাঁদের আলাদা করে রেখেছে বাইরের দুনিয়া থেকে। পাড়ার পুজোর আগমনীর গানও এই বাড়ির উঠোনে বড় ফিকে। বড্ড ক্লান্ত। দু’দিন বাদে এ বাড়ির বিষণ্ণতা স্তোত্রের সমস্ত গমকও গিলে নেবে!
দৃশ্য দুই: ঘরের ধুলো সাফ করবে কে
ভাঙাচোরা বাড়িটা কিছু দিন আগেই মেরামত করা হয়েছে। তবে শুধু বাইরেটা। দেওয়ালের যে হাড়-পাঁজর বেরিয়ে এসেছিল, শুধু সে টুকুই ঢেকে দিয়ে রং করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভিতরটা একই রয়ে গিয়েছে। যতটা ঘর, প্রায় ততটা জুড়েই খাট। খাটের একপাশে একটা বহু পুরোনো কাচভাঙা শোকেস। জায়গায় জায়গায় জং ধরে গিয়েছে। লেপ্টে রয়েছে ধুলো। কে-ই বা সাফ করবে! এই ঘরের দুই বাসিন্দার সেই ক্ষমতাটুকুও আর নেই। শীর্ণকায় চেহারার এক বৃদ্ধ খাটে শুয়ে। অসুস্থ। দেখেই মনে হয়, নড়াচড়ার শক্তি নেই। পাশে বসা তাঁর স্ত্রী। তিনিও অশক্ত। কিন্তু তার মধ্যেও ঘরের কাজকর্ম সারতে হয়। স্বামীরও দেখাশোনা করতে হয়। আশ্বিনের শারদপ্রাতে কোনও কিছুই আর স্বাভাবিক ছন্দে নেই এ ঘরে। এ ঘরে তাই পুজোর গন্ধ নেই। শব্দ নেই। আনন্দ নেই। দরজা ঠেলে ঢুকলেই মনে যেন, একটা গুমোট, ভ্যাপসা ভাব বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে প্রাণপণে!
দৃশ্য তিন: ‘দশমী কবে গো বাবা!’
এ বাড়ির গল্পের মূল উপজীব্যও সেই অভাব আর একাকিত্বই। এক কামরার ঘর। সর্বত্রই অযত্নের ছাপ। অগোছাল। অবিন্যস্ত। সেই ঘরের দাওয়ায় বসে এক বৃদ্ধা আনমনে বাইরের দিকে চেয়ে রয়েছেন। হয়তো কারও অপেক্ষায় রয়েছেন। হয়তো কারও আসার কথা। সত্যিই কি কেউ আসবেন? ‘না’-টাও ঠিক করে বলতে পারলেন না বৃদ্ধা। শুধু অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘কে আর আসবে! এ বাড়িতে তো কেউই আসে না এখন আর।’ তা বলে কি পুজোও আসবে না? উ়ৎসবের সামান্য ছোঁয়াও পাবে না বাড়িটা? স্মিত হাসি দিয়ে বৃদ্ধা পাল্টা প্রশ্ন ছুড়েছিলেন, ‘দশমী কবে গো বাবা!’ এ বাড়ির একেবারে কাছেপিঠে কোনও পুজো নেই। তাতে ঢাকের শব্দও যে পৌঁছয় না এ বাড়িতে, তাতেই বাঁচোয়া। কিন্তু চারদিকে আবহ তো আছে। সেটাও সহ্য হচ্ছে না। স্বগতোক্তির সুরেই বৃদ্ধা বললেন, ‘শেষ হলে বাঁচি!’
