দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও বিনিয়োগ খাতে স্থবিরতা কাটছে না, বরং শিল্পের সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। শিল্পকারখানার মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে এবং সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের গতিও ধীর। উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তায় নতুন বিনিয়োগের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই-আগস্টে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে ৫০ কোটি ৬৯ লাখ ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭৫ কোটি ৭ লাখ ডলার। ফলে আমদানি কমেছে ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে, একই সময়ে মোট পণ্য আমদানি ব্যয় প্রায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ২২০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে শিল্পকারখানার অন্যান্য মূলধনি পণ্য আমদানি ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ কমে ১০৯ কোটি ৮৫ লাখ ডলারে নেমেছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য মূলধনি পণ্য মিলিয়ে আমদানি ব্যয় হয়েছে ১৬০ কোটি ৫৪ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের প্রায় ২০০ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম।
এই চিত্রের বিপরীতে পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেড়ে ৩২০ কোটি ৮৫ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছিল। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩০৫ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। তবে দীর্ঘমেয়াদি হিসাবে আমদানি এখনো আগের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিচে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতে আমদানি হয়েছিল ৫১৪ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের।
বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিও বিনিয়োগের দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। জুলাইয়ে তা ছিল ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুনে নেমেছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্পকারখানা চালু করা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল করতে গত ২৩ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করে। তবু ঋণপ্রবাহে উল্লেখযোগ্য গতি আসেনি। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে ঋণের চাহিদা বাড়াতে ব্যবসার পরিবেশ ও বাজারে পণ্য-সেবার চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ। বিক্রি, উৎপাদন এবং বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নিতে আগ্রহী হন না। উচ্চ সুদহার ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ এ ক্ষেত্রে আরও বাধা তৈরি করছে।
সরকারি উন্নয়ন ব্যয়েও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে বাস্তবায়নের হার ছিল ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন কমে গেলে অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চারের উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বিনিয়োগের এই দুর্বলতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসেও প্রতিফলিত হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। গত এপ্রিলে সংস্থাটির পূর্বাভাস ছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের মূল্যায়নে, জ্বালানি সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির মন্থরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সীমিত করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা শিল্পকারখানার ব্যয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারের চাহিদাও চাপে রয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়েছিল। পরে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ায় ডলারের সরবরাহে কিছুটা স্বস্তি আসে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতির উন্নতি এখনো উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে প্রত্যাশিত গতি ফেরাতে পারেনি।
সামগ্রিকভাবে, মূলধনি পণ্য আমদানি হ্রাস, ঋণপ্রবাহের দুর্বলতা ও সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতি বিনিয়োগে স্থবিরতার চিত্র তুলে ধরছে। এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে শিল্প সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিনিয়োগের গতি ফেরাতে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো এবং উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
