যিনি বলেছিলেন, ‘সত্য বল সুপথে চল, ওরে আমার মন’; গানের সুরে যিনি বলে গেছেন মানুষ ও মানবতার কথা, আজ (১৭ অক্টোবর) সেই কালজয়ী ব্যক্তিত্ব ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস। জাত-ধর্মের বিভেদ পেরিয়ে মানবতার জয়গান গেয়েছিলেন লালন। তার গান ও দর্শনের মধ্য দিয়ে মানুষকে শিখিয়েছেন আত্ম-অনুসন্ধান ও অসাম্প্রদায়িকতার পাঠ।
উপমহাদেশের সংগীত ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদান রাখা এই সাধককে তার তিরোধান দিবসে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছেন অগণিত ভক্ত ও অনুরাগী। লালনের জীবনদর্শন, সংগীতের মর্মার্থ ও বাউল ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ঢাকা পোস্টের বিশেষ আয়োজনে কথা বলেছেন বাউল ও লালনসংগীতশিল্পী শফি মণ্ডল…
আরও পড়ুন
লালনকে তো সরাসরি দেখিনি। বাউল গানের প্রতি আমার পরিচয় মূলত লালনের বাণীর টানে এবং তার বাণীকে ধারণ করার মধ্য দিয়ে। প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছর আগে, কিংবা তারও বেশি সময় ধরে, এই বাণীর পথ ধরে চর্চা করে আসছি। আমি লালনের গানগুলো এককভাবেই নিজের মতো করে পরিবেশন করি। পরবর্তী সময়ে আমার গুরু প্রয়াত সুলতান খতি সাহেবের সান্নিধ্যে সময় কাটিয়েছি এবং তার কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছি। মূলত লালনের ভাবদর্শন গানে গানে বলা হয়েছে। তাই গানের মধ্য দিয়েই তা বোঝার ও চর্চা করার চেষ্টা করি।
গুরুর নির্দেশে ফকিরি দীক্ষা নিয়ে মনে-প্রাণে জীবনের সব কামনা-বাসনা ত্যাগ করে এই পথ ও সাদা পোশাক গ্রহণ করেছি।
লালনের গান শিখতে শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে অনুধাবন করি, বাকি জীবনটা লালনের পথ ও মতের পেছনেই কাটিয়ে দেব। গুরুর নির্দেশে ফকিরি দীক্ষা নিয়ে মনে-প্রাণে জীবনের সব কামনা-বাসনা ত্যাগ করে এই পথ ও সাদা পোশাক গ্রহণ করেছি। ফকিরি জীবনের সব নিয়মকানুন মেনেই প্রায় ৪০ বছর ধরে এই পথে আছি।
বিদেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান করতে গেলে দর্শকদের প্রায় ৮০ শতাংশই থাকেন প্রবাসী বাংলাদেশি, আর ২০ শতাংশ বিদেশি। নব্বইয়ের দশকে প্রবাসীদের কাছে গানের মর্মার্থ বোঝানো কিছুটা কঠিন ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তির সহায়তায় যে কোনো ভাষার মানুষই অনুবাদ করে লালনের বাণী সহজে বুঝতে পারছেন। বিশেষ করে আমেরিকান ও ব্রিটিশ গবেষক এবং দার্শনিকেরা লালনের সততা ও মানবদর্শনের বাণী বুঝতে পেরে তা মনে-প্রাণে গ্রহণ করছেন। তারা অন্য দার্শনিকদের সঙ্গে লালনের দর্শনের তুলনা করে গবেষণা করছেন, লেখালেখিও করছেন।
লালন ফকির কোনো ধর্মকে খাটো না করে সহজ ও সংক্ষেপে মানবসত্যের কথা বলেছেন। তিনি একজন সুন্দর মানুষ খোঁজার কথা বলেছেন, যার কাছে নিজেকে সমর্পণ করা যায়; কারণ, মানুষই সর্বশ্রেষ্ঠ।
আমাদের প্রজন্মের বাউলদের হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কম ছিল। কিন্তু বর্তমান তরুণ প্রজন্ম বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ফোকলোরের পাঠ্যক্রম থেকে শিখে এসে লালনচর্চা করছে। তারা বিষয়টিকে উচ্চমার্গে অনুধাবন করতে পারছে। লালন ফকির কোনো ধর্মকে খাটো না করে সহজ ও সংক্ষেপে মানবসত্যের কথা বলেছেন। তিনি একজন সুন্দর মানুষ খোঁজার কথা বলেছেন, যার কাছে নিজেকে সমর্পণ করা যায়; কারণ, মানুষই সর্বশ্রেষ্ঠ। তরুণেরা লালনের এই বাণী বুঝে বিশ্বদরবারে তাকে আরও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করবে বলে আমার বিশ্বাস।
তিরোধান দিবস উপলক্ষে আমার আলাদাভাবে কোনো পরিকল্পনা থাকে না। কারণ, সব সময়ই লালনকে নিয়েই কাজ করি। গত বছর তিরোধান দিবসে যুক্তরাষ্ট্রে ছিলাম। এবার কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া ধামে গিয়ে লালনের প্রতি ভক্তি নিবেদন করব। সেখান থেকে ফিরে গণমাধ্যমে লালনের গান ও ভাবাদর্শ নিয়ে আলোচনা করব।
ডিএ/কেআই
