আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিজয়া দশমীর শেষে ঘরের মেয়ে উমা ফিরেছে কৈলাসে। এবার আরও এক বছরের অপেক্ষা, তারপর ঘরের মেয়ে ফের ফিরবে ঘরে। বাঙালি ফের একবার আনন্দে মেতে উঠবে। প্রত্যেক বছর দুর্গাপুজোর শেষে বাঙালির মনে যে শূন্যতা নেমে আসে তা প্রায় সর্বজনীন। শহর-মহানগর থেকে গ্রাম-গঞ্জ সব জায়গাতেই এক ধরনের বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায় মুর্শিদাবাদ জেলার সুতি ও রঘুনাথগঞ্জ থানা এলাকার কয়েকটি গ্রামে। এই সমস্ত গ্রামের বাসিন্দারা দুর্গা পুজো শেষের পরই নিজেদের 'প্রকৃত উৎসবের' প্রতীক্ষায় থাকেন। কারণ এই গ্রামগুলির প্রধান আনন্দ উৎসব হল লক্ষ্মীপূজো।
মুর্শিদাবাদের আহিরণ, জামুয়ার, আমুহা-কদমতলা-সহ আরও কয়েকটি গ্রামে লক্ষ্মীপুজো কেবল ধর্মীয় একটি অনুষ্ঠান নয় বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। এই সমস্ত গ্রামগুলিতে দুর্গাপুজো যতটা গুরুত্ব পায় তার থেকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় লক্ষ্মী আরাধনায়। কৃষি প্রধান এই গ্রামগুলিতে লক্ষ্মীকে ধন-সম্পদ ও সমৃদ্ধির দেবী হিসেবে পুজো করা হয়।
গ্রামের যে সমস্ত বাসিন্দা কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন লক্ষ্মী পুজোর সময় তাঁরা সবাই বাড়িতে একত্রিত হন। গোটা গ্রাম সাজিয়ে তোলা হয় বিভিন্ন ধরনের আলোর মালায়।
আহিরণের বাসিন্দা তথা এলাকার বিশিষ্ট সমাজসেবী সুভাষ লালা বলেন, 'আহিরণ গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত আহিরণ গ্রামে বাবুদের লক্ষী পুজো শতাধিক বছরের পুরনো। এর পাশাপাশি এই এলাকার জঙ্গলপাড়া, বিবেকানন্দ ক্লাব এবং ব্লক হাসপাতালের কাছেও বেশ বড় করে কয়েকটি লক্ষ্মী পুজোর আয়োজন করা হয়।'
তিনি জানান, 'জলঙ্গপাড়া এলাকায় কমপক্ষে পাঁচটি বড় লক্ষীপুজো হয়। লক্ষ্মীপুজোর দিনগুলোতে সেখানে প্রচুর মানুষ ভিড় জমান দেবী প্রতিমা এবং মণ্ডব দর্শন করার জন্য। এই জনসমাগম দুর্গাপুজোর ভিড়কেও ছাপিয়ে যায়।'
এর পাশাপাশি রঘুনাথগঞ্জের জামুয়ার অঞ্চলের মন্ডলপুর, পালপাড়া, কালিতলাপাড়া এলাকায় বেশ কয়েকটি লক্ষ্মীপুজো বড় করে আয়োজন করা হয়। গ্রামের কয়েকটি প্রতিমা উচ্চতায় প্রায় ১২ -১৫ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। কালীতলাপাড়া লক্ষ্মীপুজো কমিটির সভাপতি চন্দ্রলাল পাল বলেন, 'আমাদের এই গ্রামগুলো শহর থেকে অনেকটা দূরে। তার ফলে এলাকার মানুষের পক্ষে দুর্গা পুজোর সময় রোজ শহর বা গ্রামের বড় পুজোতে গিয়ে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয় না। তাই আমাদের কাছে লক্ষ্মীপুজোটাই বেশি গুরুত্ব পায়।'
