কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার), ২৩ অক্টোবর: রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পেয়েই মারা গেলেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর ইউনিয়নের ভাদাইর দেউল গ্রামের বীরাঙ্গনা জয়গুন নাহার খানম। বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতনের শিকার এই নারী দীর্ঘদিন বার্ধক্য ও নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ভোর ৬টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
শমশেরনগর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আবু বক্কর সিদ্দিক মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, শুক্রবার বিকেল ৫টায় নামাজের জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে জয়গুন নাহারকে দাফন করা হয়।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর দুটি কিডনিই সম্পূর্ণ বিকল ছিল। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য প্রশাসনের কাছে বহুবার আবেদন-নিবেদন করেও কোনো ফল মেলেনি। স্বীকৃতি না থাকায় সরকারি কোনো সহায়তাও জোটেনি। অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও চালিয়ে নেওয়া যায়নি। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা কিংবা চিকিৎসা, কোনোটিই তাঁর ভাগ্যে জোটেনি।
জয়গুন নাহার ছিলেন মৃত সুবেদার লাল খাঁনের স্ত্রী। মৃত্যুকালে তিনি এক মেয়েকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছিলেন।
তাঁর জীবনের পেছনের গল্প দীর্ঘ ও বেদনার। কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর বাজার-সংলগ্ন ভাদাইর-দেউল গ্রামের সুঞ্জর খানের মেয়ে জয়গুন তখন সবে স্থানীয় রামচিজ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষা দিয়েছেন। শৈশব কাটছিল আনন্দে। দেখতেও ছিলেন সুন্দরী। সেই সময় রাজাকার বাড়ির (বিটি বারী নামে পরিচিত) নেতৃত্বে থমথমে হয়ে ছিল শমশেরনগর। একদিন ভোরবেলা তাঁকে তুলে নেওয়া হয় শমশেরনগর বন্দি শিবিরে।
সেখানে পাকিস্তানি সেনা সুবেদার লালখান, মেজর আজিজ, ক্যাপ্টেন রফিক ও ক্যাপ্টেন দাউদ টানা ছয় মাস তাঁর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালান। পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, কমলগঞ্জের শমশেরনগর সংলগ্ন চাতলাপুর চা বাগান এলাকায় হানাদারদের ক্যাম্পে তিনি এই নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।
যুদ্ধের শেষ দিকে একদিন প্রাণ নিয়ে তিনি ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসেন। কিন্তু ততদিনে তিনি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। পরে নিমসানা আক্তার নামে এক মেয়ের জন্ম দেন।
স্বাধীনতার পর শুরু হয় আরেক লড়াই। নিমসানার বাবার পরিচয় না থাকায় বিপাকে পড়েন জয়গুন। এরপর কুলাউড়ার শরিফপুর ইউনিয়নের লালারচক গ্রামের ভূমিহীন মারুফ আহমদের সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়। যুদ্ধশিশু নিমসানাকে মারুফের পিতৃপরিচয়ে বড় করা হয়। সেই সংসারে জয়গুনের এক ছেলে ও এক মেয়ের জন্ম হয়। স্বামী অকালে মারা যান। সাত-আট বছর আগে একমাত্র ছেলেও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
জীবিত থাকতে জয়গুন নাহার নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ছোট একটি ঘরে আমাকে রাখা হয়েছিল। পাকিস্তানি সেনারা সেই ঘরে আমার ওপর নির্যাতন চালাতো। একটা সময় শুধু রক্ত দেখেছি। মাটিতে পড়ে গেলে ওরা চারজন আমাকে চেপে ধরতো। আমি বাঁচার জন্য চিৎকার করলে একজন বাইরে থেকে কালো আটা জাতীয় রাবার এনে আমার ঠোঁটে-মুখে লাগিয়ে দিতো। এভাবে ছয় মাস সহ্য করেছি।’
