বাংলাদেশে প্রতিবছর পানিতে ডুবে, সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ে এবং আত্মহত্যা করে় হাজার হাজার মানুষের করুণ মৃত্যু ঘটে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৯ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায় (দৈনিক গড়ে প্রায় ৫২ জন)। এর পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে গড়ে ৬ থেকে ৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারায় (দৈনিক প্রায় ২০-২৫ জন)। অন্যদিকে, বছরে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ (দৈনিক ৩০ জনেরও বেশি)। দুর্ঘটনা ও আত্মহত্যার এই সামগ্রিক পরিসংখ্যানে একটি বড় অংশই উদীয়মান তরুণ ও শিক্ষার্থী। ২০২৬ সালেও দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকজন মেধাবী শিক্ষার্থী এই তিন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হয়ে অকালে ঝরে গেছেন।
সম্প্রতি সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) একটি প্রতিবেদন আমাদের পুনরায় এই মর্মান্তিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গত ১১ মাসে শাবিপ্রবির আট শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন পানিতে ডুবে, দুজন সড়ক দুর্ঘটনায়, দুজন অসুস্থ হয়ে এবং একজন কীটনাশক পানে মারা গেছেন। শিক্ষার্থীদের এই অকাল প্রয়াণ পুরো ক্যাম্পাসকে শোকগ্রস্ত করে তুলেছে।
যেকোনো অকালমৃত্যুই অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত এবং বেদনাদায়ক। অকালে একটি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়া মানে একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একজন তরুণ মেধাবীর অকালপ্রস্থান মানে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যতম যোগ্য মানবশক্তিকে হারানো। দুর্ঘটনা নিছকই দুর্ঘটনা, যদিও এর ওপর কারো হাত থাকে না; তবুও সবকিছুকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সড়ক দুর্ঘটনা বা স্বেচ্ছামৃত্যু বিষয়ে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিছুতেই এসব মর্মান্তিক ঘটনার দায় এড়াতে পারে না। আমাদের ভঙ্গুর রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও বিশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থায় জীবনের মূল্য যে কতটা অপরিসীম, তা আমরা এখনো সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারিনি। বেঁচে থাকাটাই এখানে আশ্চর্যের।
ওপরের যে তিন ধরনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার বড় একটা অংশের বয়স আঠারো থেকে পঁচিশের মধ্যে। কেন এমনটা ঘটছে? কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নিচ্ছেন? তার সমস্যার কি কোনো সমাধান ছিল না? গভীরভাবে খতিয়ে দেখলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে—পানিতে ডোবা, সড়ক দুর্ঘটনা এবং আত্মহত্যা বা স্বেচ্ছামৃত্যুর মতো ঘটনাগুলোর পেছনে শিক্ষার্থীদের বয়স একটি বড় ফ্যাক্টর। কৈশোর বা তারুণ্য হলো উচ্চতর ঝুঁকি নেওয়ার বয়স। এই সময়ে অল্পবয়সীদের মধ্যে ঝুঁকি নেওয়ার এবং শেষ পর্যন্ত কী হয়, তা দেখার একটা স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা থাকে। পানিতে নামার ঝুঁকি আছে জেনেও বা সাঁতার না জানার সংকট থাকা সত্ত্বেও তরুণরা আবেগবশত পানিতে নামেন। রাস্তায় নামলে তারা গতি নিয়ন্ত্রণ বা দুর্ঘটনার তোয়াক্কা করেন না। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বে কিশোর ও তরুণদের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রায় ৩০ শতাংশ থেকে ৪৩ শতাংশ ঘটে থাকে অতিরিক্ত গতির কারণে। অর্থাৎ একজন তরুণ যদি রাস্তায় মোটরবাইক চালান, তাহলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তিনি বিপদসীমার বাইরে গতি ব্যবহার করেন। এছাড়া অসতর্কভাবে পথচলাও অল্পবয়সীদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে; কারণ তারা বিপদের তোয়াক্কা খুব একটা করেন না। বাংলাদেশ মোবাইল ফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের একটি সামাজিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অসচেতনভাবে রাস্তায় ও রেললাইনে চলাচলের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়া তরুণ-তরুণীদের প্রায় ৯৫ শতাংশই মুঠোফোন ও হেডফোন ব্যবহার করছিলেন।
এবার আসা যাক দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কথায়। এদেশে এখনো সবচেয়ে অবহেলিত খাত হলো মানসিক স্বাস্থ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, শরীর ও মন একসঙ্গে ভালো না থাকলে কখনোই সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা মানসিক স্বাস্থ্যকেই সবচেয়ে বেশি অবহেলা করি। দুঃখজনক হলেও এটাই সত্যি যে, এদেশের প্রতি পাঁচজনে একজন মানসিক সমস্যাগ্রস্ত। অথচ সেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে রয়েছে চরম মাত্রার উদাসীনতা, অসচেতনতা এবং নানাবিধ সামাজিক স্টিগমা ও ট্যাবু।