তিন পরিবার। তিন ঘটনা। তবে সব ক’টি একে-অন্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এক সুতোয় গাঁথা হয়ে গিয়েছে। যে সুতোর নাম সন্তানশোক। প্রথম দৃশ্যে রয়েছে বারুইপুরের সেই নির্যাতিতার পরিবার। সেই ১২ বছরের কিশোরীর, যাকে ধর্ষণের পরে খুন করা হয়েছে। দ্বিতীয় দৃশ্যে রয়েছে সেই ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের পরিবার। কিশোরীকে ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে যে যুবককে উন্মত্ত জনতা পিটিয়ে খুন করেছে বলে অভিযোগ। আর তৃতীয় দৃশ্য সেই প্রভাস মণ্ডলের পরিবারের। যে কিশোরীকে ধর্ষণ-খুনে মূল অভিযুক্ত। পুলিশি এনকাউন্টারে যে নিহত।
গত ৪ জুলাই, রবিবার। বিকেলে খাবার কিনতে বেরিয়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল সেই কিশোরী। তার পরে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার হদিশ মেলেনি। শেষে পরের দিন সকালে বাড়ির অদূরে একটি পুকুর থেকে কিশোরীর দেহ উদ্ধার হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেই সময়ে তোলপাড় হয়েছিল গোটা রাজ্য। কিশোরীকে ধর্ষণ-খুন করা হয়েছে অভিযোগ তুলে বিচারের দাবি পথে নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছিল স্থানীয় বাসিন্দাদের একটা বড় অংশ। ক্ষোভ উগরে দেন পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলেও। অভিযোগ, সেই বিক্ষোভের সময়েই একদল যুবক ইন্দ্রজিৎকে বাড়ি থেকে টেনে বার করে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলে। পরে অবশ্য পুলিশি তদন্তে উঠে আসে, ইন্দ্রজিৎ নির্দোষ। গোটা ঘটনায় তাঁর কোনও যোগ নেই। সেই সঙ্গে কিশোরীর ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় প্রভাস-সহ আরও দু’জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারির পরে প্রভাসকে রাতের অন্ধকারে মূল অকুস্থলে পুলিশ নিয়ে গিয়েছিল ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য। অভিযোগ, সেই সময়ে এক পুলিশ অফিসারের সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে প্রভাস। ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ আধিকারিকদের নিশানা করে গুলিও ছোড়ে। এর পরেই পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায়। তাতেই নিহত হয় প্রভাস। গত সেপ্টেম্বর নাবালিকাকে ধর্ষণ-খুন কাণ্ডে আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে পুলিশ। শীঘ্রই বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা।
আইন আইনের পথে চলবে। সময় সময়ের নিয়মে। দিন, সপ্তাহ, মাস পেরিয়ে গিয়েছে। পাড়া-প্রতিবেশী, শহর-শহরতলি, গোটা রাজ্য এখন মজেছে পুজোর রোশনাইয়ে। উৎসবের ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে অপ্রাপ্তি আর দুঃখের রোজনামচাকে। কিশোরীও হারিয়ে গিয়েছে কালের নিয়মে। এখন আর কারও সঙ্গে কথা বলতেও ভালো লাগে না তার মা-বাবার। করজোড়ে বহু মানুষকে বাড়ির দরজা থেকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। কেউ সহানুভূতি দেখাতে এলেও আপত্তি করছেন। সরকারি তরফে আর্থিক সাহায্য এবং চাকরির ব্যবস্থা হওয়ায় পরিবারে কিছুটা আর্থিক স্বচ্ছলতা এসেছে ঠিকই। কিন্তু স্বাভাবিক জীবনে ফেরা যায়নি। হয়তো যাবেও না কোনও দিন। তবে যদিও বা যায়, সেই ‘স্বাভাবিক’ জীবনে কতটা স্বাভাবিকতা থাকবে? অহরহ নিজেকে সেই প্রশ্নই করেন নির্যাতিতার মা। বাবা বলছিলেন, ‘পুজোর সময়ে রাস্তায় আলো লাগাতে দেখলেই মেয়ে ছুটে যেত। ভিড় দেখলেই দৌড়ে যেত। পাড়ায় ঘুরত। টুকটাক খাবার কিনে খেত। এটাই ওর আনন্দ ছিল। ও নেই, আমাদের আর উৎসব থাকে কী করে!’
