শুরুটা ছিল প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার মতো। মাত্র ২৪ রানেই জিম্বাবুয়ের ৩ উইকেট তুলে নিয়েছিল বাংলাদেশ। বল হাতে তাসকিন আহমেদের দুর্দান্ত সূচনায় মনে হয়েছিল, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বুঝি বাংলাদেশের হাতেই। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে জয়ে রূপ দেওয়ার সামর্থ্য দেখাতে পারেনি দল। জিম্বাবুয়ে ৫০ ওভার খেলে দাঁড় করিয়েছে ২৭২ রানের লক্ষ্য, আর বাংলাদেশ থেমেছে ১৭২ রানেই। ৯৯ রানের এই হার আবারও সামনে এনেছে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের পুরোনো দুর্বলতা-চাপের মুখে ভেঙে পড়া, বড় জুটি গড়তে না পারা এবং ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং করতে ব্যর্থ হওয়া।
ত্রিদেশীয় সিরিজে আবুধাবিতে গত রাতে এই হারের সবচেয়ে হতাশাজনক দিক হলো, শুরুতে প্রতিপক্ষকে যে অবস্থায় ফেলা হয়েছিল, সেখান থেকে ম্যাচে ফেরার সুযোগ ছিল বাংলাদেশের সামনে। জিম্বাবুয়ের ব্যাটসম্যানরা প্রথম ধাক্কা সামলে পুরো ৫০ ওভার খেলেছেন। অথচ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা সেই ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেননি। উইকেটে ব্যাটিংয়ের জন্য খুব বেশি প্রতিকূলতা ছিল না বলেই মনে করছেন তাসকিন। তার মূল্যায়নেও উঠে এসেছে দলের ব্যর্থতার কথা।
শনিবার আবুধাবিতে ম্যাচ শেষে তাসকিন বলেছেন, ‘সত্যি বলতে, যেরকম পিচ ছিল, আমরাও তো বল করেছি, একটু এদিক-ওদিক হলেই কিন্তু পানিশড হচ্ছিলাম। জিম্বাবুয়ের সঙ্গে অন্তত ২৭০ অবশ্যই তাড়া করার মতো ছিল। ওদের কন্ডিশনে ওরা অস্ট্রেলিয়াকেও কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এই কন্ডিশনে আমাদের আসলে তাড়া করা উচিত ছিল। আমরা আসলেই ভালো খেলিনি।’
বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের ব্যর্থতা বুঝতে খুব বেশি পরিসংখ্যানের প্রয়োজন নেই। সৌম্য সরকার ও তানজিদ হাসানের উদ্বোধনী জুটিতে এসেছে ৪৭ রান। এরপর আর কোনো জুটি ৩০ রানের বেশি করতে পারেনি, নবম উইকেটে তাসকিন ও রিশাদ হোসেনের ৩২ রানের জুটি ছাড়া। ব্যাটিংয়ের দায়িত্ব যাদের নেওয়ার কথা ছিল, তাদের কেউই ইনিংসকে এগিয়ে নেওয়ার মতো জুটি গড়তে পারেননি। শেষ দিকে বোলারদের ব্যাটে কিছু রান এলেও ততক্ষণে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে প্রতিপক্ষের হাতে।
এখানেই বাংলাদেশের ব্যাটিং নিয়ে প্রশ্নটা আরও জোরালো হয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়মিত খেলা ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে কি অন্তত একটি কার্যকর জুটি আশা করা যায় না? ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুটা ভালো হওয়ার পরও কেন ইনিংসকে এগিয়ে নেওয়া গেল না? বারবার একই ধরনের বিপর্যয় ঘটলেও তার কার্যকর সমাধান কোথায়?
