কোমো রূপকথা লিখে চলেছে, আর এ রূপকথার নায়ক এখন নিকো পাজ। ইতালির নৈসর্গিক শহরের এ ক্লাবকে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি। সেই সঙ্গে নিজেও বড় হচ্ছেন।
ইতালির নাপোলি শহরকে বিখ্যাত করেছেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। স্পেনের বার্সেলোনা শহরও বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে লিওনেল মেসির ২০ বছরের গৌরবোজ্জ্বল পথচলায়। দুই কিংবদন্তি ফুটবলারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এবার আরেক আর্জেন্টাইন ফুটবল বিস্ময় নিকো পাজ রূপকথা লিখে চলেছেন ইতালির ‘কোমো ১৯০৭’ ফুটবল ক্লাবের হয়ে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ম্যানইউকে ৪-১ গোলে হারিয়ে হইচই ফেলে দেয়া কোমোর ‘পোস্টার বয়’ হয়ে উঠেছেন ২২ বছর বয়সী নিকো পাজ।
কোমো রূপকথা লিখে চলেছে, আর এ রূপকথার নায়ক এখন নিকো পাজ। ইতালির নৈসর্গিক শহরের এ ক্লাবকে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি। সেই সঙ্গে নিজেও বড় হচ্ছেন।
ট্রফি ক্যাবিনেটে নেই কোনো বড় সাফল্যের মুকুট, নেই কোনো অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম বা বিশ্বসেরা সুপারস্টার ফুটবলারদের মেলা। তবু আজ ফুটবল বিশ্বের সব আলো কেড়ে নিয়েছে ইতালির অখ্যাত ক্লাব কোমো। তাদের শক্তি ফুটবল ঐতিহ্য নয়, বরং তাদের মূল পুঁজি হলো চোখজুড়ানো লম্বার্ডির পাহাড়, বিখ্যাত ‘লেক কোমো’ এবং বিশ্বের ধনী ও তারকাদের অন্যতম প্রিয় অবকাশ যাপন কেন্দ্র।
সাধারণত ফুটবল ক্লাবগুলো স্থানীয় সমর্থকদের ক্ষোভের মুখে পড়ার ভয়ে পর্যটকদের খুব একটা পাত্তা দিতে চায় না। কিন্তু কোমো এখানেই ব্যতিক্রম। আল্পসের কোলে মাত্র ১২ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার ‘স্তাদিও জিউসেপ্পে সিনিয়ালিয়া’ স্টেডিয়ামকে সামনে রেখে ক্লাবটি নিজেদের নির্দ্বিধায় একটি স্পোর্টস ট্যুরিজম ডেস্টিনেশন (ক্রীড়া পর্যটন কেন্দ্র) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মাঠের খেলায় লড়াই করার পাশাপাশি মাঠের বাইরে একটি টেকসই ব্যবসা গড়ে তোলাই ছিল তাদের লক্ষ্য। আর তাদের সেই টোটকা দারুণভাবে কাজে লেগেছে।
২০০৩ সালের পর দু-দুবার দেউলিয়া ঘোষিত হওয়া কোমো ২০১৮-১৯ মৌসুমেও খেলছিল ইতালির অপেশাদার চতুর্থ স্তরের ফুটবল (সিরি-ডি)। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ান মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘জারুম গ্রুপ’ দায়িত্ব নেয়ার পর দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়। গত ছয় বছরে তিনবার প্রমোশন পেয়ে ২০২৪ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর তারা ইতালির শীর্ষ লিগে (সিরি-এ) ফিরে আসে।