তিনি আরও বলেছিলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন আগে সেখান থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হই। সেসময় হানাদার বাহিনীর ধারাবাহিক নির্যাতনের কারণে আমি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যাই। আমরা বাড়ি ফিরে দেখি সবকিছু ধ্বংস। আত্মহত্যার জন্য হাতে ইঁদুর মারার ওষুধ নেই। তখন মা-বাবা বলেন, ‘তুমি একলা নায়। আরও অনেক মেয়ে আছে।’
‘এদিকে মানুষ বলতে থাকে, ‘পেট হইছে’। লজ্জায় ঘরে বসে থাকি। মা বললেন, ‘যদি তুমি মর তবে বেহেশত পাইতায় নায়।’ অবশেষে ফাল্গুন মাসে আমার মেয়ের জন্ম হয়। নাম রাখা হয় নিমসানা আক্তার। এ মেয়ে বড় হতে থাকলে লোকে বলতে থাকে, ‘লালখানের পুড়ি’। তখন কতো মানুষ যে আমাকে ঘৃণা ও অবজ্ঞা করেছে, তা বলে শেষ করা যাবে না।’
জয়গুন নাহার সেদিন এ-ও বলেছিলেন, ‘আমার এখন থাকার মতো একটি ভিটে নেই। অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়ে আছি। এ অবস্থায় হয়তো চলে যাব পরপারে। কিন্তু মরার আগে আমি চাই রাষ্ট্র যেন আমাকে স্বীকৃতি দেয়। সমাজের মানুষ আমাকে যেভাবে ঘৃণা করেছে, তাদের মুখে কালি দিয়ে যেন আত্মতুষ্টি নিয়ে মরতে পারি।’
বীরাঙ্গনাদের নিয়ে গবেষণা করা মৌলভীবাজার টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের ইন্সট্রাক্টর দীপঙ্কর মোহান্ত বলেন, জয়গুন নাহার খানমের জীবনী সবার আড়ালেই ছিল। নানা বঞ্চনার বিরুদ্ধে তিনি লড়াই করে গেছেন। তিনি জানান, জীবিত থাকাবস্থায় বহু কষ্টে তাঁর কাছে গিয়ে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে পিটিআইয়ের একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। দীপঙ্কর মোহান্ত বলেন, ‘আমি আশা করেছিলাম রাষ্ট্র তাঁকে স্বীকৃতি দিয়ে পরবর্তী জীবনে গর্ব করে বাঁচার অধিকার দেবে। কিন্তু বীরাঙ্গনার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আগেই তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভে গেল।’
স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা নির্মল কুমার দাস বলেন, জয়গুন নাহার খানম শুধু একজন নারী নন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের স্মৃতি সবার কাছে অম্লান হয়ে থাকবে। তিনি জানান, শেষ জীবনে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে জয়গুন শয্যাশায়ী ছিলেন। শেষ দিন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন তিনি। নির্মল কুমার দাস বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও এই বীরাঙ্গনা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পেয়ে একপ্রকার বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ায় তাঁরা গভীরভাবে ব্যথিত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সন্দ্বীপ তালুকদার বলেন, শমশেরনগর ইউনিয়নের ভাদাইর দেউল গ্রামের জয়গুন নাহার খানমের বীরাঙ্গনা হিসেবে স্বীকৃতির আবেদনের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জয়গুন নাহারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন।
জয়গুন নাহারের মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি হিসেবে দেখছেন না স্থানীয়রা। একজন বীরাঙ্গনা চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছেন, এ নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের দায় কোথায়, সেই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ নিয়ে যত আলোচনাই হোক, সেই ইতিহাসের একজন জীবন্ত সাক্ষী বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন, এই বাস্তবতা অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর। স্থানীয়রা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন, বিষয়টি দ্রুত যাচাই করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কাগজপত্রের জটিলতা কিংবা অর্থের অভাবে যেন আর কোনো বীরাঙ্গনার জীবন এভাবে নিভে না যায়, এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।

