জীববিজ্ঞানে ‘পার্থেনোজেনেসিস’ (Parthenogenesis) নামে একটি প্রক্রিয়া রয়েছে, যার সহজ অর্থ হলো—সঙ্গী বা পুরুষ প্রাণীর সাহায্য ছাড়াই সন্তান জন্ম দেওয়া। গ্রিক ভাষায় এর অর্থ ‘কুমারী জন্ম।’ এই প্রক্রিয়ায় অনিষিক্ত ডিম্বাণু সরাসরি ভ্রূণে পরিণত হয়। কিছু কিছু উদ্ভিদ ও অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে এটি দেখা যায়।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। এটি জৈবিকভাবে ‘জীবিত’ নয় এবং এর কোনো সঙ্গীও নেই। তাই স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এর নিজে থেকে সন্তান তৈরি করা বা নিজের প্রতিলিপি (অনুলিপি) তৈরি করার কোনো সুযোগ থাকার কথা নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই পরিস্থিতি এখন বদলে যেতে পারে।
এআই গবেষণার শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক সম্প্রতি সতর্ক করেছে যে, তাদের এআই মডেলগুলো খুব শিগগিরই ডেটা সেন্টারের সাহায্য ছাড়াই নিজের অনুলিপি তৈরি করতে সক্ষম হতে পারে। এর অর্থ হলো, কোনো মানুষের সাহায্য ছাড়াই একটি এআই মডেল নিজে থেকেই এক কম্পিউটার, সার্ভার বা ইন্টারনেটযুক্ত যন্ত্র থেকে অন্য যন্ত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারবে—যা অনেকটা কম্পিউটার ‘ওয়ার্ম’ বা ভাইরাসের মতো কাজ করবে।
অ্যানথ্রপিকের গবেষক উইলিয়াম ঝু এবং ড্যানিয়েল ফ্রিম্যান এক ব্লগে লিখেছেন, ‘আমাদের গবেষণা বলছে যে, ছোট আকারের এআই মডেলগুলো হয়তো আর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই বাণিজ্যিক ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) যন্ত্রগুলোতে—যেমন স্মার্ট ওভেন বা অ্যান্ড্রয়েড টিভি বক্সে—নিজের প্রতিলিপি নিজে তৈরি করে ছড়িয়ে পড়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করে ফেলবে।’ তাঁরা আরও সতর্ক করেছেন যে, এ ধরনের এআই ছড়িয়ে পড়লে তা বন্ধ করা অত্যন্ত কঠিন হবে। কারণ, এগুলো বন্ধ করার মতো কোনো একক বা কেন্দ্রীয় পয়েন্ট থাকবে না। আরও ভয়ের বিষয় হলো, এটি এক ধরনের এআই মালওয়্যারের রূপ নেবে এবং নিজে থেকেই নতুন বা অপরিচিত যন্ত্রের গঠন বুঝে নিতে পারবে।
এআই হতে পারে আগামী দিনের ক্ষতিকর কম্পিউটার ‘ওয়ার্ম’
কম্পিউটার সিস্টেমের জুড়ে ছড়িয়ে পড়ার জন্য তৈরি প্রোগ্রাম বা ‘ওয়ার্ম’-এর মতো আচরণ করার ক্ষমতা রয়েছে এআইয়ের। আধুনিক সাইবার ওয়ার্মগুলো নেটওয়ার্কে ঢোকার রাস্তা খোঁজে, সিস্টেমের দুর্বলতা স্ক্যান করে এবং এক যন্ত্র থেকে অন্য যন্ত্রে লাফিয়ে চলে। এই দ্রুত অনুলিপি তৈরির প্রক্রিয়াটি কম্পিউটারের মেমোরি, প্রসেসর, ডিস্ক স্পেস ও ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ দ্রুত শেষ করে ফেলে। ফলে কম্পিউটার ধীরগতির হয়ে যায়, সিস্টেম ক্র্যাশ করে, এমনকি পুরো নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়ে।
ভাইরাসের ও ওয়ার্মের পার্থক্য হলো—ভাইরাস ছড়াতে মানুষের সামান্য হলেও সহায়তার প্রয়োজন হয় (যেমন কোনো ম্যালওয়্যার ফাইল ডাউনলোড করা বা সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করা)। কিন্তু ওয়ার্ম ছড়াতে মানুষের কোনো সহায়তার দরকার হয় না; এটি নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজে থেকেই ছড়িয়ে পড়ে। এজন্য একটি শক্তিশালী ওয়ার্ম ভাইরাসের চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক। এটি মাত্র কয়েক মিনিটে হাজার হাজার কম্পিউটার অচল করে দিতে পারে।
একটি এআই-চালিত কম্পিউটার ওয়ার্ম সাধারণ ওয়ার্মের চেয়েও বহুগুণ বিপজ্জনক। কারণ, এটি নির্দিষ্ট বা বাঁধাধরা কোডের ওপর নির্ভর না করে প্রতিবার আক্রমণের ধরন বদলাতে পারে, আগের আক্রমণ থেকে শিক্ষা নিতে পারে এবং বিভিন্ন যন্ত্রের নির্দিষ্ট দুর্বলতা অনুযায়ী নতুন কৌশল তৈরি করতে পারে।
