রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক ও ফুটপাতের চিরচেনা দৃশ্য বদলাতে শুরু করেছে। কোথাও ফুটপাত থেকে সরানো হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ দোকান, কোথাও উচ্ছেদ করা হচ্ছে অবৈধ স্থাপনা। এরপর পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা পরিষ্কার করছেন সড়ক ও হাঁটার পথ। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ না পাওয়া নগরবাসীর কাছে এই উদ্যোগ স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে তাই রাজধানীজুড়ে চলছে আলোচনা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার পর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালামের নেতৃত্বে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। দুই সিটির প্রশাসকদের সরাসরি অংশগ্রহণ, অবৈধ স্থাপনা অপসারণ এবং উচ্ছেদের পর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের ছবি ও খবরও আলোচনায় এসেছে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, এই অভিযান শুধু সাময়িকভাবে ফুটপাত খালি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং রাজধানীর পথচারীবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনার স্থায়ী উদ্যোগে পরিণত হবে। নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিতে ফুটপাত দখলমুক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এর সুফল দীর্ঘস্থায়ী করতে প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, কার্যকর আইন প্রয়োগ, হকারদের জন্য বাস্তবসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনা।
ফুটপাত ফিরে পাচ্ছেন পথচারীরা: রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালাচ্ছে ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি। উত্তরের বিভিন্ন এলাকায় ফার্মগেট, গ্রিন রোড, পান্থপথ, আগারগাঁও, উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁওয়ে অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ফার্মগেট ও পান্থপথের মতো ব্যস্ত এলাকায় ফুটপাতের ওপর দোকানপাট ও পণ্যের পসরা থাকায় পথচারীদের চলাচলে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি ছিল। একইভাবে মিরপুর-২, মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১৪ এবং উত্তরের বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকায় ফুটপাতের জায়গা দখল হয়ে যাওয়ায় অনেককে মূল সড়কের পাশ দিয়ে চলাচল করতে হতো। এতে পথচারীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি যানবাহনের চলাচলেও চাপ তৈরি হতো।
অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় গুলিস্তান, পল্টন, এলিফ্যান্ট রোড, মগবাজার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের এলাকা এবং সেগুনবাগিচায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচরের ইসলামবাগ এলাকায় হাইকোর্টের নির্দেশনায় পরিচালিত যৌথ অভিযানে ৫০টি অবৈধ স্থাপনা ও প্রায় ১০০ টন বর্জ্য অপসারণের তথ্য পাওয়া গেছে।
উচ্ছেদের পর পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দিয়ে সড়ক ও ফুটপাত পরিষ্কার করার উদ্যোগ পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। আগে যেখানে ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে গিয়ে দোকানের পণ্য, মানুষের ভিড় ও বর্জ্যের মুখোমুখি হতে হতো, সেখানে এখন অনেক জায়গায় চলাচলের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শুধু পথচারী নন, ফুটপাতের পাশের বৈধ দোকানগুলোর ব্যবসায়ীরাও এর সুফল পাওয়ার কথা জানাচ্ছেন। মিরপুরের শাহ আলী প্লাজার বিক্রেতা শাহাদাত খন্দকারের ভাষ্য, উচ্ছেদের পর সড়ক ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার হয়েছে। আগে ফুটপাতের দোকান থেকে কেনাকাটা করা ক্রেতাদের কেউ কেউ এখন মার্কেটে আসছেন, ফলে স্থায়ী ব্যবসায়ীদের বেচাকেনা বাড়ছে।
এই অভিজ্ঞতা দেখায়, ফুটপাতের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে পথচারীদের চলাচলের পাশাপাশি পরিকল্পিত বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর পরিবেশও উন্নত হতে পারে।
নগর পরিকল্পনায় ফুটপাতের গুরুত্ব: নগর পরিকল্পনাবিদদের আলোচনায় ফুটপাত কেবল রাস্তার পাশের একটি অবকাঠামো নয়; এটি নগরের গণপরিসরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষের নিরাপদে হাঁটা, গণপরিবহনে ওঠানামা, দোকানপাট ও সেবাকেন্দ্রে যাতায়াত—সবকিছুর সঙ্গে ফুটপাতের কার্যকারিতা জড়িত।
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরে পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত ও কার্যকর হাঁটার জায়গা নিশ্চিত করা জরুরি। ফুটপাতের জায়গা দখল হয়ে গেলে মানুষ বাধ্য হয়ে সড়কে নেমে আসে। এতে সড়কের ব্যবহার বাড়ে, যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
