Published on
:
5 min read
কৌশিক ঘোষ
দাদু নয়। কলম দাদু। শিশুমনে প্রথম দাদু বলতে যে কোনও বয়স্ক ব্যক্তিকেই কলম দাদুর সঙ্গে তুল্যমূল্য বিচার করতাম। বিশ্লেষণ করলে যা দাঁড়ায়, একজন ছোটখাটো মাপের ধুতি এবং স্যান্ডো গেঞ্জি পরিহিত মানুষ, যিনি সর্বক্ষণ কালো রঙের ফাউন্টেন পেনে লেখালিখি করবেন।
এই ধারণার সাধারণীকরণ যে বিপজ্জনক, তা অনেক ক্ষেত্রেই প্রমাণিত হয়েছিল, যখন বয়স্কদের বলে বসতাম কলম দাদু। আসলে পাইকপাড়ার সর্ব খাঁ রোডে আশুবাবুর বাজারের ঠিক গেটের সামনেই এত মানুষের চেঁচামেচির মধ্যেও একমনে নিস্তব্ধে একজন মানুষ কী করে লিখতে পারে, তা আমার এখনও ধর্তব্যে আসে না।
সকালে ওই বাড়িতে গেলে, সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠেই সোজাসুজি যে ঘর, সেখানেই ছিল নরেন্দ্রনাথ মিত্রের লেখার সংসার। ওই ঘরের আসবাবের মধ্যে একটি ছোট সোফা। একটি টেবিল। তার উপরে ছোট রেকাবিতে রাখা সকালে বাড়ির পেছনে পরিত্যক্ত জমিতে গজিয়ে ওঠা শিউলি গাছ থেকে নিয়ে আসা ফুল। অনেক সময়ে বাজার থেকে আনা ফুলও থাকত। এই মানুষটি যে বাংলা সাহিত্যের একজন এত বড় লিখিয়ে, তা তখন জানতাম না।
স্মৃতিতে যতটুকু মনে পড়ে, দিনটা ছিল ২১ অগস্ট। সাল মনে নেই। আমার জন্মদিন। বাবার সঙ্গে সাতসকালেই পোঁছে গিয়েছি। আমি সটান দাদুর টেবিলের সামনে গিয়ে বললাম— আজ আমার জন্মদিন! আমায় কী দেবে? আমাদের বাড়িতে কখন আসবে? তোমাকে যেতেই হবে।
তিনি কথাটা শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন। গাল টিপে আদর করে একটা কাগজ নিয়ে খসখস করে একটি ছড়া লিখে দিয়েছিলেন— তাবুলবাবু কাবুল যাবে/ আর কে যাবে সঙ্গে/ তিলক যাবে, তোড়াও যাবে/ নাচতে নাচতে রঙ্গে। লেখাটি বহু দিন ধরে সযত্নে আমার কাছে রেখে দিয়েছিলাম। তার পর বাসা বদলের সময়ে কোথাও তা হারিয়ে যায়।
সে দিন আমার বড় রাগ হয়েছিল। আমার ডাকনাম, যা শুনতে সুখকর নয়, তা ওই ছড়ায় ব্যবহার করা হয়েছে! আমাকে গম্ভীর থাকতে দেখে বললেন— পছন্দ হলো না বুঝি!
— আসলে নামটা...
বুঝেছিলেন আমার আপত্তি কোথায়, আর সেই কারণেই বললেন— নাম বিষয়টাই হলো বড় আদরের। যে, যে ভাবে ডাকে। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কলম দাদুর বিখ্যাত একটি ছোটগল্প— ‘নাম’। অসীম নামে শহিদ কলোনির এক কিশোরকে, পাড়ারই এক ভদ্রলোক বিষ্ণুবাবু পাইকপাড়ায় বিটি রোডের কাছে হাউসিং এস্টেটে একটি পরিবারে কাজ ঠিক করে দেন। ঘটনাচক্রে ওই বাড়ির কর্তা, যিনি তিন মাস আগে মারা গিয়েছেন, তাঁর নামও অসীম। ফলে, মৃত ভদ্রলোকের স্ত্রী এবং মা ওই নামে তাঁকে ডাকতে নারাজ। ছেলেটির নতুন নাম দেওয়া হলো গোবিন্দ। অসীমের নতুন নাম একেবারে না-পসন্দ। অবশেষে গৃহকর্তার মা তাঁর প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও অসীমকে তার আসল নাম ধরে ডেকে মানসিক পরিতৃপ্তি পান। তার নামের মধ্যেই মৃত ছেলের সান্নিধ্য লাভ করেন।
এই গল্পের মধ্যে আমি ব্যক্তিগত ভাবে খুঁজে পাই ওই বাড়িতে থাকা নিমাইদাকে। বাড়ির সব রকমের ফরমায়েশ খাটত। লেখাপড়াও করত। আমাদের ছোটবেলার খেলার সাথী। পরে একটি কারখানায় চাকরিও পায় ওই বাড়ির কারও সুপারিশে। এখন তার ঠিকানা অবশ্য বলতে পারব না।