এখানেই শেষ নয়, স্প্যানিশ গ্রেট সেস ফ্যাব্রেগাসের কোচিংয়ে গত মৌসুমে ইতালির শীর্ষ লিগে চতুর্থ স্থান অধিকার করে নিজেদের ১১৯ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে কোমো। সেই সাফল্য যে মোটেও ‘ফ্লুক’ ছিল না সেটা আরেকবার তারা মাঠে প্রমাণ করল। গত বুধবার রাতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে লম্বার্ডির অনিন্দ্যসুন্দর ভেন্যুতে তারা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ৪-১ গোলে হারিয়ে ফুটবল দুনিয়াকে আরেকবার হতবিহ্বল করে দিয়েছে। দলের তরুণ ফরওয়ার্ড নিকো পাজের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে এ ঐতিহাসিক জয় উদযাপনে মেতে ওঠে স্থানীয় ও পর্যটক সমর্থকরা।
২০১৯ সালে জারুম গ্রুপ যখন ক্লাবটি কিনে নেয় তখন তাদের পরিকল্পনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোমোর প্রেসিডেন্ট মিরওয়ান সুওয়ারসো জানান, শুরুতে তারা ইন্দোনেশিয়ার তরুণ ফুটবলারদের এ ক্লাবে এনে খেলানোর পরিকল্পনা করেছিলেন, যাতে ইন্দোনেশিয়ার টেলিভিশনে সেই ম্যাচগুলো দেখিয়ে বড় অঙ্কের টিআরপি পাওয়া যায়। কিন্তু ক্লাবটি দ্রুত প্রমোশন পেয়ে তৃতীয় বিভাগে (পেশাদার লিগ) চলে যাওয়ায় ইতালির নিয়ম অনুযায়ী সেখানে বিদেশী খেলোয়াড় খেলানোর সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে মালিক পক্ষকে পরিকল্পনা বদলাতে হয়। খরচ সামলাতে তারা ক্লাবটি বিক্রি করে দেয়ার কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু ফুটবল ও লেক কোমোর পর্যটনকে এক সুতোয় বেঁধে তারা একে একটি লাভজনক ব্যবসায় রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নেন।
লেক কোমোর পর্যটন খাত থেকে প্রতি বছর প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ইউরোর ব্যবসা হয়। জর্জ ক্লুনি, রবার্ট প্যাটিনসন, সিলভেস্টার স্ট্যালোনের মতো হলিউড তারকাদের এখানে বাড়ি রয়েছে। ওবামা থেকে শুরু করে মাইকেল জর্ডান—বিশ্বের বহু নামি ব্যক্তিত্ব এখানে ছুটি কাটাতে আসেন। আর এ তারকা খ্যাতিকে কাজে লাগিয়েছে কোমো ফুটবল ক্লাব। হিউ গ্রান্ট, অ্যান্ড্রু গারফিল্ড, বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচের মতো তারকারা নিয়মিত এ ক্লাবের ম্যাচ দেখতে আসেন।
পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে ক্লাবটি ‘দ্য ক্লাব অন দ্য লেক’ নামের একটি বিলাসবহুল প্রাইভেট মেম্বার্স ক্লাবও পরিচালনা করে, যার বার্ষিক সদস্য ফি প্রায় ৪ হাজার ৫০০ ইউরো। এছাড়া পর্যটনের ভরা মৌসুমে (জুলাই-আগস্ট) খেলার জন্য তারা ‘কোমো কাপ’ চালু করেছে, যেখানে ক্রিস্টাল প্যালেস বা ভিয়ারিয়ালের মতো দলগুলো খেলতে আসে। বিশ্বজুড়ে এখন কোমোর সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট সুওয়ারসো জানতেন, শুধু পর্যটন দিয়ে দর্শক টানা যাবে না, ফুটবলটাকেও দৃষ্টিনন্দন হতে হবে। আর সেই দায়িত্বটি সফলভাবে পালন করছেন বার্সেলোনা ঘরানার কোচ ফ্যাব্রেগাস। তিনি যখন দায়িত্ব নেন, তখন ক্লাবের অবকাঠামোগত অবস্থা ছিল শূন্যের নিচে। কিন্তু তিনি তরুণ ও অপরিচিত খেলোয়াড়দের ওপর আস্থা রেখে এক আক্রমণাত্মক ও সুন্দর ফুটবলশৈলী তৈরি করেছেন, যা রক্ষণাত্মক ইতালিয়ান ফুটবলে একদমই নতুন। এ সুন্দর ফুটবলই এখন কোমোর মূল ব্র্যান্ড।
