কিম্বার্লি গিলফয়েলের বিদায়ের ঘটনাটি ছিল বেশ চমকপ্রদ। চলতি সপ্তাহ পর্যন্ত তিনি গ্রিসে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। হোয়াইট হাউসের নতুন প্রেস সেক্রেটারির প্রথম সংবাদ সম্মেলন সরাসরি সম্প্রচারকালে তার বিদায়ের ঘোষণা দেওয়া হয়।
তবে গিলফয়েলের এই বাধ্যতামূলক পদত্যাগ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের একটি বৃহত্তর ব্যবস্থারই অংশ। এ সময়ে প্রশাসন ছেড়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অধিকাংশই নারী—তারা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করুন বা তাদের সরিয়ে দেওয়া হোক।
বিজ্ঞাপন
চলতি বছর শীর্ষপদ থেকে বিদায় নেওয়া সর্বশেষ নারী গিলফয়েল। এর আগে মাত্র তিন মাসের মধ্যে ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার মর্যাদাসম্পন্ন আট নারী কর্মকর্তার মধ্যে চারজন পদত্যাগ করেন অথবা বরখাস্ত হন। তারা হলেন- অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি, শ্রমমন্ত্রী লরি শাভেজ-দেরেমার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টি এল. নোয়েম এবং জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড। তাদের প্রত্যেকের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন পুরুষ কর্মকর্তা।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়োগের অনুমোদন নিয়ে ভোটাভুটির আগে নিজের এক লাখ ডলারের আমেরিকান এক্সপ্রেস বিল পরিশোধ করতে এক দাতাকে অনুরোধ করেছিলেন গিলফয়েল। এরপর তাকে পদত্যাগ করতে বলা হয়। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গত মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, গিলফয়েল ‘ভালো কাজ করলেও’ প্রতিবেদনে যা পড়েছেন তা তার ‘পছন্দ হয়নি’।
গিলফয়েল ট্রাম্পের অন্যতম একনিষ্ঠ সমর্থক। একসময় তার বড় ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের সঙ্গে গিলফয়েলের বাগ্দানও হয়েছিল। তা সত্ত্বেও গিলফয়েলের সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি এড়িয়ে যান ট্রাম্প। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘তিনি আমার পরিবারের সদস্য ছিলেন না।’ এরপর যোগ করেন, ‘আমার মনে হয়, অনেক আগে তিনি আমার ছেলের সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন।’
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলয়ে থাকা নারী কর্মকর্তারা পুরুষদের তুলনায় বেশি বিতর্কে জড়ান—এমন কোনো চিত্র নেই। বরং তার মনোনীত পুরুষ কর্মকর্তারাও বারবার সমালোচনা ও তাদের অপসারণের দাবির মুখে পড়েছেন।
এফবিআইয়ের পরিচালক কাশ প্যাটেলকে তার আচরণ নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত মদ্যপান, বান্ধবীর নিরাপত্তায় সোয়াট দল নিয়োগ এবং ব্যক্তিগত কাজে সরকারি বিমান ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের নামও বিচার বিভাগের প্রকাশ করা নথিতে উঠে এসেছে। যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের মালিকানাধীন ব্যক্তিগত দ্বীপে যারা গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে লুটনিকের নাম রয়েছে। অন্যদিকে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ একটি ব্যক্তিগত বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপে কথোপকথনের সময় গোপন যুদ্ধপরিকল্পনা প্রকাশ করে ফেলেছিলেন। ওই কথোপকথনে অনিচ্ছাকৃতভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন দ্য আটলান্টিক সাময়িকীর সম্পাদক জেফরি গোল্ডবার্গ।
ওই ঘটনার পর ট্রাম্প একজন পুরুষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজ, যিনি ওই কথোপকথনে সাংবাদিককে যুক্ত করেছিলেন। তবে ওয়াল্টজের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা খুব কঠোর ছিল না। তাকে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ ট্রাম্প এ পদে কংগ্রেসে তার দীর্ঘদিনের নারী মিত্র এলিস স্টেফানিককে নিয়োগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ।
