সাতক্ষীরার তালা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. মিজানুর রহমানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সাংবাদিকদের নিয়ে দেওয়া একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সরকারি দায়িত্বশীল পদে থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশ্য করে ঢালাও ও অবমাননাকর মন্তব্য করার প্রতিবাদে সংবাদকর্মীসহ স্থানীয় সুশীল সমাজ ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে ডা. মিজানুর রহমান তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, আমার মনে হয় কেয়ামতের ময়দান থেকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে যাবে মিডিয়া কর্মী।
একজন প্রথম শ্রেণির সরকারি গেজেটেড কর্মকর্তার আইডি থেকে গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে এমন বিতর্কিত পোস্ট প্রকাশের পরপরই তা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদকর্মী ও সাধারণ ব্যবহারকারীরা পোস্টটির তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং অনতিব্লিমে তা শেয়ার করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। চারদিকে তীব্র সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় উঠলে পরবর্তীতে তিনি পোস্টটি তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মুছে ফেলেন।
পরদিন বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুর আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে ডা. মিজানুর রহমান তার ফেসবুকে একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, “কেয়ামতের ময়দান থেকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে যাবে কে, একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। আমার দেওয়া পোস্ট এক্সপ্লেইন করলাম। আমার পোস্টে কোনো মিডিয়াকর্মী কষ্ট পেলে আমি দুঃখিত।” তবে এই দুঃখপ্রকাশ বা ব্যাখ্যাকরণকে ‘দায়সারা’ উল্লেখ করে সাংবাদিকদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ আরও বৃদ্ধি পায়।
ঘটনার প্রেক্ষিতে স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ ও সামাজিক সংগঠনের শীর্ষ নেতারা কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তালা প্রেসক্লাবের দপ্তর সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বলেন, একজন দায়িত্বশীল চিকিৎসক এবং সরকারি প্রশাসনিক কর্মকর্তার কাছ থেকে সাংবাদিক সমাজকে নিয়ে এমন অসংবেদনশীল, নীতিবহির্ভূত ও আপত্তিকর মন্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি পেশাগত কাঠামোর তোয়াক্কা না করে সমগ্র গণমাধ্যমকে হেয় প্রতিপন্ন করেছেন। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং অনতিবিলম্বে সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
সাংবাদিক শাহিনুর ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ডা. মিজানুর রহমান তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পর থেকেই বিভিন্ন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় জড়িয়ে পড়েন। দায়িত্ব পালনের চেয়ে সামাজিক মাধ্যমে টিকটক ও ব্যক্তিগত কন্টেন্ট তৈরিতেই তিনি বেশি ব্যস্ত থাকেন বলে স্থানীয় অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া হাসপাতাল পরিচালনায় কমিশন বাণিজ্য, সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ায় অতিরিক্ত টাকা আদায় এবং ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার চরম বিশৃঙ্খলা নিয়ে ইতিপূর্বে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। নতুন করে সংবাদ প্রকাশের আশঙ্কাতেই তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে এ ধরনের অশালীন মন্তব্য ছড়িয়েছেন।
স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ মন্তব্য করেছেন করেন, সরকারি কর্মচারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারসংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের স্পষ্ট নির্দেশিকা ও সরকারি চাকরি বিধিমালা রয়েছে। একজন গেজেটেড কর্মকর্তার সামাজিক মাধ্যমে বাকসংযম ও পেশাদারিত্ব বজায় না রাখা সরকারি শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুস্পষ্ট শামিল।
এ বিষয়টি নিয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা তালা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পোস্টের কথা স্বীকার করলেও তা স্থানীয় উদ্দেশে নয় বলে দাবি করেন।
তিনি বলেন, আমার পোস্টটি তালার বা স্থানীয় কোনো সংবাদকর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া হয়নি। আমি একটি সাধারণ ধারণা থেকে কথাটি লিখেছিলাম, পরে বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হওয়ায় স্ট্যাটাসটি সরিয়ে দুঃখপ্রকাশ করে ব্যাখ্যা দিয়েছি।
এদিকে হাসপাতালের প্রশাসনিক অনিয়ম, টিকটক করা ও অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ায় অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, আমার বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অনিয়মের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সামগ্রিক সার্বিক পরিস্থিতি ও সাংবাদিকদের ক্ষোভের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. মো. আব্দুস সালাম বলেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একজন দায়িত্বশীল সরকারি চিকিৎসকের কাছ থেকে সাংবাদিকদের নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের বিতর্কিত মন্তব্য কোনোভাবেই কাম্য বা সমর্থনযোগ্য নয়। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছি। পুরো ঘটনার বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে, দায়িত্বশীল পদে থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিষ্টাচার ও বাকসংযম বজায় রাখার তাগিদ দিয়ে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠনপূর্বক ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক কত পেট নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাংবাদিক সমাজ।