বিশ্বজুড়ে ব্র্যান্ডিং আর পর্যটকদের ভিড়ের মাঝেও কোমো তাদের আদি ও বিশ্বস্ত স্থানীয় সমর্থকদের ভুলে যায়নি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের প্রথম ম্যাচে অনেক পরিচালক নিজেদের টিকিট ছেড়ে দিয়েছিলেন ক্লাবের প্রবীণ সমর্থকদের মাঠে বসে খেলা দেখার সুযোগ করে দিতে। এমনকি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে ক্লাবের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সমর্থকদেরই মাঠে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ব্যানার ওড়ানোর জন্য।
কোচ সেস ফ্যাব্রেগাসের ভাষায়, ‘এখানে সমর্থক, পরিচালক, স্টাফ ও পুরো শহর—সবাই একই সূত্রে গাঁথা। আমরা একটি কমপ্লিট প্যাকেজ। যদি আমরা এ কঠোর পরিশ্রম ধরে রাখতে পারি, কোমোর ভবিষ্যৎ গল্পটা আরো অনেক সুন্দর হবে।’
বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর হ্রদের পাড়ে দাঁড়িয়ে কোমো ফুটবল ক্লাব প্রমাণ করে দিল সঠিক পরিকল্পনা, নান্দনিক ফুটবল আর প্রকৃতির মেলবন্ধন ঘটলে ফুটবলের চেনা ইতিহাসকেও নতুন করে লেখা সম্ভব।
কোমোর এ উত্থানে বড় অবদান রেখে চলেছেন আর্জেন্টিনার ‘নতুন মেসি’ নিকো পাজ। ম্যানইউর বিপক্ষে তিনি করেছেন জোড়া গোল, অ্যাসিস্ট করেছেন আরো এক গোলে। ২২ বছর ৪৩ দিন বয়সে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোনো ম্যাচে লিওনেল মেসির পর কনিষ্ঠতম আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় হিসেবে ৩টি গোল কন্ট্রিবিউশন (২ গোল, ১ অ্যাসিস্ট) করার রেকর্ড গড়েন তিনি।
ম্যাচের ১১৮ সেকেন্ডেই গোল করেন নিকো পাজ। ২০২৪ সালে রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে কোমোতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে পাজের উন্নতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বার্নাব্যুতে তিনি প্রথম একাদশে খেলার সুযোগ পেলেও ধারাবাহিকভাবে বিকশিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গার অভাব ছিল। কোমোতে পাজ আরো নিয়মিত খেলার সুযোগ পাচ্ছেন এবং তাকে আরো বড় দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে।
সিরি-এ লিগে নিজের প্রথম মৌসুমে এ আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার ৩৫টি ম্যাচে ৬ গোল করেন এবং ৮ গোলে অ্যাসিস্ট করেন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ৩৫ ম্যাচে ১২ গোল, অ্যাসিস্ট করেন ৬টি। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ১০ ম্যাচে করেছেন ৪ গোল। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ৩ ম্যাচে করেছেন ২ গোল। কোমোর হয়ে প্লেমেকার হিসেবে নিজের ভূমিকা বজায় রাখার পাশাপাশি তার গোলের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে ১৪ ম্যাচে করেছেন ৪টি গোল। সর্বশেষ কিংবদন্তি লিওনেল মেসির বিদায়ী ম্যাচে বেনিনের বিপক্ষে দুর্দান্ত এক গোল করেন তিনি মেসিরই পাস থেকে। আর্জেন্টিনার মশালটা মেসির হাত থেকে এখন তরুণ নিকো পাজের হাতে। ইএসপিএন, বিবিসি