নিজেকে ‘আল্ট্রা মাগা’ যোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দেওয়া স্টেফানিক শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে দিশাহারা হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তিনি কংগ্রেস থেকেও পদত্যাগ করেন।
প্রেসিডেন্টের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রশাসনের শীর্ষ পদ থেকে একই লিঙ্গের এতজনের বিদায় নেওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক।
রিগ্যানের আমল থেকে মার্কিন প্রশাসনে বৈচিত্র্যের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে আসছেন ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের অনাবাসিক ফেলো ক্যাথরিন ডান টেনপাস। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো এমন পরিস্থিতি দেখিনি, যেখানে মন্ত্রিসভা থেকে প্রথম দফায় বিদায় নেওয়া সবাই একই লিঙ্গের—সবাই নারী।’
শীর্ষ পর্যায়ে নারী
২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ের পর ট্রাম্প যখন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিচ্ছিলেন, তখন তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারীও ছিলেন। তিনি সুসি ওয়াইলসকে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ নিয়োগ করেন। মন্ত্রিসভার মর্যাদাসম্পন্ন এই গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনিই প্রথম নারী। ক্যারোলিন লেভিটও ছিলেন হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি পদে দায়িত্ব পালন করা সবচেয়ে কম বয়সী ব্যক্তি। দুই ছোট সন্তানের লালন-পালনের জন্য গত আগস্টে তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেন। তার স্থলাভিষিক্ত হন আরেক নারী কেটি জাকারিয়া।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদনের বিষয়ে এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রশাসন গঠন করেছেন। তার অসাধারণ দলের প্রত্যেক সদস্যকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বিষয়কেই মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে—তারা মার্কিন জনগণের জন্য কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিতে আচ্ছন্ন ডেমোক্র্যাটদের মতো নন প্রেসিডেন্ট। তিনি মানুষের অপরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে নয়, বরং যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করেন।’
গত বছর নারী ইতিহাস মাস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশের ইতিহাসে রিপাবলিকান দলের কোনো প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভার তুলনায় আমার মন্ত্রিসভায় নারীর সংখ্যা বেশি।’
এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই। বর্তমানে মন্ত্রিসভার মর্যাদাসম্পন্ন পদগুলোতে মাত্র চারজন নারী দায়িত্বে রয়েছেন।
অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসন ছেড়ে যাওয়া নারী কর্মকর্তারা ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি বলে মনে হয়েছে।
এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশের বিষয়টি সামাল দেওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায় পাম বন্ডি সমালোচনার মুখে পড়েন। কংগ্রেসের শুনানি ও টেলিভিশনেও তার ভূমিকা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না ট্রাম্প।
কংগ্রেসে দেওয়া সাক্ষ্যও ক্রিস্টি নোয়েমকে বরখাস্ত করার পেছনে অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। বিশেষ করে, ট্রাম্পের অনুমোদনে সরকারের কয়েক কোটি ডলারের বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছিল বলে তার দেওয়া বক্তব্যটি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওই বিজ্ঞাপনগুলোতে নোয়েমকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। তবে নোয়েমের এই বক্তব্য অস্বীকার করেন ট্রাম্প।