অন্যদিকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা একদিকে যেমন উল্লেখযোগ্যহারে অপ্রতুল, তেমনি ক্ষেত্রবিশেষে ব্যয়বহুল। দেশের স্কুল-কলেজগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ নেই বললেই চলে। আর দেশে যত বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, সেখানে এক শতাংশেরও কম প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ রয়েছে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, পারিবারিক চাপ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষাঙ্গন ও পড়াশোনার তীব্র প্রতিযোগিতা এবং প্রাত্যহিক জীবনের নানাবিধ সংকটের কারণে তরুণ প্রজন্ম ভীষণ মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; অথচ সঠিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ তাদের নেই। যাও-বা সুযোগ রয়েছে, সেখানেও শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক সেবা গ্রহণ করতে এগিয়ে আসতে চান না। অনেক শিক্ষার্থীর মুখে শোনা যায়—তারা জানেনই না যে তার ক্যাম্পাসে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো মনোবিদ বা মানসিক বিশেষজ্ঞ কাজ করে যাচ্ছেন। আবার অনেকেই বয়সজনিত কারণে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে ভোগেন। তারা মনে করেন, তারা নিজেরাই নিজেদের এসব মানসিক জটিলতা সমাধান করে ফেলতে পারবেন।
অন্যদিকে রয়েছে সামাজিক লজ্জা ও ট্রোলের ভয়। একজন শিক্ষার্থী সাইকোলজিস্টের কাছে যেতে চূড়ান্ত ইতস্তত করেন; কারণ তিনি ভাবেন, বন্ধুরা হাসাহাসি করবে এবং তাকে ‘মেন্টাল’, ‘পাগল’ বা ‘সাইকো’ বলে ট্রোল করবে, তাকে করুণার দৃষ্টিতে দেখবে ইত্যাদি। কোভিড-১৯-এর পর কিশোর-তরুণরা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে আগের চেয়ে অনেক সচেতন হলেও সামাজিক লজ্জা কাটিয়ে প্রফেশনাল কাউন্সেলিং নেওয়ার বদলে গুগলে সার্চ দিয়ে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা করে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তিকর ও ক্ষতিকর হয়। আবার অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হলেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি থাকে হাতে গোনা। কেউ কেউ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সেবা নিতে শুরু করলেও পরবর্তীতে আর নিয়মিত থাকেন না।
চিকিৎসকরা বলেন, আত্মহত্যাই একধরনের মৃত্যু, যা প্রতিরোধ করা যায়। স্বেচ্ছামৃত্যু সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে: ১. তাৎক্ষণিক বা আবেগপ্রবণ আত্মহত্যা: যেখানে তীব্র মানসিক উত্তেজনায় হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, চিন্তা করার এক ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষার্থীরা ঘটনাটি ঘটিয়ে ফেলে, যা আগে থেকে টের পাওয়া যায় না। ২. দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্নতাজনিত আত্মহত্যা: যেখানে একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকট ও বিষণ্নতার মধ্য দিয়ে যান এবং ধীরে ধীরে জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বন্ধুবান্ধব ও সহপাঠীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের নৈতিক দায়িত্ব হলো মানসিক কষ্টে থাকা বন্ধুকে সেবা গ্রহণে উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনে কিছুটা জোর করে হলেও প্রফেশনাল সাইকোলজিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞর কাছে নিয়ে যাওয়া।
দুঃখজনক হলেও সত্য, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে তরুণদের একটি অংশ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও এর প্রক্রিয়া নিয়ে নানামুখী বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে থাকেন। এটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রফেশনাল সেবা গ্রহণের সিদ্ধান্ত থেকে আরও দূরে ঠেলে দেয়। ফলশ্রুতিতে অত্যন্ত জরুরি হওয়া সত্ত্বেও পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের বিষয়টি সেই তিমিরেই থেকে যায়, আর মাঝখান থেকে হারিয়ে যায় একের পর এক অমূল্য প্রাণ।
কোনো দুর্ঘটনা বা অপ্রীতিকর ঘটনার পর বিভ্রান্তি ছড়িয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে বিমুখ করার অর্থই হলো পরোক্ষভাবে আরও একটি প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলা।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমকে গতিশীল করতে আরও বেশি সাইকোলজিস্ট নিয়োগ করা এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে আরও সচেতন ও উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। মানসিক সুস্থতা নিশ্চিতে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম ও সেমিনারের আয়োজন করার এখনই উপযুক্ত সময়। প্রতিটি জীবনই অমূল্য—তাই অবহেলা, অসচেতনতা বা সামাজিক ট্যাবু ভেঙে আমাদের শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পরিবার, রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে।
ফজিলাতুন নেসা শাপলা: কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: nessa7421@gmail.com
