একটি ছোট ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস, পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে চরম অনিশ্চয়তা—এমন নানা সামাজিক ও আর্থিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই বেড়ে ওঠে সুবিধাবঞ্চিত ও বস্তি এলাকার শিশুরা। তবে উপযুক্ত দিকনির্দেশনা ও সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এই বাস্তবতাই বদলে যেতে পারে। তারই অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে 'হাসিমুখ সমাজ কল্যাণ সংস্থা'-র শিক্ষার্থীরা। একসময় যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা চালিয়ে যাওয়াই ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ, তারা এখন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, নার্সিং ইনস্টিটিউট ও পলিটেকনিকসহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করছে।
শিক্ষার্থীদের এই স্বপ্নযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে 'হাসিমুখ সমাজ কল্যাণ সংস্থা'। কেবল বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ ও স্টেশনারি সরবরাহই নয়, সংস্থাটি শিক্ষার্থীদের সঠিক পুষ্টি, স্বাস্থ্য সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত স্যানিটারি প্যাড বিতরণসহ সব শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা রয়েছে। তা ছাড়া ঈদ ও শীতের মতো মৌসুমে নতুন পোশাক, শীতবস্ত্র ও খাদ্যপণ্য সরবরাহের মাধ্যমে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার মতো অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা হয়।
ভবিষ্যতে স্বাবলম্বী করে তুলতে শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আইটি বা তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে নানা রকম হস্তশিল্প ও ক্রাফটসের কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা নিজস্ব কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে।
সংস্থাটির বহুমুখী এ উদ্যোগের সুফল ইতিমধ্যেই মিলতে শুরু করেছে। সম্প্রতি 'স্বপ্নসারথী'-র আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ২০২৬’-এ হাসিমুখ সমাজ কল্যাণ সংস্থার ২৮ জন কৃতী শিক্ষার্থীকে সংবর্ধিত করা হয়। সংবর্ধিত এই শিক্ষার্থীরা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, নার্সিং ইনস্টিটিউট ও পলিটেকনিকে অধ্যায়ন করছে। তা ছাড়া চলতি বছর সংস্থাটির আরও আটজন শিক্ষার্থী সফলভাবে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।
উক্ত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক (সচিব) ড. মোহাম্মদ জাকারিয়া। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট লেখক, নাট্যকার ও সাংবাদিক আনিসুল হক। অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্য প্রদান করেন স্বপ্নসারথীর প্রধান উপদেষ্টা ও এসইএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল।
সংগঠনটির সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সাফল্য কেবল জিপিএ বা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার চিত্র নির্দেশ করে না; এটি প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের জন্য নতুন পথ তৈরির এক অদম্য লড়াই। শিশুদের স্বপ্ন ও অদম্য ইচ্ছা পূরণের পথে আর্থিক অসচ্ছলতা যে কখনোই স্থায়ী বাধা হতে পারে না, হাসিমুখের এই শিক্ষার্থীরা তা পুনর্প্রতিষ্ঠা করেছে।