গল্পে একেবারে নাম করে প্রত্যক্ষ যে শিশুচরিত্র রচিত হয়েছে, তার নাম তোড়া। আমার মাসতুতো বোন তোড়া। তাকে নিয়ে শিশুদের জন্য গল্প ‘অনুকারিণী’। গল্পটি পরবর্তী কালে প্রকাশিত হয়েছিল ‘শিশুমেলা’ নামক এক পত্রিকায়।
ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হয়, কলম দাদুর বেশ কিছু চরিত্রায়ন এবং গল্পের পরিবেশে যাঁর পরোক্ষ ভাবে বিচরণের ছাপ রয়েছে, তিনি হলেন তাঁর স্ত্রী শোভনা মিত্র। সম্পর্কের খাতিরে হওয়া উচিত ছিল দিদা বা দিদিমা। সর্বসাধারণের কাছে তিনি ‘সেমা’ নামেই পরিচিত। আমরা কয়েকজন এই নাম ছাড়াও আম্মা বলে ডাকতাম। কোনও নামেরই ব্যুৎপত্তি আমার জানা নেই।
শুধু গল্পের চরিত্রই বা বলব কেন, পাইকপাড়ায় যে অঞ্চলে আমরা থাকতাম, তার সমস্ত অলিগলি যেন গল্পের চিত্রপট হয়ে উঠেছে। ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি, আশুবাবুর বাজার, বহু রকম মানুষের ভিড়, ক্রেতা এবং বিক্রেতা, তাঁদের জীবনযাপন— যে কোনও গল্পকারের কাছেই বড় প্রাপ্তি।
নরেন্দ্রনাথ মিত্রের একটি অণুগল্পের কথা এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে। গল্পটির নাম ‘চোখ’। যদিও বলে রাখা ভালো, তিনি কোনও দিন অণুগল্প বলতেন না, বলতেন বিন্দু বিন্দু গল্প। আশুবাবুর বাজারে মাছ-বিক্রেতাদের চোখের সঙ্গে বিভিন্ন প্রকারের মাছের জ্যান্ত এবং মৃত মাছের চোখের এক অসাধারণ সাদৃশ্য তুলে ধরেছিলেন তিনি। বিক্রেতাদের বিভিন্ন ধরনের চোখের মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছিল হিংসা, দ্বেষ, রাগ এবং অনুরাগের এক করুণ এপিটাফ।
আবার একই ভাবে, ‘বাসিফুল’ গল্পে বাজারের এক ফুল বিক্রেতা এবং মাংসের দোকানের চাচা অমর হয়ে উঠেছেন। তাঁদের সঙ্গে আজও দেখা হলে হেসে গর্ব করে বলেন— আমাদের নিয়ে বাবু গল্প লিখেছিলেন। সে গল্প তারা পড়েছে কি না, তা অবশ্য জানি না, শুনেই খুশি। (বিশেষ কারণে তাঁদের নাম উল্লেখ করলাম না)।
আশুবাবুর বাজার ছেড়ে স্মৃতির সরণি বেয়ে হেঁটে চলেছি রাজা মণীন্দ্র রোড, রানি হর্ষমুখী রোড, বীরপাড়া, পাইকপাড়া ফার্স্ট রোড, নর্দার্ন অ্যাভিনিউ, শ্রীনাথ মুখার্জি লেন এবং সর্বশেষে আমাদের টালা পার্ক। এই অঞ্চল জুড়েই ছিল মূলত ও-পার বাংলা থেকে আসা মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্তের বাস। গল্পের যে চরিত্রগুলি পরবর্তী কালে পড়েছি, বা যাঁদের সরাসরি দেখেছি, তাঁদের অনেকেরই মূল এই পাড়াতেই গ্রন্থিত। এই টোপোগ্রাফি বাদ দিয়ে লেখকের গল্পের চরিত্রেরা মানানসই হয় না। কিছু ক্ষেত্রে হয়তো তার পরিধি বাগবাজার বা কুমোরটুলিতে ছড়িয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে উত্তর ও দক্ষিণ শহরতলিতে। তাঁর মানুষের সঙ্গে মেশার পরিধি ছিল বিশাল এবং দীর্ঘস্থায়ী।
আমার খুব ক্ষীণ স্মৃতি, শোভাবাজারে এক আত্মীয়ের বিয়েতে এসে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। শোভাবাজার থেকে হেঁটে, কলম দাদুর কোলে এবং বাবার কোলে মিলিয়ে-মিশিয়ে অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছিলাম। বাবার কাছেই শোনা, ওই অঞ্চলের রাস্তাঘাট, গলি এবং সর্বোপরি মানুষজন— সবই যেন কলম দাদুর কত দিনের চেনা! এগুলিই হয়তো পরবর্তী কালে ছিল তাঁর লেখার রসদ।
