প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকা করে স্কিম ছিল মোট তিনটি। এর মধ্যে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট স্কিমে আরো ২ হাজার কোটি বাড়িয়ে ৭ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।
দেশের বন্ধ কলকারখানা চালু, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এর পাঁচ মাস পরও এ তহবিলের প্রায় ৭৭ শতাংশ অর্থ অব্যবহৃত রয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ১৫টি স্কিমের মধ্যে নয়টিতে ১১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা ছাড় হলেও বাকি ছয়টিতে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ বিতরণ করা সম্ভব হয়নি।
ব্যাংক ও ব্যবসাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে উদ্যোক্তাদের মাঝে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের পর্যাপ্ত সরবরাহের অভাবে একদিকে অনেক শিল্প-কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না, অন্যদিকে বহু প্রতিষ্ঠান অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। উপরন্তু চাঁদাবাজি, অনিয়ম-দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক জটিলতা ব্যবসা পরিচালনার সার্বিক ব্যয়ও বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ এ স্থবিরতার সঙ্গে যোগ হয়েছে বৈশ্বিক সংকট। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ায় রফতানি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন তহবিল গঠন করলেও একদিকে উদ্যোক্তারা প্রতিকূল পরিস্থিতে বিনিয়োগের সাহস করছেন না, অন্যদিকে ব্যাংকাররাও প্রণোদনার জটিল প্রক্রিয়া ও স্থবির অর্থনীতির কারণে ঝুঁকি নিয়ে ঋণ বিতরণে উৎসাহ পাচ্ছেন না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ১৫টি স্কিমের মধ্যে সবচেয়ে বড় বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত সহায়ক প্রাক অর্থায়ন স্কিম। ২০ হাজার কোটি টাকার এ স্কিমে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ছাড় হয়েছে ৫৬০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। বিগত পাঁচ মাসে এ স্কিম থেকে উদ্যোক্তারা বরাদ্দ পেয়েছেন ৩ শতাংশেরও কম। যদিও আরো ৯২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা ছাড়ের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম—কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ স্কিম। এতে বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার কোটি টাকা। যদিও এখন পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ২৯৩ কোটি টাকা। বর্তমানে এ স্কিমের প্রক্রিয়াধীন তালিকাতেও অর্থ ছাড়ের কোনো তথ্য নেই।
প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকা করে স্কিম ছিল মোট তিনটি। এর মধ্যে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট স্কিমে আরো ২ হাজার কোটি বাড়িয়ে ৭ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। অন্যদিকে বাজেটে বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল সৃজনশীল অর্থনীতি। এ-সংক্রান্ত স্কিমের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। ১৫টি স্কিমের মধ্যে শুধু এ-দুটি স্কিমের আওতায় বরাদ্দকৃত অর্থই প্রায় পুরোপুরি ছাড় হয়েছে।
এদিকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতে উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে ছাড় হয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। আর সিএমএসএমই খাতে চলতি মূলধন সরবরাহ স্কিমে প্রায় ৯০৮ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। উভয় স্কিমেই প্রক্রিয়াধীন তালিকায় অর্থছাড়ের পরিমাণ শূন্য।
অর্থনৈতিকভাবে দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল উত্তরবঙ্গ। কৃষিনির্ভর এ এলাকায় কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র সৃষ্টির লক্ষ্যে ৩ হাজার কোটি টাকার স্কিম গঠন করা হয়। এখন পর্যন্ত এ তহবিল থেকে বিতরণ হয়েছে মাত্র ৪৯ কোটি টাকা। অর্থছাড়ের প্রক্রিয়াধীন তালিকাও শূন্য। এছাড়া বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ১ হাজার কোটি টাকার স্কিম থেকে ২০০ কোটি এবং স্টার্ট-আপ খাতে ৫০০ কোটি টাকার স্কিম থেকে ৩৩ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে।
এর বাইরে বাকি ছয়টি স্কিমের ১ টাকাও ছাড় করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে ২ হাজার কোটি টাকার চামড়াজাত পণ্য রফতানিমুখী স্কিম, ১ হাজার কোটি টাকার সবুজ কারখানা ও শিল্প স্কিম এবং বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি স্কিম। এ তিনটি স্কিমে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। এসব স্কিমে যথাক্রমে ৯৮ কোটি, ৫২৭ কোটি ও ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়ের বিষয় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এসবের বাইরে আরো তিনটি স্কিমে কোনো অর্থ বিতরণ বা প্রক্রিয়াধীন তালিকাতেও নেই। স্কিমগুলো হলো ৩ হাজার কোটি টাকার রফতানি বহুমুখীকরণ খাত, ২ হাজার কোটি টাকার হিমায়িত চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ রফতানিমুখী খাত এবং ১ হাজার কোটি টাকার গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়ন স্কিম। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত বিতরণকৃণ অর্থের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকায়। আর অর্থছাড়ের প্রক্রিয়াধীন তালিকায় আছে আরো ২ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। প্রক্রিয়াধীন ও বিতরণকৃত অর্থ মিলিয়ে এ সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৪ হাজার ৫২০ কোটি টাকায়, যা মোট বরাদ্দকৃত অর্থের ২৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। প্রণোদনা প্যাকেজের বাকি প্রায় ৭৭ শতাংশ অর্থ এখনো অলস পড়ে আছে।
যদিও প্রণোদনা প্যাকেজ আরো কার্যকরভাবে ব্যবহার হওয়ার বিষয়ে আশাবাদী বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য সংকটসহ বেশকিছু কারণে দেশের অর্থনীতি কিছুটা কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকার এসব বিষয় কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। আশা করছি, প্রণোদনা প্যাকেজের পুরো তহবিলের ব্যবহার হলে দেশজুড়ে কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।’