অ্যানথ্রপিকের গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, ‘এ ধরনের এআই ওয়ার্ম ছড়িয়ে পড়ার সময় নিজের মেমোরি বা ওয়েট (weights) সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে পারে (অথবা কোনো পাবলিক হাব থেকে আবার ডাউনলোড করে নিতে পারে) এবং আক্রান্ত হার্ডওয়্যারে সরাসরি কাজ করতে পারে। সহজ কথায়, এআইয়ের মূল অংশটাই এই মালওয়্যারের ক্ষতিকর উপাদানে পরিণত হবে।’ গবেষকেরা আরও জানান, এই এআই ওয়ার্মগুলো কম নিরাপত্তাবিশিষ্ট আইওটি যন্ত্র ব্যবহার করতে পারে, নতুন হার্ডওয়্যারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে এবং মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রচলিত ম্যালওয়্যারের মতো কেন্দ্রীয় কাঠামোর ওপর নির্ভর না করায় এই ছড়িয়ে থাকা এআই সিস্টেমগুলোকে বন্ধ করা খুবই কঠিন হবে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এক্সকেপের সমাধান বিশেষজ্ঞ জন কারবেরি বলেছেন, ‘নিজে থেকে অনুলিপি তৈরি করা সফটওয়্যার কিন্তু নতুন কিছু নয়।’ এমন অনুলিপি তৈরি করা প্রথম সফটওয়্যার ছিল ১৯৮৭ সালের ‘ক্রিসমাস ট্রি’ ওয়ার্ম, যা বানিয়েছিলেন এক জার্মান প্রোগ্রামার। সেটির উদ্দেশ্য ক্ষতিকর ছিল না—এটি কেবল কম্পিউটারে ছড়িয়ে পড়ে ব্যবহারকারীদের শুভ বড়দিন ও নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাত এবং ক্রিসমাস ট্রির একটি ছবি দেখাত। তবে তখনকার সাধারণ কম্পিউটার ব্যবস্থাগুলোর জন্য এটি ব্যাপক বিপর্যয় ডেকে এনেছিল।
এর পরের বছরই আসে ‘মরিস ওয়ার্ম’, যা আগের সব রেকর্ড ছাপিয়ে যায়। ইন্টারনেট ব্যবস্থার শুরুর দিকে ভয়াবহ ক্ষতির কারণে একে ‘দ্য গ্রেট ওয়ার্ম’ বলা হতো। এটি হাজার হাজার কম্পিউটার অচল করে দেয় এবং এতে প্রায় ১ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়। এর সৃষ্টিকর্তা কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রবার্ট তাপ্পান মরিস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘কম্পিউটার ফ্রড অ্যান্ড অ্যাবিউজ অ্যাক্টের’ অধীনে দোষী সাব্যস্ত হওয়া প্রথম ব্যক্তি হন। (পরবর্তীতে মরিস ‘ওয়াই কম্বিনেটর’ নামে একটি বিখ্যাত স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হন এবং বর্তমানে তিনি এমআইটি-র কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক।)
কারবেরি বলেন, ‘অ্যানথ্রপিকে গবেষণা দেখায় যে, এআই ঘরের ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রগুলোতে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর অর্থ হলো, ঐতিহ্যবাহী উপায়ে মূল সুইচ বন্ধ করে এই সংক্রমণ রোখা যাবে না। কাল্পনিক এআই নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উচিত যন্ত্রগুলোর নেটওয়ার্ক আলাদা রাখা, অননুমোদিত ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করা এবং ডিফল্ট পাসওয়ার্ড বদলে ফেলা।’
এআই এখনই না পারলেও খুব শিগগিরই নিজে থেকে ছড়িয়ে পড়তে পারবে
বর্তমানে পরীক্ষা করা আইওটি হার্ডওয়্যারগুলোতে এআই মডেলগুলো এখনো পুরোপুরি সফলভাবে অনুলিপি তৈরি করতে পারছে না। তবে আর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই এই ক্ষমতা চলে আসতে পারে। এই ধরনের বিপদকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এআই কী পরিমাণ ক্ষতি করতে পারে, তা নিয়ে এটি নতুন এক সতর্কবার্তা।
ব্ল্যাক হিলস ইনফরমেশন সিকিউরিটির মালিক জন স্ট্র্যান্ড বলেছেন, ‘আমরা এখন পুরোপুরি সায়েন্স ফিকশনের যুগে বাস করছি। দুঃখের বিষয় হলো, এটা কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, সত্যি।’
গবেষকেরা বহু বছর ধরেই নিজে থেকে অনুলিপি তৈরি করা ওয়ার্ম ও বটনেট নিয়ে গবেষণা করছেন। ২০১২ সালে এক অজ্ঞাত হ্যাকার ‘কার্না বটনেট’ (Carna botnet) তৈরি করেছিল। সাইবার নিরাপত্তা খাতের মূল চিন্তার বিষয় হলো এর ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা। এআইয়ের বিশেষত্ব হলো—এটি কোনো পূর্বনির্ধারিত দুর্বলতার ওপর নির্ভর না করে নিজে থেকেই সিস্টেমের দুর্বলতা খুঁজে বের করে, তা আক্রমণ করে এবং অন্যান্য যন্ত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
