ভারতের গুজরাট রাজ্যের জামনগরে অবস্থিত রিলায়েন্সের তেল শোধনাগার পরিদর্শন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। গত বুধবার বিশ্বের বৃহত্তম একক তেল শোধনাগারটি ঘুরে দেখেন তিনি। তাঁর এ সফরকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক তেলবাজারের কৌশলগত সমীকরণের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
পরিদর্শনকালে রুবিওর সঙ্গে ছিলেন ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের কর্ণধার মুকেশ আম্বানি, তাঁর ছেলে অনন্ত আম্বানি এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা তাঁদের স্বাগত জানান। সাধারণ কূটনৈতিক সফরের বাইরে একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শোধনাগার পরিদর্শন করায় এ সফরের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে মতপার্থক্য এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই রুবিওর এ সফর অনুষ্ঠিত হলো। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, দুই দেশের জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানো, অপরিশোধিত তেলের বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করাই ছিল সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য।
জামনগরের শোধনাগারটি প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম। ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ তেল পরিশোধনের বিশেষ সক্ষমতা থাকায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে কেন্দ্রটির গুরুত্ব অনেক। এখান থেকে ডিজেল, পেট্রল, উড়োজাহাজের জ্বালানিসহ বিভিন্ন পরিশোধিত পণ্য উৎপাদন করা হয়। বিশ্বের মোট তেল পরিশোধন সক্ষমতার প্রায় দেড় শতাংশ এ শোধনাগারের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্ববাজারে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। ভেনেজুয়েলার তেল তুলনামূলকভাবে ভারী হওয়ায় সব শোধনাগারে তা কার্যকরভাবে প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে রিলায়েন্সের সক্ষমতা দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি যাতে আরও বেশি ভেনেজুয়েলার তেল আমদানি ও পরিশোধন করতে পারে, সে সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
বিশ্লেষণভিত্তিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, অক্টোবরে জামনগরে ভেনেজুয়েলার তেল আমদানি দৈনিক তিন লাখ ৫০ হাজার থেকে তিন লাখ ৭০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে। তবে এ পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করবে বাজার পরিস্থিতি, বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর।
রুশ তেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর ভারত রুশ তেলের অন্যতম বড় ক্রেতায় পরিণত হয়। রিলায়েন্সও এ সময় রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি বাড়ায়। ২০২২ সালের আগে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবহৃত তেলের মাত্র ৩ শতাংশ রাশিয়া থেকে এলেও ২০২৫ সালে তা প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রুশ তেল কেনার কারণে ২০২৫ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। এতে রিলায়েন্সের ব্যবসায়িক কার্যক্রমও প্রভাবিত হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমালেও ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়কালে জামনগরে প্রক্রিয়াজাত তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রুশ উৎস থেকে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
রুবিওর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত জ্বালানি আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে। তবে রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা দ্রুত কমানো সহজ নয়। একই সঙ্গে তিনি ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে আম্বানির বিনিয়োগ পরিকল্পনা
রিলায়েন্স যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ব্রাউনসভিল বন্দরে একটি নতুন তেল শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। প্রায় ৩০০ কোটি থেকে ৪০০ কোটি ডলারের এ প্রকল্পে ২০২৯ সালের দিকে উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতে ভারতীয় বিনিয়োগের পরিসর আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, ভারতের উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট বাজারে স্টারলিংকের প্রবেশ নিয়ে ইলন মাস্ক ও মুকেশ আম্বানির ব্যবসায়িক স্বার্থের দ্বন্দ্বও আলোচনায় এসেছে। মাস্কের অভিযোগ, আম্বানির প্রতিষ্ঠান জিওকে সুবিধা দিতে স্টারলিংকের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে রিলায়েন্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা প্রতিযোগিতাকে ভয় পায় না।
সব মিলিয়ে, জামনগরে রুবিওর সফরকে কেবল একটি তেল শোধনাগার পরিদর্শন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ভেনেজুয়েলার তেলের বাজার, রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্য, যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিনিয়োগ এবং ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক—এসব বিষয়ই সফরটিকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ভবিষ্যতে দুই দেশের জ্বালানি সহযোগিতা কোন দিকে এগোয়, তা আন্তর্জাতিক তেলবাজার ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
-20261022162449.jpg&w=1440&q=75)