প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আকস্মিক পরিদর্শনের পর রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোয় পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে তৎপরতা বেড়েছে। ভেতরে-বাইরে চলছে ধোয়া-মোছা, সরানো হচ্ছে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা। তবে রোগী ও স্বজনদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনকেন্দ্রিক এই পরিবর্তন যেন সাময়িক না হয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোর নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসারত রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের পর হাসপাতালগুলোর পরিচ্ছন্নতা বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের মধ্যেও দায়িত্ব পালনে কিছুটা আন্তরিকতা দেখা যাচ্ছে। তবে রোগীদের প্রত্যাশা, কোনো পরিদর্শন কেন্দ্র করে নয়, সরকারি হাসপাতালগুলোয় সব সময় তারা এমন পরিবেশ ও সেবার মান দেখতে চান।
গত শনিবার রাজধানীর ১৩টি স্থানে আকস্মিক পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্যে চারটি হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। হাসপাতালগুলো হলো কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট। পরিদর্শনকালে তিনি হাসপাতালগুলোর সেবার মান, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করেন।
উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় হাসপাতালের পরিবেশ উন্নয়নে কর্তৃপক্ষকে সাত দিনের সময় বেঁধে দেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট পরিদর্শনের সময় নিজ কক্ষে ধূমপানরত অবস্থায় এক সহযোগী অধ্যাপককে দেখে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রীর এসব আকস্মিক পরিদর্শনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রোগী ও স্বজনরা। তাদের মতে, ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে
নিয়মিত নজরদারি থাকলে সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব।
গতকাল সরেজমিনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের পরিবেশ অন্য সময়ের তুলনায় কিছুটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজ করতে দেখা যায়। হাসপাতালটিতে কয়েক দিন ধরে বাবাকে নিয়ে ভর্তি রয়েছেন রাজধানীর আদাবরের বাসিন্দা নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, হাসপাতালটি তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন লাগছে। সব সময় যেন এমন থাকে এটাই প্রত্যাশা করি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের প্রত্যাশা তিনি সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মান যেন আরও বাড়ান। ইসরাত জাহান নামে এক নারী বলেন, প্রধানমন্ত্রী এভাবে হঠাৎ হাসপাতালে পরিদর্শনে আসায় অবাক হয়েছি। আমার ভাবি তিন দিন ধরে এই হাসপাতালে ভর্তি আছেন। এর আগেও কয়েকবার এখানে এসেছি। তবে এবার তুলনামূলকভাবে ভালো লাগছে। আমরা চাই, হাসপাতালগুলো শুধু প্রধানমন্ত্রী আসার সময় নয়, সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুক।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটেও দেখা যায় একই চিত্র। সরেজমিনে হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কর্মতৎপরতা দেখা যায়। হামের চিকিৎসার জন্য নাতিকে নিয়ে এই হাসপাতালে চার দিন ধরে ভর্তি রয়েছেন কাঞ্চন মিয়া। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এই হাসপাতালে এসেছিলেন। এরপর থেকে দেখছি হাসপাতাল আরও পরিষ্কার করা হচ্ছে। পরিবেশও আগের চেয়ে ভালো মনে হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, প্রধানমন্ত্রী হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা এবং শৃঙ্খলা এই দুটি বিষয় প্রধানত পর্যবেক্ষণ করেছেন। আমাদের কিছু টেকনিক্যাল ত্রুটি এবং ওয়ার্ডে রোগীর সংখ্যা বেশি থাকায় বাথরুম ও কিছু বাহ্যিক জায়গায় পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি দেখা গেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি আরও উন্নত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পরিচ্ছন্নতার মান আরও উন্নত করতে নিয়মিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক হাসপাতাল পরিদর্শনের পর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সেবার মানোন্নয়নে কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে একটি কার্যকর সভা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী এবং কাজের পরিধি বাড়াতে ওয়ার্ড ও ফ্লোরভিত্তিক তদারকির জন্য চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রী পরিদর্শন করতে পারেন এই খবরে গত চার দিন ধরেই হাসপাতালটির ভেতরে-বাইরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়েছে। সরেজমিন দেখা গেছে, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনের রাস্তার ফুটপাতে থাকা সব দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছে। জরুরি বিভাগের গেটে নেই চিরচেনা বেসরকারি অ্যাম্বুৃলেন্সের কোনো জটলা। হাসপাতালটির পুরো প্রাঙ্গণ এলাকা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে পরিপাটি করে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের নিচতলার নানা জায়গায় ধুয়েমুছে পরিষ্কার করা হয়েছে।