আজ থেকে প্রায় ২৮ বছর আগে কালিতলাপাড়া লক্ষ্মীপুজো কমিটি প্রথম বড় আকারে এলাকায় পুজো করে সকলকে চমকে দিয়েছিল। চন্দ্রলাল পাল বলেন, 'এই এলাকার বেশিরভাগ মানুষ পেশায় কৃষিজীবী। দেবী লক্ষ্মী ধনের দেবী। এলাকার মানুষ মনে করেন ভাল ধান উৎপাদন দেবীর কৃপা ছাড়া সম্ভব নয়। তাই ধনের এবং সমৃদ্ধির দেবী, লক্ষীর পুজো করার জন্যই এলাকার মানুষ সারা বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন।'
তিনি আরও বলেন, 'এলাকার বেশিরভাগ মানুষ কৃষিজীবী হওয়ার কারণে তাঁদের সকলের পক্ষে দুর্গা পুজোর মতো উৎসবে প্রচুর টাকা খরচ করা সম্ভব হয় না। তাই এলাকার মানুষ খরচ কমাতে লক্ষীপুজোর সময় বেশি আনন্দ করে থাকেন।'
বিজেপির ওবিসি মোর্চার রাজ্য সভাপতি তথা আহিরণের বাসিন্দা ধনঞ্জয় ঘোষ বলেন, 'এই এলাকায় আগে ১ টা দুর্গাপুজো হতো, এখন ৩ টে হয়। তবে এখানে পাড়ায় পাড়ায় অনেক লক্ষীপুজো হয়। এবং সেগুলোর জাঁকজমক দিন দিন বেড়ে চলেছে।'
লক্ষ্মীপুজো কমিটির কয়েকজন আয়োজক বলেন, দুর্গাপুজোর সময় তাঁরা লক্ষ্মী প্রতিমা নির্মাণের বায়না শিল্পীকে দিয়ে দেন কারণ দুর্গাপুজো শেষের পর প্রতিমা নির্মাণ করার জন্য হাতে খুব অল্প সময় থাকে। প্রতিমা শিল্পী দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ করার সঙ্গে সঙ্গে ১২ -১৪ ফুটের বড় আকারের লক্ষ্মী প্রতিমাও নির্মাণ করতে থাকেন। পুজো উদ্যোক্তারা আরও জানিয়েছেন, গ্রামগুলোতে লক্ষ্মী পুজোর জাঁকজমকের কথা ছড়িয়ে পড়ায় এখন স্পনসরের অভাব হচ্ছে না। এলাকার বিশিষ্ট শিল্পপতিরা জামুয়ার , আহিরণ সহ আরও কয়েকটি গ্রামে লক্ষ্মীপুজো স্পনসর করার জন্য এগিয়ে আসছেন।
এছাড়াও লক্ষ্মীপুজোর জাঁকজমক বৃদ্ধির জন্য কয়েকটি পুজো কমিটি বর্তমানে অন্য জেলা থেকে আলোকসজ্জা নিয়ে আসছেন। লক্ষ্মীপুজোর শেষে এখানে আরো দু-তিন দিন বিভিন্ন মন্ডপে প্রতিমা রেখে দেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, বাঙালির জীবনে দুর্গাপুজো আবেগ অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। কিন্তু মুর্শিদাবাদের এই গ্রামগুলি দেখিয়ে দেয় উৎসবের রূপ স্থানভেদে ভিন্ন হতে পারে। সুতি ও রঘুনাথগঞ্জ থানা এলাকায় হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মিশ্র জনবসতি রয়েছে কিন্তু লক্ষ্মীপুজোর সময় এক অদ্ভুত সামাজিক সম্প্রীতি দেখা যায় এখানে। সমস্ত ধর্ম সম্প্রদায়ের লোক এখানে লক্ষ্মীপুজোর আনন্দে মেতে ওঠেন এবং সামাজিক বন্ধন আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
https://www.youtube.com/watch?v=JwFdq_tA9cE