নগর পরিকল্পনার একটি মৌলিক নীতি হলো, সড়কের নকশা ও ব্যবহার নির্ধারণের সময় শুধু মোটরযানের চলাচল নয়, পথচারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শিশু ও বয়স্ক মানুষের প্রয়োজনও বিবেচনায় নিতে হবে। সেই বিবেচনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযানকে নগরের জনপরিসর পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায়।
তবে উচ্ছেদ অভিযানই একমাত্র সমাধান নয়। ফুটপাত খালি রাখার জন্য নিয়মিত তদারকি, সড়কের নকশা অনুযায়ী হাঁটার জায়গা চিহ্নিত করা, নির্মাণসামগ্রী ও দোকানের পণ্য ফুটপাতে রাখা বন্ধ করা এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ফুটপাতের ওপর থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটি, অগোছালো তার, ভাঙা স্ল্যাব ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দূর করাও জরুরি।
উচ্ছেদের পর পুনর্দখল ঠেকানোই বড় চ্যালেঞ্জ: ঢাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে সিটি করপোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু উচ্ছেদের কিছুদিন পর অনেক এলাকায় আবারও দোকানপাট বসেছে। ফলে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি দখল ঠেকানোর স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ ক্ষেত্রে নগর ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত তদারকি, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। উচ্ছেদের পর খালি জায়গা কীভাবে ব্যবহার করা হবে, পথচারীদের জন্য কতটুকু জায়গা সংরক্ষিত থাকবে এবং কোনো স্থাপনা নতুন করে বসানো হচ্ছে কি না—এসব বিষয় পর্যবেক্ষণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। শুধু উচ্ছেদ চালিয়ে গেলে প্রশাসনের জনবল ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি একই সমস্যা বারবার ফিরে আসার আশঙ্কা থাকে। বরং এলাকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত পরিদর্শন এবং নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার উদ্যোগ আরও ফলপ্রসূ হতে পারে।
ফুটপাত দখলমুক্ত করার পক্ষে জনসমর্থন থাকলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবিকার প্রশ্ন। অনেক হকারের দৈনন্দিন আয়ের ওপর নির্ভর করে তাদের পরিবারের ব্যয় নির্বাহ। তাই নগর ব্যবস্থাপনার কার্যকর সমাধানে পথচারীদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি প্রকৃত নিম্নআয়ের হকারদের জন্য বাস্তবসম্মত বিকল্প ব্যবস্থাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নগর পরিকল্পনাবিদদের আলোচনায় হকারদের জন্য এলাকাভিত্তিক পুনর্বাসন, নির্ধারিত স্থানে ব্যবসার সুযোগ এবং সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে পরিকল্পিত হকার মার্কেট গড়ে তোলার মতো প্রস্তাব এসেছে। কিছু এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অস্থায়ী বাজার চালুর ধারণাও বিবেচনাযোগ্য। তবে এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়নের আগে স্থানীয় চাহিদা, পথচারীর চাপ, পরিবহনব্যবস্থা ও বাজারের অবস্থান সম্পর্কে সমীক্ষা করা জরুরি।
পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে প্রকৃত হকারদের তালিকা তৈরি, বরাদ্দে স্বচ্ছতা, নির্ধারিত জায়গা অন্যের কাছে ভাড়া দেওয়া বন্ধ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করা এবং বৈধভাবে নির্ধারিত স্থানে ব্যবসা করার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখতে হবে। এতে একদিকে পথচারীদের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার বিষয়টিও পরিকল্পনার আওতায় আসবে।
ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগে বিভক্ত করার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নাগরিক সেবা আরও কার্যকর করা। কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের পরও রাজধানীর ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত দোকানপাট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও যানজটের মতো সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান হয়নি। ফলে বর্তমান অভিযানকে কেবল আইন প্রয়োগের কার্যক্রম হিসেবে না দেখে নগর পরিচালনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার সুযোগ হিসেবেও দেখা প্রয়োজন।
ফুটপাত পরিষ্কার রাখা, সড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং পথচারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা—এসব কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালিত হলে নগরের সৌন্দর্য বাড়ার পাশাপাশি নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনও সহজ হবে। তবে এই পরিবর্তন স্থায়ী করতে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি পুলিশ, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, ব্যবসায়ী সংগঠন ও নাগরিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