স্ট্র্যান্ড বলেন, ‘সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ছোট এআই মডেলগুলোর ক্ষমতাও বড় বড় অত্যাধুনিক মডেলের মতোই। এগুলো শুধু কাজ করতে একটু বেশি সময় নেয়। তাই অন্তত ১২৮ গিগাবাইট মেমোরির সিস্টেমে চলা ছোট মডেলগুলোকেও সহজভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এরা দ্রুত না হলেও নিরাপত্তা কর্মীদের সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে।’
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ইন্টারনেট অব থিংস
কম্পিউটার ও স্মার্টফোনে এআই মডেলের নিজে থেকে অনুলিপি তৈরি করার ক্ষমতা এক অভূতপূর্ব ও অপ্রত্যাশিত হুমকি। তবে এই বিপদ শুধু কম্পিউটার বা ফোনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত সব ধরনের যন্ত্রে ছড়িয়ে পড়বে। রিজ সিকিউরিটি টেকনোলজির কারিগরি পরিচালক ড্যারিন ফ্রেডি জানান, এত বছর সবাই ভেবেছে স্মার্ট টিভি শুধু সিনেমা বা নাটক দেখার পরামর্শ দেবে। কিন্তু ভবিষ্যতে এই স্মার্ট টিভিই হয়তো বড় কোনো সাইবার আক্রমণের অংশ হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, ‘মূল প্রশ্ন এটা নয় যে—এআই নিজে ছড়িয়ে পড়তে পারে কিনা, বরং প্রশ্ন হলো এটি কোনো যন্ত্রে ঢুকে পড়ার পর কী করতে পারে? এটি কি অন্য যন্ত্র খুঁজে বের করতে পারবে? নিরাপত্তা প্রাচীর ভাঙতে পারবে? এবং কোনো কেন্দ্রীয় সার্ভার ছাড়াই কাজ চালিয়ে যেতে পারবে?’
ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত দৈনন্দিন যন্ত্রগুলোতে (আইওটি) এআইয়ের এই নিজে নিজে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা নতুন নিরাপত্তা ও আইনি ঝুঁকি তৈরি করবে। কারণ এগুলো ডেটা সেন্টারের ওপর নির্ভর না করেই পুরো নেটওয়ার্ককে আক্রমণের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলতে পারে। কারবেরির মতে, ‘আমরা চার দশক ধরে নেটওয়ার্ককে সুরক্ষিত করেছি, আর এখন সেই বিপজ্জনক ওয়ার্মকেই মিটিং রুমের স্মার্ট ডিসপ্লের মাধ্যমে ঘরে ডেকে আনছি।’
আমরা কি অজনা প্রযুক্তির ভয়ে বেশি আতঙ্কিত?
প্রশ্ন উঠছে—আমরা কি না বুঝে অতিরিক্ত ভয় পাচ্ছি, নাকি এই হুমকি সত্যিই মারাত্মক? সুজু ল্যাবসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্টিভেন সুইফ্ট বলেন, ‘এআই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে বা হ্যাক করে ছিটকে বের হয়ে যাবে—এমন অনেক ভয় দেখানো হয়। তবে অ্যানথ্রপিকের এই গবেষণাটি মূলত আইওটি যন্ত্রের বাস্তব ঝুঁকিকে সামনে এনেছে, কারণ এসব যন্ত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রায় থাকেই না। ফলে এগুলো সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।’
সুইফ্ট আরও বলেন, ‘নিজের অনুলিপি তৈরি করা নতুন কিছু নয়, একে আমরা ওয়ার্ম বলি। এআই-চালিত ওয়ার্ম মূলত সাধারণ ওয়ার্মের মতোই, যা অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে এআইয়ের মেমোরি বা ফাইল ডাউনলোড করে নিজের মতো প্রম্পট তৈরি করে কাজ চালিয়ে যেতে পারে।’
প্রথমদিকের ওয়ার্ম আক্রমণের পর থেকে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এসব হুমকি মুছে ফেলতে বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছেন। আধুনিক নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা এখন অনেকটাই সুরক্ষিত। তবে সমস্যা হলো, আমরা এখনো বাজারে এমন অনেক স্মার্ট যন্ত্র ছাড়ছি যেগুলোতে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। ফলে এসব যন্ত্র ব্যবহারকারীর অজান্তেই বড় ধরনের আক্রমণের হাতিয়ার বা ‘বটনেট’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
