শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৯ রাত
নিউজ ডেস্ক: ভারতের গুজরাটের জামনগরে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম একক স্থানের তেল শোধনাগার পরিদর্শন করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
ভারতের শীর্ষ ধনকুবের মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের জামনগর শোধনাগার ঘিরে তার এই সফর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্য, রাশিয়ার তেল এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কেননা, এই তেল শোধনাগারকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন।
বুধবার রিলায়েন্সের এই বিশাল শিল্পাঞ্চল পরিদর্শন করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার সফরের মূল লক্ষ্য ছিল জ্বালানি ক্ষেত্রে দুই দেশের বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা।
রুবিওর সঙ্গে ছিলেন ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর। রিলায়েন্সের কর্ণধার মুকেশ আম্বানি, অনন্ত আম্বানি-সহ আম্বানি পরিবারের সদস্যরা তাদের স্বাগত জানান।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর জানিয়েছেন, গত এক বছরে ভারতের মোট এলপিজি আমদানিতে আমেরিকার অংশ ১০ শতাংশেরও কম থেকে বেড়ে ৬৭ শতাংশ হয়েছে। আমেরিকার টেক্সাসে রিলায়েন্সের প্রস্তাবিত নতুন তেল শোধনাগার প্রকল্পও দুই দেশের সহযোগিতার আরেকটি ক্ষেত্র। প্রকল্পটি চালু হলে প্রায় পাঁচ দশক পর আমেরিকায় নতুন বড় তেল শোধনাগার তৈরি হবে।
জামনগরে রুবিও রিলায়েন্সের বন্যপ্রাণী উদ্ধারকেন্দ্র ভান্তারা এবং সংস্থার নতুন জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রও ঘুরে দেখেন। সেখানে সৌরশক্তি, ব্যাটারি সংরক্ষণ ও অন্যান্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির পরিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ জামনগর শোধনাগার?
রিলায়েন্সের জামনগর শোধনাগার কমপ্লেক্সে দৈনিক ১৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে, যা বিশ্বের মোট পরিশোধন সক্ষমতার প্রায় দেড় শতাংশ। ১৯৯৯ সালে চালু হওয়া প্রথম শোধনাগারটির সক্ষমতা দৈনিক ৬ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল। ২০০৮ সালে চালু হওয়া দ্বিতীয় শোধনাগারটি মূলত রফতানির জন্য ব্যবহৃত হয়।
শোধনাগারটি ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। রিলায়েন্সের দাবি, এখন পর্যন্ত এখানে ২১৬টিরও বেশি ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে।
বিশ্ববাজারে ডিজেল, পেট্রল ও উড়োজাহাজের জ্বালানি সরবরাহে এই শোধনাগারের বড় ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ডিজেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়েও রিলায়েন্সের সঙ্গে আলোচনা করার কথা রুবিওর।
বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের অনুমান অনুযায়ী, অক্টোবরে জামনগরে ভেনেজুয়েলার তেল আমদানি দৈনিক প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে।
রাশিয়ার তেল নিয়ে ওয়াশিংটনের হিসাব
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর ভারত রুশ তেলের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতায় পরিণত হয়। চীনের পর রাশিয়ার তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা ভারত। রিলায়েন্সও রুশ তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছিল। ২০২২ সালের আগে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবহৃত তেলের মাত্র ৩ শতাংশ আসত রাশিয়া থেকে; ২০২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছায়।
রুশ তেল কেনার কারণে ২০২৫ সালের আগস্টে ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। এর প্রভাব পড়ে রিলায়েন্সের ওপরও। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি রুশ তেল আমদানি কমালেও ২০২৬ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে জামনগরে প্রক্রিয়াজাত তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছিল রুশ উৎসের।
রুবিও বলেছেন, ভারত জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করছে। তবে একদিনে রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো কঠিন। তিনি ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রেও বিনিয়োগ আম্বানির
রিলায়েন্স যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ব্রাউনসভিল বন্দরে একটি নতুন তেল শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনায় যুক্ত হয়েছে। প্রায় ৩০০ কোটি থেকে ৪০০ কোটি ডলারের প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পাঁচ দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এটি হবে অন্যতম বড় নতুন শোধনাগার। ২০২৯ সালের দিকে উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য রয়েছে।
রুবিওর সফরের সময় এই বিনিয়োগও ওয়াশিংটনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেল বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী, অন্যদিকে নিজেদের জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে চায়।
তবে আম্বানির সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইলন মাস্কের বিরোধও আলোচনায় এসেছে। ভারতে স্টারলিংকের কার্যক্রমের অনুমতি নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতার মধ্যে মাস্ক অভিযোগ করেছেন, আম্বানির জিওকে সুবিধা দিতে স্টারলিংকের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। রিলায়েন্স অবশ্য বলেছে, তারা কখনও প্রতিযোগিতাকে ভয় পায়নি।
সব শেষে বলা যায়, রুবিওর জামনগর সফর শুধু একটি তেল শোধনাগার পরিদর্শন নয়। রাশিয়ার তেল, ভেনেজুয়েলার সরবরাহ, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির দাম এবং ভারত-মার্কিন বাণিজ্যিক সম্পর্ক- সব ক’টি বিষয়ই এই সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, আল-জাজিরা
