প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংককে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার ২০ বছর পূর্ণ হবে আগামীকাল মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর)। ২০০৬ সালের ১৩ অক্টোবর নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি এই পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দেয়। দারিদ্র্য দূরীকরণে তৃণমূল পর্যায় থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ এই পুরস্কার প্রদান করা হয়।
এই স্বীকৃতি তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের, বিশেষ করে নারীদের ক্ষমতায়নে ক্ষুদ্রঋণের ভূমিকা এবং প্রথাগত আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টিকে বিশ্বব্যাপী গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে।
প্রফেসর ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম প্রমাণ করে দেখিয়েছে যে, আর্থিক সেবা প্রাপ্তি এবং মানুষের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে কীভাবে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখা সম্ভব।
২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে নোবেল কমিটি স্বীকৃতি দিয়েছিল যে, দারিদ্র্য নিছক একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও শান্তি। কোনো ব্যক্তি যখন অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত হন এবং নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ গড়ার কোনো সুযোগ পান না, তখন হতাশা ও অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়।
অন্যদিকে, মানুষ যখন অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত হন, নিজেদের জীবনের দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ পান এবং সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত হন, তখন শান্তির ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হয়।
২০০৬ সালের ১০ ডিসেম্বর নরওয়ের রাজপরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে অসলো সিটি হলে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান করা হয়। সেদিন প্রফেসর ইউনূস তাঁর পদক ও সনদ গ্রহণ করেন এবং নোবেল বক্তৃতা প্রদান করেন। গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মোসাম্মৎ তাসলিমা বেগম গ্রামীণ ব্যাংকের পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন।
এছাড়া অসলো স্পেকট্রামে নোবেল শান্তি পুরস্কার কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এতে পারফর্ম করেন- সঙ্গীতশিল্পী লিওনেল রিচি, রিহানা, অপেরা ও জ্যাজ শিল্পী রেনে ফ্লেমিং, অপেরা শিল্পী মনিকা ইউনূস, সংগীতশিল্পী পলিনা রুবিও, হাকিম, ‘সিম্পলি রেড’-এর মিক হাকনাল, ইউসুফ ইসলাম (‘ক্যাট স্টিভেন্স’ নামে পরিচিত) এবং উইনোনা জাড।
কনসার্টটি সঞ্চালনা করেন হলিউড অভিনয়শিল্পী অ্যাঞ্জেলিকা হিউস্টন ও শ্যারন স্টোন। সেদিন মঞ্চে পারফর্ম করেন বাংলাদেশের নৃত্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘নৃত্যাঞ্চল’ এর শিল্পীরা।
পাঁচ দশক আগে প্রফেসর ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্বকে বার্তা দিয়েছিলেন, যে পদ্ধতি দরিদ্র মানুষের জীবনকে স্বীকার করে না, সেই পদ্ধতি ভুল। সেটিকে পাল্টে দেওয়া প্রয়োজন। এমন ব্যাংক গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে কোনো জামানত চাওয়া হবে না; যেখানে ব্যাংকিং কাঠামোর ভিত্তি হবে মানুষের পারস্পরিক আস্থা।
নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার দুই দশক পর আজও এই দর্শন আরও ন্যায়সঙ্গত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ার প্রচেষ্টায় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।
গ্রামীণের কাজ শুধু ক্ষুদ্রঋণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মানুষের জীবনের প্রয়োজনকে সামনে রেখে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে নানা উদ্যোগ—ভিলেজ ফোনের ‘টেলিফোন লেডি’ গ্রামের মানুষের হাতে যোগাযোগ ও তথ্য পৌঁছে দিয়েছে; গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোগ প্রত্যন্ত মানুষের কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দিয়েছে; ‘গ্রামীণ ক্যালেডোনিয়ান কলেজ অব নার্সিং’ দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী গড়ে তুলেছে; গ্রামীণের শিক্ষা উদ্যোগ প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়িয়েছে।
আবাসন, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান—জীবনের বিভিন্ন মৌলিক প্রয়োজনকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে এসব উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল একটি বিষয়ই: মানুষকে শুধু ঋণ দেওয়া নয়, বরং তার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য, সাবলম্বী করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ ও সক্ষমতার পরিসর তৈরি করা।
গ্রামীণের দীর্ঘদিনের কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো— মানুষকে সহায়তার পাত্র হিসেবে নয়, নিজের ভাগ্য পরিবর্তনে সক্ষম একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখতে হবে। গ্রামীণের অর্জন হলো দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক অর্থব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষকে উৎপাদন ও বিনিয়োগের সুযোগ করে দেয়া।
বর্তমানে প্রফেসর ইউনূস বিশ্বব্যাপী সামাজিক ব্যবসার প্রচার ও প্রসারে কাজ করে চলেছেন। মানুষকে মূলত ভোক্তা ও মুনাফা তৈরির উপকরণ হিসেবে নয় বরং মানুষের সৃজনশীল সত্তাকে, কল্পনাশক্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে কাজ করে চলেছেন।
প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বর্তমান সভ্যতাকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ এবং ‘আত্মবিধ্বংসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে তিন শূন্যের পৃথিবী (শূন্য নিট কার্বণ নিঃসরণ, দারিদ্র্যের অবসানে শূন্য সম্পদ কেন্দ্রীভবন ও উদ্যোক্তাশক্তির বিকাশের মাধ্যমে শূন্য বেকারত্ব) গড়ার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী তাঁর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