জীবন থেকে ‘উৎসব’ চিরতরে মুছে ফেলেছেন ইন্দ্রজিতের মা-ও। একমাত্র সন্তানের অকালমৃত্যু তাঁর মন থেকে ঈশ্বরের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস মুছে দিয়েছে চিরতরে। স্থির করেছেন, এ বার আর ঠাকুরের মুখই দেখবেন না! এককালে পুজো এলে ছেলে-স্বামীর জন্য কিছু কিনতেন ইন্দ্রজিতের মা। পরে ছেলেও মাকে পুজোয় শাড়ি দিতেন। অটো চালিয়ে যতটুকু রোজগার হতো, সবটাই মায়ের হাতে তুলে দিতেন। দারিদ্যের মধ্যেই আনন্দ ছিল। বিজয়া দশমীতে পাড়ার মণ্ডপে যেতেন। সিঁদুর খেলতেন। বাড়ির সামনে দিয়ে যখন ভাসান যেত, দৌড়ে বেরিয়ে আসতেন। শেষবারের মতো দুর্গার মুখখানা দেখে নিতেন। কিন্তু এ বার আর সেই ইচ্ছেটুকুও নেই। ইন্দ্রজিতের মৃত্যুর পরে সরকারের তরফে তাঁর দাদার চাকরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সামান্য হলেও অভাব ঘুচেছে। কিন্তু আনন্দের উৎসটাই তো আর নেই! আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে ইন্দ্রজিতের মা বলছিলেন, ‘যার সন্তান চলে গিয়েছে, তার আর কী আছে!’
পুজোর চ়ড়া আলোর মধ্যেও ঝুপুস অন্ধকার প্রভাসের ঘরেও। অবশ্য অভাবের তাড়নায় এ ঘরে সেই অর্থে কোনও দিনই আনন্দ আয়োজন ছিল না। তবে উৎসব-বিমুখও ছিলেন না কেউই। স্ত্রী-ছেলেকে নিয়ে পুজোয় দু’-এক দিন বেরোতেন প্রভাস। বারুইপুরের কয়েকটা ঠাকুর দেখে, রাস্তায় ডিমটোস্ট খেয়ে ফিরতেন। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মা বলছিলেন, ‘টাকার জন্য পুজোর সময়েও প্রভাস কাজ করত। এ দিক-সে দিক রাঁধুনির কাজ করত। সেই টাকা দিয়েই ছেলের জন্য নতুন জামা কিনত। আমাকেও কিছু টাকা দিত হাতে।’ বৃদ্ধার আরও দুই ছেলে রয়েছেন। তাঁদের কাছেই খেয়েপরে দিন কাটে। তবে ইন্দ্রজিতের মায়ের মতো তিনি ঈশ্বরে আস্থা হারাননি। সেই বিশ্বাস এখনও অটুট রয়েছে। দিনের অধিকাংশ সময় ঠাকুরপুজো করেই কাটে তাঁর। ঈশ্বরকে করজোড়ে প্রমাণ করতে করতে বৃদ্ধা বলছিলেন, ‘ওরা বলেছে, আমার ছেলে নাকি ধর্ষণ-খুন করেছে! তারই নাকি সাজা পেয়েছে। এ সব শোনার পরে কোন মা আর ঠিক থাকতে পারে! তখন তো পাড়া-প্রতিবেশীরা কেউ কথা বলত না। এখন তবুও একটু বলে।’
এই পুজোয় এ টুকুই বড় প্রাপ্তি প্রভাসের মায়ের কাছে। কিন্তু তার বাইরে আর কিছু ভালো লাগছে না তাঁর। এত জাঁক সহ্য হচ্ছে না। তাই পুজোও ছোঁয়নি এ বাড়িকে। উৎসবের জৌলুস থমকে গিয়েছে নির্যাতিতা এবং ইন্দ্রজিতের বাড়িতেও — পুজোতেও একই সুতোয় গাঁথা পড়ে গিয়েছে বারুইপুরের সেই তিন পরিবার।