তুলসি গ্যাবার্ড অসুস্থ স্বামীর দেখাশোনার জন্য পদত্যাগ করলেও তার এ ঘোষণা এমন এক সময়ে আসে, যখন হোয়াইট হাউসের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছিল। এর আগে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আসন্ন হুমকি তৈরি করেছিল—ট্রাম্পের এমন দাবির পক্ষে কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন তিনি। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর যৌক্তিকতা তুলে ধরতে ট্রাম্প ওই দাবি করেছিলেন। এ বিষয়ে গ্যাবার্ডের অবস্থান নিজের তুলনায় ‘অনেক বেশি নমনীয়’ বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প।
লরি শাভেজ-দেরেমার পদত্যাগ করেন একাধিক অভিযোগের জেরে সৃষ্ট বিতর্কের মধ্যে। অভিযোগ ছিল, তার দপ্তরে বিষাক্ত কর্মপরিবেশ ও চরম অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছিল। এ ছাড়া এক কর্মীর সঙ্গে অনুচিত সম্পর্কে জড়ানো এবং ব্যক্তিগত কাজে সরকারি অর্থ ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলেও অভিযোগ ওঠে।
তবে নারী মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিদায়ে ট্রাম্পের কট্টর সমালোচকদের কেউ কেউ সন্তোষ প্রকাশ করলেও বিষয়টিতে স্পষ্ট দ্বৈত মানদণ্ড দেখেছেন বলে সমালোচনা করেছেন।
পাম বন্ডি ও ক্রিস্টি নোয়েমের বিদায়ের পর প্রেসিডেন্টের পরবর্তী লক্ষ্য কে হতে পারেন—এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ বলেন, ‘তাহলে কি তার কাছে আর কোনো নারী নেই?’ তিনি আরও বলেন, ‘ট্রাম্পকে দেখে মনে হয়, নারী মন্ত্রীদের বরখাস্ত করার সামর্থ্যই শুধু তার আছে।’
টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জেসমিন ক্রকেটও পিট হেগসেথকে পরবর্তী বিদায়ী কর্মকর্তা হিসেবে দেখতে চান বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন। প্রেসিডেন্টের বিদ্রূপের নিয়মিত লক্ষ্যবস্তু এই আইনপ্রণেতা ট্রাম্পের আচরণ প্রসঙ্গে লেখেন, ‘আমি একটা ধরন দেখতে পাচ্ছি। অযোগ্য নারীদের তিনি অযোগ্য পুরুষদের তুলনায় অনেক দ্রুতই বিপাকে ফেলে দেন।’
গত এপ্রিলে কংগ্রেসের এক শুনানিতে পেনসিলভানিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি মেডেলিন ডিন নারী-পুরুষের এই দ্বিমুখী নীতি নিয়ে বাণিজ্য সচিব লুটনিককে তুলাধোনা করেন এবং যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের প্রসঙ্গটি টেনে আনেন।
ডিন জানতে চান, ‘এপস্টিনের সঙ্গে আপনার যে সম্পর্ক ছিল, তা এখনো অব্যাহত থাকায় প্রেসিডেন্ট কি উদ্বিগ্ন?’ জবাবে লুটনিক বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার যেসব কথোপকথন হয়, সেগুলো নিয়ে আমি আলোচনা করব না।’
এরপর ডিন বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এরই মধ্যে মন্ত্রিসভার তিনজন সদস্যকে বরখাস্ত করেছেন—তিনজনই নারী। জেফরি এপস্টিনকে যারা সহযোগিতা করেছেন, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যদি সামান্যতম উদ্বেগও থাকে, তাহলে আপনাকেও বরখাস্ত করা উচিত।’
ইন্ডিপেনডেন্ট উইমেনস ল সেন্টারের পরিচালক মে মেইলম্যান অবশ্য বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে অনেক প্রভাবশালী নারী দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ট্রাম্পের দুই মেয়াদেই হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি সুসি ওয়াইলসের পাশাপাশি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) প্রধান হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এরিকা শোয়ার্টজ এবং বিচার বিভাগের নাগরিক অধিকার বিভাগের প্রধান হারমিত ধিলনের কথা উল্লেখ করেন।
মেইলম্যান বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনে কনজার্ভেটিভ নারীদের নিঃসঙ্গতা নেই, বরং এখানে তাদের ক্ষমতায়ন হচ্ছে। নারী হিসেবে নয়, নিজের যোগ্যতায়ই আপনি দলের অপরিহার্য সদস্য।’