কয়েক দিন আগে হাটখোলা অঞ্চলে একটা কাজে গিয়ে জয় মিত্র লেনের অন্ধকারাছন্ন এবং সরু সেই গলিটা দেখেই চমকে উঠেছিলাম। এই গলিতেই এক ভাড়াবাড়িতে কোনও একদিন সৃষ্টি হয়েছিল ‘অভিনেত্রী’ গল্পের নায়িকা লাবণ্যর বারোমাস্যা। এই গলিটার আবহই তো গল্পের মুখড়া— ছোট্ট, অন্ধকার গলির মধ্যেই বাসা বাঁধে একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের দৈন্যদশা। আবার, ‘দীপান্বিতা’ গল্পের সেই বাগবাজারের গলি, চোখ বন্ধ করে বলা যায়, ওই গলির পরিবেশ গল্পেরই যেন একটি ভিন্ন চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নর্দার্ন অ্যাভিনিউ থেকে একটু এগোলেই শ্রীনাথ মুখার্জি লেনে সেতার-শিল্পী মুস্তাক আলি খানের বাড়ি। দুই পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তা এলাকায় সর্বজনবিদিত। তিনি ওস্তাদজি নামেই পরিচিত। সরস্বতী পুজোর দিন তাঁর বাড়িতে শুধু গান-বাজনাই নয়, পুজোও হতো। তার পরে খাওয়াদাওয়া। কলম দাদু এবং বাড়ির অনেকের সঙ্গেই ওখানে হাজির হতাম। ওখানেই আসতেন চিত্রশিল্পী অন্নদা মুন্সী, সেতারশিল্পী নিতাই বসু-সহ অজস্র গুণগ্রাহী। আমিও সেতারের নাড়া বেঁধেছিলাম ওস্তাদজির কাছেই। পরে ওই বাড়িতেই আমরা বহু দিন ছিলাম। কলম দাদু নিজেই তাঁর বাড়িতে সরস্বতী পুজো করতেন।
গানবাজনার মূল কর্ণধার ছিলেন শোভনা মিত্র। তিনি নিজেও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের গাইয়ে। বাড়িতেই স্কুল। এখানেও অনেক বড় শিল্পীকে আসতে দেখেছি। প্রায়ই আসতেন রবীন্দ্রসঙ্গীত-শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। আসতেন তাবড় তাবড় ওস্তাদজি। এই দৃশ্যপট যেন দেখতে পাই ‘বিলম্বিত লয়’ গল্পে। গল্পের নায়িকা অদিতির মধ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে রয়ে গিয়েছে তাঁর সহধর্মিনীর কমনীয়তা, সাংসারিক বাস্তববাদিতা ও শৈল্পিক সত্তা। যদিও গল্পের ক্যানভাস অনেক বড়।
স্থানীয় এক হেডমাস্টারমশাই কালীকৃষ্ণ ভট্টাচার্য একদিন আমায় ডেকে বলেছিলেন— নরেনবাবুর ‘হেডমাস্টার’ গল্প পড়ছস? আহা! ঠিক যেন আমারে নিয়েই লেখা। তিনিও অবশ্য গল্পের নায়ক কৃষ্ণপ্রসন্নবাবুর মতো ইংরেজির ভুল ধরতেন। সাহেব-সুবো কাউকেই ছাড়তেন না। বিনা পয়সায় গরিব ছাত্রদেরও পড়াতে দেখেছি।
আমার বয়স তখন ছয়। শখ হয়েছিল কলম দাদুকে দেখে লেখার। একদিন একটা ছোট্ট ছড়া নিয়ে হাজির হলাম। কবিতাটি পড়ে নিজের কাছে রাখলেন। একদিন রবিবারের সকালে তিনি আমাদের অনাথ দেব লেনের বাড়িতে কাগজ নিয়ে এসে হাজির। রবিবারের ‘আনন্দমেলা’র পাতায় ছড়াটি প্রকাশিত হয়েছিল। লিখে রোজগার সেই প্রথম। সাম্মানিক পেয়েছিলাম ২০ টাকা। সে কী আনন্দ আমার! এই ভাবে যখন আরও উৎসাহিত হয়ে লেখার কথা ভাবছি, তখনই সেপ্টেম্বরের ভোররাতে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। বাবা বোধ হয় দরজা খুলেছিলেন। নিমাইদা কাঁদতে কাঁদতে খবর দিলেন— বাবু আর নেই!
