প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, হামলায় নিহতরা হলেন বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামের মো. শাহেদ আহম্মেদ ও কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বদরপুর গ্রামের মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরি।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশী। এছাড়া আরো চার বাংলাদেশী আহত হয়ে কিং খালিদ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। শনিবারের হামলার পর বিমানবন্দরটির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ঢাকা-রিয়াদ রুটের ফ্লাইট চলাচলও স্থগিত হয়ে পড়েছে। এতে কয়েক হাজার যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন; ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রবাসীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
এরই মধ্যে সৌদি আকাশসীমা ও বিমান চলাচল নিয়ে নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে হুথিরা। আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলোকে সৌদি আরবের বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার আহ্বানও জানিয়েছে গোষ্ঠীটি। অন্যদিকে হামলার কঠোর জবাব দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। পাল্টাপাল্টি এ হুঁশিয়ারির মধ্যেই গতকাল রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি যাত্রী টার্মিনালে ফের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হুথিরা। এতে যাত্রী টার্মিনালে আগুন ধরে যায়। সর্বশেষ এ হামলায় বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন বলেও জানা গেছে।
শনিবারের হামলার বিষয়ে গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগেও যখন হুথিরা আক্রমণ করেছিল, সেখানে বাংলাদেশের একজন নিহত হয়েছিলেন। এবার দুজন নিহত হলেন।’ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিগত দিনে ১৪ জন বাংলাদেশীকে এরই মধ্যে হারানোর কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আমরা আশা করব যে এ বিপর্যয় বন্ধ হবে, এ আক্রমণ বন্ধ হবে। এ ধরনের মৃত্যু মেনে নেয়া অত্যন্ত কষ্টকর।’
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, হামলায় নিহতরা হলেন বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামের মো. শাহেদ আহম্মেদ ও কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বদরপুর গ্রামের মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরি।
শনিবার রিয়াদে ওই হামলার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওইদিন বেলা আনুমানিক ৩টা ২০ মিনিটে রিয়াদের কিং খালিদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের টার্মিনাল-৩-এর ওপর একটি ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়ে। এ সময় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের যাত্রীরা সেখানে অপেক্ষমাণ ছিলেন। হামলায় দুই বাংলাদেশী নাগরিক নিহত হয়েছেন।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, হামলার সময় ইউএস-বাংলা, সৌদিয়া ও রিয়াদ এয়ারের বাংলাদেশী যাত্রীরা বিমানবন্দরে ছিলেন। তাদের মধ্যে (যারা আহত হননি) ১৭ জন ম্যারিয়ট হোটেলে, ২৫ জন র্যাডিসন হোটেলে ও ৪০ জন প্রিন্সেস নুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে অবস্থান করছেন। এখন পর্যন্ত চারজন আহত অবস্থায় কিং খালিদ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি আছেন। তাদের সঙ্গে অক্ষত অবস্থায় দুজন যাত্রীও রয়েছেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আমাদের মিশন ওখানে আরো যারা বাংলাদেশী আছেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে, হতাহতের অবস্থা জানার চেষ্টা করছে এবং যারা বাংলাদেশী ভাইয়েরা আছেন, তারা যতদূর সম্ভব, যাতে নিরাপদে থাকতে পারেন, সে নির্দেশনা আমাদের মিশনকে দেয়া হচ্ছে।’
বাংলাদেশের কোনো ফ্লাইট ওখানে ওই সময়ে কিং খালিদ এয়ারপোর্টে ছিল কিনা বা বাংলাদেশের কোনো ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে এ রকম কোনো তথ্য নেই। হামলার খবরটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্লাইট বন্ধ করা হয়েছে।’
এদিকে সৌদি আরবের রিয়াদ ও জেদ্দা বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন প্রবাসীরা। ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা অনেক প্রবাসী ফ্লাইটের জন্য বিমানবন্দরে এসে জানতে পারছেন, তাদের যাত্রা স্থগিত হয়েছে। আবার সৌদি আরবে থাকা যাত্রীরাও নির্ধারিত সময়ে দেশে ফিরতে পারছেন না। ফ্লাইটের নতুন সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়িয়েছে সময়মতো তথ্য না পাওয়ার সমস্যাও।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট শাখার তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদ বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এখন পর্যন্ত আটটি ফ্লাইটের ২ হাজার ৯৫১ যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুটি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের তিনটি ও রিয়াদ এয়ারের দুটি ফ্লাইট রয়েছে। শনিবার ও গতকাল নির্ধারিত ফ্লাইটগুলো পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটায় যাত্রীরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগ গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, রিয়াদ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ কার্যক্রম বন্ধ রাখার সময়সীমা ১১ অক্টোবর রাত ৯টা পর্যন্ত (ইউটিসি) বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী, এ সময়সীমা আজ ভোররাত ৩টা পর্যন্ত। বিমানবন্দরটি পুনরায় চালুর বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় ১১ ও ১২ অক্টোবর ঢাকা-রিয়াদ ও রিয়াদ-ঢাকা রুটে নির্ধারিত বিজি৩৩৯ ও বিজি৩৪০ ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। ফ্লাইট ও সময়সূচির পরবর্তী তথ্য আজ দুপুর ১২টায় জানানোর কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
এদিকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের কয়েকটি ফ্লাইট গতকাল ও আজ নির্ধারিত ছিল। পরে ১২ তারিখ পর্যন্ত ফ্লাইট বন্ধ থাকার বিষয়ে বার্তা পেয়েছি। এখন অপেক্ষা করছি, পরিস্থিতির উন্নতি হলে ফ্লাইট চলাচল আবার চালু হয় কিনা।’
ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তনের তথ্য যাত্রীদের কাছে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবে থাকা অনেক যাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য স্থানীয় ফোন নম্বর, ট্র্যাভেল এজেন্সি কিংবা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিতে হয়। ফলে ফ্লাইটের সর্বশেষ তথ্য সব যাত্রীর কাছে যথাসময়ে পৌঁছানো যাচ্ছে না। অনেক যাত্রী তথ্য না পেয়ে বিমানবন্দরেও চলে আসছেন।’
গতকাল ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়ে দেখা যায়, ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিতের খবরে যাত্রীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফ্লাইটের তথ্য জানার জন্য অনেকে যাত্রার সময়সূচি প্রদর্শনকারী বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকছেন। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিমানবন্দরে এসে নতুন সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করছেন, আবার কেউ প্রিয়জনকে বিদায় জানাতে এসে পড়েছেন বিপাকে। কখন ফ্লাইট চালু হবে, তা জানতে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন যাত্রীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাদের ভিসার মেয়াদ শেষের দিকে, তাদের উদ্বেগ তুলনামূলক বেশি। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে চাকরি ও ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে সৌদি আরবে আটকে পড়া যাত্রীদেরও দেশে ফেরার পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের নিজ নিজ এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা ও পরবর্তী যাত্রার সময় নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীদের ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার অনুরোধও জানানো হয়েছে।
