সড়ক দুর্ঘটনা যেন বাংলাদেশের নিত্যদিনের নির্মম বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো সড়কে ঝরছে প্রাণ, পঙ্গুত্ব বরণ করছে অনেকে, আর অসংখ্য পরিবার হারাচ্ছে তাদের উপার্জনক্ষম স্বজন। গত শুক্র ও শনিবার দেশের সাত জেলায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-ছেলেসহ অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু এবং আরও অন্তত ৫০ জনের আহত হওয়ার ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটির সময় মানুষের ঘরে ফেরা কিংবা কর্মস্থলে যাওয়ার পথও যদি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়, তবে তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।
মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। গাজীপুরের টঙ্গীতে প্রাণ হারিয়েছেন বাবা ও ছেলে। যশোরে দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাস ও কাভার্ড ভ্যানের সংঘর্ষ, বগুড়ায় ব্যক্তিগত গাড়ির দুর্ঘটনা, নাটোরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ এবং ঝিনাইদহে মাটিবাহী ট্রলির চাপায় শিশুর মৃত্যু- প্রতিটি ঘটনা সড়ক ব্যবস্থাপনার ভিন্ন ভিন্ন দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। এসব মৃত্যু কেবল পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একেকটি পরিবারের স্বপ্ন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ। সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকের অসতর্কতা, যানবাহনের ত্রুটি এবং সড়কের অব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান, মরদেহ হস্তান্তর ও মামলা-মোকদ্দমার মধ্যেই যদি প্রশাসনিক তৎপরতা সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ, দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এক্সপ্রেসওয়ে ও মহাসড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা নিশ্চিত করা জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নজরদারি বাড়াতে হবে, নিয়মিত যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা করতে হবে এবং চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও বিশ্রামের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। যাত্রীবাহী বাসের চালক ও সহকারীদের কর্মঘণ্টা এবং দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালানোর প্রবণতার ওপরও নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে মহাসড়কে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
পথচারীদের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্যস্ত সড়কে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা, ফুটপাত, ফুট ওভারব্রিজ, জেব্রা ক্রসিং এবং পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামীণ সড়কে মাটিবাহী ট্রলি ও অন্যান্য যানবাহনের চলাচলেও নিরাপত্তাবিধি কার্যকর করতে হবে। শুধু চালককে দোষারোপ করে দায় শেষ করা যাবে না; সড়ক নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও পরিকল্পিত উদ্যোগে প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। এ জন্য দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে সংশোধন, আধুনিক নজরদারি, দ্রুত জরুরি চিকিৎসা এবং সড়ক নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দুর্ঘটনার পর নয়, দুর্ঘটনা প্রতিরোধেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
সড়কে মানুষের মৃত্যু কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, চালকদের কর্তব্য এবং নাগরিকদেরও সচেতনতার বিষয়। আর কত প্রাণ ঝরলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নেবে? বাবা-ছেলেসহ ১৩ জনের মৃত্যুর এই মর্মান্তিক ঘটনা যেন আরেকটি খবর হয়ে বিস্মৃত না হয়। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই মৃত্যুর এই মিছিল থামাতে হবে। মানুষের যাতায়াতের পথ নিরাপদ হোক- এটাই এখন সময়ের দাবি।