তাসকিনের বক্তব্যেও উঠে এসেছে সেই হতাশা। তিনি বলেছেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত আমরা একটাও জুটি গড়তে পারিনি। একটা জুটি হলেই খেলাটা বের হয়ে যেত। আমাদের ব্যাটিংয়ে প্রায়ই ভুল করা হয়। বোলিংয়ে তাও তো একটা ধারাবাহিকতা আছে। আসলে ব্যাটসম্যানদের (আজ) জেতানো উচিত ছিল, কিন্তু পারে নাই।’
ব্যাটসম্যানদের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি তাসকিন। বরং তার মতে, ঘাটতি রয়েছে ম্যাচের পরিস্থিতি বোঝা এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্যক্তিগত সামর্থ্যের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও দল হিসেবে বারবার কেন একই জায়গায় ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ? নকআউট বা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের চাপ সামলাতে না পারলে ব্যক্তিগত দক্ষতা দিয়ে কত দূর এগোনো সম্ভব?
তাসকিনের ব্যাখ্যা, ‘ম্যাচ পরিস্থিতি বুঝতে পারার ঘাটতিটা একটু বেশি। কারণ স্কিল কিন্তু সবার আছে। আপনারা যারা ক্রিকেট খেলা দেখেন, প্রতিটি ব্যাটসম্যানই কিন্তু প্রমাণ করেছে, তারা ভালো ব্যাট করতে পারে। মাঝে মাঝে আমরা দল হিসেবে দেখবেন, চাপে পড়লে খুব দ্রুত ভেঙে পড়ি। এই জিনিসটাই আমাদের আসলে বের হয়ে আসতে হবে। বড় দল হতে চাইলে যেকোনোভাবে বের হয়ে আসতে হবে। আমি শিওর, এটা নিয়ে আমরা সবাই মিলে কাজ করছি, কীভাবে দ্রুত ঠিক করা যায়।’
একই ব্যর্থতার কথা উঠে এসেছে তাওহিদ হৃদয়ের বক্তব্যেও। ম্যাচ শেষে তিনি বলেছেন, ‘আসলে, আমরা দারুণ বোলিং করেছি। এখানকার পিচ ব্যাটিংয়ের জন্য বেশ ভালো। তাই ব্যাটিং ইউনিট হিসেবে আমরা কিছু ভুল করেছি। আমাদের শুরুটা খুব ভালো হয়েছিল, কিন্তু মাঝের ওভারগুলোতে আমরা ভালো করতে পারিনি।’
মাঝের ওভারগুলোতে ব্যাটিংয়ের এই ভাঙন বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু নয়। প্রতিপক্ষের বোলিংয়ে চাপ তৈরি হলে উইকেট ধরে রাখা, রান তোলার গতি নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা ঝুঁকি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে দলকে বারবার সমস্যায় পড়তে দেখা যায়। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও সেই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। ফলে তাসকিনের দুর্দান্ত বোলিংয়ের পরও ম্যাচের ফল বদলানো যায়নি।
বাংলাদেশের সামনে এখন শেষ ম্যাচে ঘুরে দাঁড়িয়ে ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ফেরার সুযোগ। সেই আশা বাঁচিয়ে রাখতে হলে শুধু জয়ের প্রত্যয় জানালেই চলবে না, মাঠে তার প্রতিফলনও দেখাতে হবে। তাসকিন বলেছেন, ‘এখনো একটা ম্যাচ বাকি আছে। আমরা চাইব যে ভালোভাবে লড়াই করে ফিরে এসে যেন ফাইনাল খেলতে পারি।’
কিন্তু বাংলাদেশের আসল পরীক্ষা শুধু শেষ ম্যাচে জয় পাওয়া নয়; বরং একই ভুলের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা। বোলাররা প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলবেন, আর ব্যাটসম্যানরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবেন না-এমন ক্রিকেট দিয়ে বড় দল হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে না। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হার তাই কেবল পয়েন্ট হারানোর ঘটনা নয়, বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার তাগিদও। এখন দেখার বিষয়, শেষ ম্যাচে সেই তাগিদ বাস্তব পারফরম্যান্সে রূপ নিতে পারে কি না।
বাংলাদেশের পরের ম্যাচ ২১ অক্টোবর, আফগানিস্তানের বিপক্ষে। সিরিজে ফাইনালে খেলা সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে হলে সেখানে যেতেই হবে তাদের।
